সড়কের পাশে জটলা দেখে এগিয়ে যান যুবক, দেখেন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কাতরাচ্ছেন তাঁরই চাচা

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মরদেহবাহী ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে বাবার মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পুলিশ সদস্যের তিন সন্তান। গতকাল সকালে ফেনী সদর উপজেলার গিল্লাবাড়িয়া এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

বিয়ের দাওয়াতে যাওয়ার পথে সামনে দুর্ঘটনা দেখে গাড়ি থামিয়েছিলেন নাসির উদ্দিন (২৫)। সড়কে তখন মানুষের জটলা। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে দেখতে এগিয়ে গিয়ে নাসিরের চোখ আটকে যায়। আহত ব্যক্তি আর কেউ নন, তাঁর নিজেরই চাচা জাহাঙ্গীর আলম (৪৩)।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ফেনী সদর উপজেলার কাজিরবাগ বাজারে ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় আহত জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি পুলিশ কনস্টেবল পদে কর্মরত ছিলেন।

জাহাঙ্গীর সাপ্তাহিক ছুটিতে চট্টগ্রাম থেকে ফেনীর গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন। বাড়ি পৌঁছানোর কয়েক কিলোমিটার আগে এলজিইডির একটি পিকআপ ভ্যান তাঁকে বহন করা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে চাপা দেয়।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নাসির উদ্দিন বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময় আমি সামনের একটি মাইক্রোবাসে ছিলাম। আমরা একটা বিয়ের দাওয়াতে যাচ্ছিলাম। দুর্ঘটনার পর আশপাশের সবাই মোবাইলে ভিডিও করা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। পরে আমি এগিয়ে এসে দেখি দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি আমার চাচা জাহাঙ্গীর।’

‘বাবা বলেছিল, বার্ষিক পরীক্ষায় আমার রোল ১ থেকে ৩ নম্বরের মধ্যে এলে নতুন বছরে বেড়াতে কক্সবাজার নিয়ে যাবেন। আমার সেই ইচ্ছা পূরণ হলো না, বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।’
মোবাশ্বেরা তানহা, জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ে

জাহাঙ্গীর ফেনী সদর উপজেলার কাজিরবাগ ইউনিয়নের গিল্লাবাড়িয়া গ্রামের মুন্সী হাজি বাড়ির আবদুল কাদেরের ছেলে। তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা ছিলেন। নাসিরের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় কয়েকজন আহত জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার না করে তাঁর মুঠোফোন, মানিব্যাগ নিয়ে চলে যান। জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার করে ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসা পেতেও নানান দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বলে দাবি নাসিরের। তিনি বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। পরে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাহাঙ্গীরকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ফেনী থেকে চট্টগ্রামের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া সাধারণত সাড়ে তিন হাজার টাকা হলেও তাঁদের কাছ থেকে আট হাজার টাকা নেওয়া হয়।

বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনা

সাপ্তাহিক ছুটিতে বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম থেকে ফেনীর উদ্দেশে রওনা দেন জাহাঙ্গীর। দুপুর ১২টার দিকে ফেনী শহরে নেমে বাড়ির জন্য বাজার-সদাই করেন। পরে বেলা তিনটার দিকে হাসপাতাল মোড় থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে বাড়ির পথে রওনা হন।

কাজিরবাগ বাজারের মজিদ মিয়ার রাইস মিলের সামনে পৌঁছালে পরশুরাম থেকে ফেনীমুখী এলজিইডির একটি পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে অটোরিকশার সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, পিকআপ ভ্যানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে একটি যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। পরে জাহাঙ্গীরকে বহনকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটিকে চাপা দেয়।

দুর্ঘটনার পর অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। আর জাহাঙ্গীর গুরুতর আহত হয়ে সড়কের পাশে ছিটকে পড়েন। এতে তাঁর মাথার খুলি ভেঙে যায়। এ ছাড়া বাঁ পা থেঁতলে যায় ও ডান পা ভেঙে যায়। দুর্ঘটনায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দুই নারী যাত্রীও আহত হন।

চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক বলেন, জাহাঙ্গীর তাঁদের থানায় কর্মরত ছিলেন। ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে ফেনীতে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সজল কান্তি দাস বলেন, দুর্ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে এলজিইডির পিকআপ ভ্যানটি জব্দ করে। রাতে রেকার ট্রাক দিয়ে সেটি থানায় আনা হয়। দুর্ঘটনার পর পিকআপ ভ্যানের চালক পালিয়ে যান। শুক্রবার বেলা ১১টা পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ আসেনি। নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বজনদের আহাজারি

বৃহস্পতিবার মধ্যরাত আড়াইটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে জাহাঙ্গীরের মরদেহ ফেনীর গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। এর সঙ্গে পুলিশের লাল পতাকাবাহী একটি পিকআপ ভ্যানও চট্টগ্রাম থেকে ফেনীতে আসে। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

জাহাঙ্গীরের মামাতো ভাই মো. জহির উদ্দিন বলেন, চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর ছিলেন চতুর্থ। ২০০৯ সালে তাঁর বিয়ে হয়। তিনি সব সময় পরিবারের খোঁজখবর রাখতেন। তিন সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন ছিল তাঁর।

জাহাঙ্গীরের প্রতিবেশী ও জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে জাহাঙ্গীরের বাবা মারা যান। তাঁর বাবা কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। বাবার মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর সংসারের হাল ধরেন। বোনদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর মাকে আগলে রেখেছিলেন তিনি। একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে বৃদ্ধ মা অনেকটা ভেঙে পড়েছেন।

সন্তানদের কক্সবাজারে নেওয়ার ইচ্ছা পূরণ হলো না

জাহাঙ্গীরের একমাত্র মেয়ে মোবাশ্বেরা তানহা (১২) কাজিরবাগ হাজি দোস্ত মোহাম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। বাবার সঙ্গে তাঁর নিয়মিত ফোনে কথা হতো। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোবাশ্বেরা বলে, ‘বাবা আমাকে অনেক আদর করতেন। বাবা গতকাল সকালে ফোন করে আমার কাছ থেকে বাজারের লিস্ট নিয়েছিলেন। বাবা বলেছিল, বার্ষিক পরীক্ষায় আমার রোল ১ থেকে ৩ নম্বরের মধ্যে এলে নতুন বছরে বেড়াতে কক্সবাজার নিয়ে যাবেন। আমার সেই ইচ্ছা পূরণ হলো না, বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।’

জাহাঙ্গীরের বড় ছেলে মো. আল আমিন তুহিন (১৫) একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়ছে। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা তাঁর। বাবার সঙ্গে নিয়মিত ফোনে কথা না হলেও পড়াশোনায় বাবা সব সময় সহযোগিতা করতেন বলে জানায় তুহিন।

নিহত পুলিশ সদস্য জাহাঙ্গীর আলম
ছবি : সংগৃহীত

তুহিন বলে, ‘তিনি ছুটি পেলেই আমাদের জন্য বাজার-সদাই করে নিয়ে আসতেন। বাবা আমাকে বলেছিলেন, এসএসসিতে আমি ভালো ফলাফল করলে আমাকে কক্সবাজার বেড়াতে নিয়ে যাবেন। এভাবে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন আমরা কল্পনাও করিনি।’

জাহাঙ্গীরের ভাগনে মো. সুরজ মিয়া বলেন, জাহাঙ্গীর ২০০১ সালে কাজিরবাগ হাজি দোস্ত মোহাম্মদ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে হাসানপুর শাহ আলম চৌধুরী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০০৩ সালে পুলিশে যোগ দেওয়ার পর চট্টগ্রামে স্নাতক পড়াশোনা শেষ করেন। গত ২৩ বছর তিনি চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় কর্মরত ছিলেন।

পুলিশ লাইনসে প্রথম জানাজা

বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনসে জাহাঙ্গীর আলমের প্রথম জানাজা হয়। পরে আজ সকাল ১০টায় বাড়ির পাশে গিল্লাবাড়িয়া জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা হয়। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। এতে আত্মীয়স্বজন ছাড়াও কয়েক শ এলাকাবাসী অংশ নেন।

ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক সাজিদ কামাল বলেন, তিনি চট্টগ্রামে কর্মরত থাকার সময় কনস্টেবল জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। জাহাঙ্গীর অত্যন্ত বিনয়ী ও কর্তব্যপরায়ণ পুলিশ সদস্য ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে খুলশী থানা-পুলিশ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে।