ব্যাটারিচালিত রিকশা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ৫৬% যাত্রী: গবেষণা

গবেষণার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় অতিথি ও আয়োজকেরা। বিডিবিএল ভবন, ঢাকা। ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

রাজধানীতে বেড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল। এতে যানজট সৃষ্টির পাশাপাশি প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে বাহনটিকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত দিয়েছেন ৫৬ দশমিক ৬০ শতাংশ যাত্রী। পুরোপুরি বন্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন ২১ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর ৩৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ যাত্রী গলির সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।

আজ রোববার এ–সংক্রান্ত এক গবেষণার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এমন তথ্য দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

গবেষণার প্রধান ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সরোয়ার। তিনি জানান, সম্প্রতি রাজধানীর ৩৮৪ জন রিকশাচালক, ৩৯২ জন যাত্রী ও ৬৩টি গ্যারেজের মালিকের মতামতের ভিত্তিতে ‘আরবান মবিলিটি স্টাডি: রিকশা ইন ট্রানজিশন’ নামের এ গবেষণা করা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, রাজধানীতে চলাচল করা বেশির ভাগ রিকশার নিবন্ধন নেই। ব্যাটারিচালিত রিকশার ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ আর প্যাডেল রিকশার ৮৫ দশমিক ৯৪ শতাংশের কোনো নিবন্ধন নেই। ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের ৭৫ শতাংশেরই আগে রিকশা চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। এই পেশায় যাঁরা আসছেন, তাঁরা তুলনামূলক তরুণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ যাত্রী যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নেন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যাত্রীদের কাছে প্যাডেল রিকশার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুততর, কম ভাড়া ও সহজলভ্য মনে হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন ৩০ শতাংশ যাত্রী। প্যাডেল রিকশায় এ ঝুঁকির কথা বলেছেন ১৮ শতাংশ যাত্রী।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬২ শতাংশ মনে করনে, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে শহরে যানজট বেশি হচ্ছে। ৩৪ শতাংশ যানজটের জন্য প্যাডেল রিকশাকে দায়ী করেছেন। আর ৪ শতাংশ যাত্রী মনে করেন, সব রিকশাই যানজটের জন্য দায়ী।

তবে যানজটের জন্য শুধু রিকশাই দায়ী বলে মনে করেন না ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট অফিসার মো. সেলিম খান। আলোচনা সভায় তিনি বলেন, রিকশা হয়তো কিছুটা দায়ী। কিন্তু সড়কের পাশে ও ফুটপাতে যেসব অবৈধ দোকান বা স্থাপনা গড়ে ওঠেছে, সেগুলো যানজটের মূল কারণ।

রাজধানীতে প্রায় ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চললেও কোথাও পার্কিংয়ের স্থান নেই বলে অভিযোগ করেন সেলিম খান। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে এসব রিকশা যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকে। চাপ পড়ে পুলিশের ওপর। তিনি সিটি করপোরেশনকে সড়কে রিকশা দাঁড়ানোর জন্য জায়গা চিহ্নিত করে দেওয়ার (মার্কিং লাইন) পরামর্শ দেন।

গবেষণায় বলা হয়, ব্যাটারিচালিত রিকশার ৭৯ শতাংশ আর প্যাডেল রিকশার ৬৫ শতাংশই চালকদের নিজের নয়। চালকদের ঋণের বোঝাও বেশি। ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের গড় ঋণের পরিমাণ ৭৯ হাজার ৯২৭ টাকা। আর প্যাডেল রিকশার চালকদের গড় ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৬৫৪ টাকা।

আলোচনা সভায় বক্তারা ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও রিকশা লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্টসংখ্যক রিকশা অনুমোদনের পরামর্শ দেন। তাঁরা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনায় আনতে হলে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, রিকশামালিক–শ্রমিক, ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনকারীদের সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।

রাজধানীতে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর ব্যাটারিচালিত রিকশা বেড়েছে বলে জানান ভয়েস ফর রিফর্মের উদ্যোক্তা ও সংগঠক ফাহিম মাসরুর। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অনেক ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। কিন্তু সরকার হয়তো কোনো একটা দিক বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক ও মালিকদের কিছুটা ছাড় দিয়েছে। এর ফলে এটা অনেক বেড়েছে।

বর্তমানে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা অনেক ধরনের সমস্যা তৈরি করছে উল্লেখ করে ফাহিম মাসরুর বলেন, অনেকেই সাময়িক বেকারত্ব কাটাতে এই পেশায় যুক্ত হন। তাই তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিতের পাশাপাশি পুরো খাতটিকে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় নিয়ে আসতে হবে।

রাজধানীর মানুষের যাতায়াতকে সহজ করার জন্য পাবলিক বাস পরিষেবাকে আরও উন্নত করার পক্ষে মত দেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মো. মুসলেহ উদ্দিন হাসান। আর পরবর্তী আলোচনায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মানুষদের যুক্ত করার পরামর্শ দেন ভয়েস অব রিফর্মের সদস্য হাসিবুদ্দিন হোসাইন।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আখতার মাহমুদ, আকিজ মটরসের মহাব্যবস্থাপক ইফতেখার হোসাইন প্রমুখ। এ ছাড়া মতামত দেন ব্যাটারিচালিত রিকশামালিক ও চালকদের প্রতিনিধিরা।