‘সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে এই অবস্থা আমাদের জন্য আতঙ্কের’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথম আলোর আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে শিল্প–আয়োজন ‘আলো’ দেখতে আসেন। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারেছবি: প্রথম আলো

‘পুড়ে যাওয়া ভবন দেখে বোঝা যাচ্ছে, এই হামলা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের চেষ্টা। আমরা সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে বুঝতে পারি, গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা জরুরি।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা এ কথা বলেন। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে তরুণ শিক্ষার্থীরা এই পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হবেন।

প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত ‘আলো’ প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন তিনি। আজ বৃহস্পতিবার এই প্রদর্শনী দেখতে আসেন এই বিভাগের অর্ধশত শিক্ষার্থী।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে একদল উগ্রবাদী প্রথম আলো ভবনে হামলা করে ব্যাপক লুটপাট চালায়। এরপর ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিদগ্ধ এই ভবনে ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে বিশিষ্ট শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের শিল্প প্রদর্শনী ‘আলো’।

অগ্নিদগ্ধ ও আক্রান্ত ভবন দেখে শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা বলেন, দুঃখজনক হলো এখনো এই ঘটনার কোনো বিচার হয়নি। সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে এই অবস্থা আমাদের জন্য আতঙ্কের। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে।

শিক্ষার্থীরা ভবন ঘুরে ঘুরে দেখেন
ছবি: প্রথম আলো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মিঠুন মিয়া বলেন, গণমাধ্যমকে কীভাবে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়, সেটা দেখাতেই তিনি শিক্ষার্থীদের এখানে নিয়ে এসেছেন।

প্রথম আলোর ওপর আক্রমণ নিয়ে এই শিক্ষক বলেন, ‘যারা আক্রমণ করেছে, তারাই এখন জাতির কাছে নিকৃষ্ট বলে প্রমাণিত হয়েছে। আলোকে কখনো নেভানো যায় না। বরং যারা আক্রমণ করেছে, তারা আলোর ক্ষমতা সম্পর্কে জানে না বলেই এমনটি করেছে। আমাদের প্রত্যাশা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক। প্রথম আলো পুরোদমে কাজ করুক।’

বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত প্রদর্শনী দেখতে শতাধিক দর্শনার্থী আসেন। কেউ বন্ধুদের নিয়ে, কেউ পরিবারসহ শিল্পকর্মগুলো ঘুরে দেখেন। এই দর্শনার্থীদের অনেকেই বলছিলেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনের ভিডিও দেখেও যে ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারেননি, এই প্রদর্শনী তা নতুন করে অনুভব করিয়েছে। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

পুড়ে যাওয়া নথি দেখছেন শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

সকালে প্রদর্শনী দেখতে আসেন বেসরকারি ইউসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের একদল শিক্ষার্থী। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন বিভাগটির প্রভাষক আহমেদ বিন কাদের। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দেখাতে চেয়েছি যে বাংলাদেশে প্রথম সারির গণমাধ্যমটি কতটা জঘন্য আক্রমণের শিকার হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দেখা উচিত, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা করুণ।’

ভয় থাকবে, কিন্তু সাংবাদিকতা কখনো থেমে থাকবে না। প্রথম আলো সেটা প্রমাণ করেছে বলেন ইউসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবিদা আফসারা গোলন্দাজ। তিনি বলেন, ‘এ প্রদর্শনীটা একটা তীব্র যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি দেয়। আমার ভাবতে খারাপ লাগছে, যেদিন আগুন দেওয়া হয়েছিল, সেদিন ভবনের ভেতরে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের প্রাণ কতটা হুমকিতে ছিল।’

প্রথম আলোকে দমিয়ে রাখা যায়নি উল্লেখ করে এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে এ হামলা আমাদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। কিন্ত প্রথম আলো পুরোদমে কাজ করছে, এটা দেখে সেই ভয়টা আর নেই। প্রথম আলো প্রমাণ করেছে, গণমাধ্যমকে দমিয়ে রাখা যায় না।’

প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

প্রদর্শনী দেখা শেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, প্রথম আলোতে হামলার সময় যে সরকার দায়িত্বে ছিল, তারা চাইলে হামলা ঠেকাতে পারত। তাদের কাছে হামলাসম্পর্কিত তথ্য থাকার কথা। কিন্তু তারা হামলা ঠেকায়নি। প্রথম আলোকে রক্ষা করেনি।

আনিসুল হক আরও বলেন, ‘প্রথম আলোর অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু হামলার পর এই প্রদর্শনী প্রথম আলোকে শক্তি জুগিয়েছে। তাই হামলার পরও আমরা সত্য সাংবাদিকতা করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কারণ, সত্যই আমাদের সাহস।’