কিরীটি রায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) সাধারণ সম্পাদক। সত্তরের দশকে তিনি সিপিআই–এমের (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া–মার্ক্সিস্ট) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তের মানুষ কেমন আছে, তা নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা শুভজিৎ বাগচী।
প্রথম আলো: দীর্ঘদিন আপনি বলছেন সীমান্তে নিয়মিত হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এই সংখ্যা কত?
কিরীটি রায়: ২০১৪ সালের পর থেকে প্রতিবছর গড়ে ২০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এই সংখ্যাটা ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছিল গড়ে ১৫০।
প্রথম আলো: এরা কি ভারতীয়, না বাংলাদেশি?
কিরীটি রায়: মোটামুটি ৮০ শতাংশ ভারতীয়, ২০ শতাংশ বাংলাদেশি। এই ভারতীয়দের কথা কেউ বলে না।
প্রথম আলো: আপনারা নিয়মিত এসব তথ্য নথিভুক্ত করছেন এবং ভারতের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, আদালতকে জানাচ্ছেন। তথ্য আপনাদের কে দিচ্ছে?
কিরীটি রায়: পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে আমার মতে, এক থেকে দেড় কোটি মানুষ আছে। এদের বড় অংশ রয়েছে কাঁটাতারের বেড়ার এপারে অর্থাৎ ভারতের ভূখণ্ডে ভেতরে। একটি অংশ (অপেক্ষাকৃত সংখ্যায় কম) রয়েছে কাঁটাতারের ওপারে কিন্তু ভারতের ভূখণ্ডে, জিরো পয়েন্ট থেকে ১৫০ গজের মধ্যে। এই ১৫০ গজ ছাড়া হচ্ছে জেনেভা কনভেনশনের নিয়ম মেনে। ওই অঞ্চলে কোনো প্রতিরক্ষা-সম্বন্ধীয় পরিকাঠামো বানানো যাবে না।
সমস্যাটা হলো নানা কারণে এটা দেওয়া হচ্ছে দুই বা পাঁচ বা এমনকি আট-দশ কিলোমিটার ভেতরে। ফলে এসব অঞ্চলে যাঁরা থাকেন, তাঁদের সমস্যার শেষ নেই। দু–একটির কথা বলছি। এখানে মানুষের প্রধান জীবিকা হলো চাষাবাদ অথবা মাছ ধরা।
তাঁদের জমি অথবা পুকুরের বিরাট অংশ চলে যাচ্ছে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে—ওই পাঁচ-দশ কিলোমিটারের মধ্যে। এটা তাঁদের বাপ-দাদার জমি। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির অনেক আগে থেকে তাঁরা ওখানে বসবাস করেন। একটা কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হলো, সেখানে গেট বসিয়ে, তালা লাগিয়ে বলা হলো দিনের নির্দিষ্ট সময়ে খোলা থাকবে। একজন মৎস্যজীবী কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে গেলে, তাঁকে যেতে হবে সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে। মাছ ধরার সবচেয়ে ভালো সময় হলো মাঝরাত, যখন চারদিক নিস্তব্ধ থাকে। কিন্তু আপনি যেতে পারছেন না। কৃষক হয়তো দেখলেন, দুপুরের কোনো সময়ে বেড়ার কাছাকাছি বাংলাদেশের গরুতে ফসল খেয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাদের তাড়াতে যেতে পারবেন না।
প্রথম আলো: নিয়মিত আপনি খবর পাচ্ছেন কীভাবে?
কিরীটি রায়: আমরা দীর্ঘদিন এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কাজ করছি। তাদের একটা বিশ্বাস আমাদের ওপরে তৈরি হয়েছে। আমরা কিছু গ্রামবাসী নিয়ে গ্রামে গ্রামে কমিটি তৈরি করেছি। কমিটির নাম ‘আমরা সীমান্তবাসী’। এখন প্রায় ১০০ কমিটি বিভিন্ন গ্রামে কাজ করছে। আমাদের স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক আছেন। অত্যাচারের ঘটনা নথিভুক্ত করে আক্রান্তের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের সনদ জোগাড় করার চেষ্টা করছি।
কিছুটা স্বাস্থ্য পরিষেবা ও আইনি সহায়তাও দেওয়ার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি গোটা প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রাজ্যে ও কেন্দ্রের মানবাধিকার কমিশন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, গণমাধ্যম এবং মানুষকে জানানোর চেষ্টা করছি।
প্রথম আলো: আপনাকে কখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি?
কিরীটি রায়: অবশ্যই হয়েছে। বিভিন্ন সময়, আমার নামে ছয়-সাতটি মামলা হয়েছে। সিপিআই–এমের এবং তৃণমূল দুয়ের আমলেই হয়েছে।
প্রথম আলো: আপনাদের তহবিলের উৎস কী?
কিরীটি রায়: আমাদের সীমান্ত কমিটিকে গ্রামের মানুষ অনুদান দেয়। সেই অনুদানে তারা চলে। কিন্তু আমাদের নিজস্ব খরচ জোগাড় করতে সমস্যা হচ্ছে। প্রথমত, আমরা বিদেশ থেকে টাকা নিতে পারি না। আমাদের এফসিআরএ (ফরেন কন্ট্রিবিউশন রেগুলেশন) নেই। একটা অনুদান পাই ইউনাইটেড নেশনস ফর ভলান্টারি ফান্ড ফর ভিকটিমস অব টর্চার থেকে। যেহেতু ভারত জাতিসংঘের এই শাখার সদস্য, তাই এফসিআরএ না থাকলেও অনুদান পাওয়া যায়। অনুদান ব্যাংকে আসার পরে এবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা কলকাতা হাইকোর্টে গেছি। এখন বন্ধুবান্ধবের সাহায্যে চালাচ্ছি।
প্রথম আলো: সম্প্রতি সীমান্ত নিয়ে এক গণশুনানিতে আপনি বলেছেন, সীমান্তে হত্যা এবং বিশেষত ফেলানী খাতুন হত্যা আমাদের লজ্জা…
কিরীটি রায়: আবারও বলছি। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কিশোরী ফেলানীকে খুন করে বিএসএফ। ঘটনাটি ঘটেছিল দিনহাটার চৌধুরীহাট সীমান্তে। বলা হয়, ফেলানী খাতুন নামে বাংলাদেশের নাগরিক বিএসএফকে আক্রমণ করেছে, তাই হত্যা। আমরা ঘটনার তদন্ত করি। তদন্ত শেষে আমরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জানাই কী ঘটেছিল।
কমিশন ঘটনার পর্যালোচনা শেষে রিপোর্টে বলে, মেয়েটি কোনো অবস্থাতেই বিএসএফকে আক্রমণের অবস্থায় ছিল না। তার কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত জিনিসের মধ্যে কোনো অস্ত্র ছিল না। এর আগেই বিএসএফের বিশেষ আদালত বিষয়টি শুনেছিল। এখানে বিচারপতি, বাদী এবং বিবাদীপক্ষের আইনজীবী, অভিযুক্ত সবাই বিএসএফ।
এটি খোলা আদালত নয়। বিএসএফ ‘রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্টের’ (তথ্য জানার অধিকার আইন) আওতায়ও আসে না। ফলে অভিযুক্ত অমিয় ঘোষ ছাড়া পেলেন। এটা নিয়ে ভারতে এবং বিশেষত বাংলাদেশে অনেক আলোচনা–সমালোচনা রয়েছে।
এরপর আমাদের আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির আবার শুনানি হলো।
২০১৩ সালে সব পক্ষকে নিয়ে আসা হলো। আমি ও ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম ২০১৫ সালে মামলা করেছিলাম সুপ্রিম কোর্টে। ২০১৬ থেকে ছয় বছর পার হয়ে গেছে। অপর পক্ষ তাদের জবাব জমা দিয়েছে। এরপর সবকিছু তৈরি, পরের শুনানিতে রায় বেরোবে। সেই শুনানি এবং রায় বেরোল না। সেই কারণেই বলেছি ফেলানী হত্যা ভারতের লজ্জার।
প্রথম আলো: সীমান্ত নিয়ে এ রকম মামলা কি আরও আছে?
কিরীটি রায়: অসংখ্য। ২০১২ সালে একটা মামলা করেছিলাম সুপ্রিম কোর্টে। ১৫২টি ঘটনা—খুন, ধর্ষণ, অত্যাচার সব ঘটনা এক জায়গায় এনে মামলাটা করা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র দপ্তর, বিএসএফ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, রাজ্য পুলিশ এদের কথা শোনা হয়েছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে পরের শুনানিতে রায় দিতে হবে। পাঁচ বছরে সেই দিনটা এল না। এমন তিন শতাধিক মামলা রাজ্যের বিভিন্ন আদালতে পুলিশ-বিএসএফের বিরুদ্ধে রয়েছে। কিন্তু বিচার হয়নি।
প্রথম আলো: আপনি এসব করছেন মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে। এটা জরুরি কিন্তু মানবাধিকারের ওপরে বেশি জোর দিলে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিকে লঘু করা হয় বলে কি আপনার মনে হয় না?
কিরীটি রায়: মানবাধিকারের প্রশ্ন রাষ্ট্রের সংবিধানের আওতাধীন। বিএসএফ বা সরকারের কোনো বাহিনীই সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। ওই (সীমান্ত) অঞ্চলে মানুষ নিয়মিত মারা যাচ্ছে। তাঁরা তো সারাক্ষণ বলছেন, আমরা জমি বিক্রি করতে চাই। সরকারের যদি নিরাপত্তা নিয়ে এত উদ্বেগ থাকে, তাহলে জমি কিনে নিক। সরকার তা না করে এখন সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার ভেতরে বিএসএফের নজরদারি বাড়াবে বলে নির্দেশ দিয়েছে। এর অর্থ রাজ্যের ২০-৩০ শতাংশ অঞ্চল রাজ্য পুলিশের এখতিয়ার থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে চলে যাওয়া।
প্রথম আলো: তাহলে আপনারা কী চান?
কিরীটি রায়: আমার মত পরিষ্কার। দুই বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্তের সঙ্গে জেনেভা কনভেনশনের কোনো সম্পর্ক নেই। পাকিস্তান না হয় শত্রুরাষ্ট্র ছিল, বাংলাদেশ তো শুনি পরম বন্ধুরাষ্ট্র। নেপাল বা ভুটানের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত আছে? সেখানে বিএসএফ নেই, এসএসবি (সীমা সশস্ত্র বল) আছে। ওই দুই সীমান্ত, বাংলাদেশ সীমান্তের মতো রক্তাক্ত নয়। নেপাল বা ভুটানের মানুষ নিশ্চিন্তে ভারতে আসতে পারেন, ভারতীয়রাও নির্বিঘ্নে সেখানে যেতে পারেন। কারও পাসপোর্ট, ভিসার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈষম্য কেন?
বাংলাদেশের কথা ভুলে যান, এরা তো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের দেশের কৃষককে মারছে। বলছে, সে আক্রমণ করেছিল অথচ মৃতের কাছ থেকে একটা হেঁসো বা কাস্তে পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে মারা গেছেন মাথার পেছনে গুলি খেয়ে। এই যে বিরাট আধা সেনাবাহিনী নিয়মিত স্থানীয় মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার নামে টহল দিচ্ছে, যখন তখন হেনস্তা, গ্রেপ্তার বা গুলি করছে, এটার ভারতীয় সংবিধানে বিচার চাইছি।
প্রথম আলো: আপনি তো প্রায়ই সীমান্ত তুলে দেওয়ার কথা বলছেন।
কিরীটি রায়: সীমান্ত তুলে দিতে বলছি না। মানবিক সীমান্ত চাইছি। বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈষম্য নয়। আরও একটা কথা। আজ ভারতের কাছে এমন সরঞ্জাম রয়েছে, যার মাধ্যমে দিল্লি বা কলকাতায় বসে বা মহাকাশে থেকে সীমান্তের ওপরে নজর রাখা সম্ভব। সীমান্ত থেকে একটু ঢুকে আধা সামরিক বাহিনীর বিরাট ছাউনি রয়েছে। যারা অনুপ্রবেশ করছে, তাদের ধরে আদালতে নিয়ে যাও। কিন্তু সেটা করা হবে না। এর কারণ আছে।
প্রথম আলো: কী কারণ?
কিরীটি রায়: সীমান্ত দিয়ে সারাক্ষণ পাহারাদারদের সম্মতিতেই চোরাচালান হচ্ছে। যাঁরা রোজগার করছেন, তাঁরা সব বিখ্যাত মানুষ। ফলে তাঁদের রোজগার বাড়াতে সীমান্তে মানুষকে গুলি খেতে হবে। দ্বিতীয় কারণ আরও সহজ। ওখানে মূলত মুসলমানরা থাকেন। এই কারণে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিলেও পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে কেন একটিও সীমান্ত হাট চালু করা হয়নি। এতে তো সীমান্তবাসীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন হতো, চোরাচালানও কমত। আর বিএসএফ কাঁটাতারের এ পাশে না থেকে প্রকৃত সীমান্তে গিয়ে পাহারা দিলে চোরাকারবারিদেরও আটকাতে পারবে এবং গ্রামের মানুষেরও উপকার হবে।