জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার নির্মাণে আবার বিদেশি ঋণ চায় সরকার

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডফাইল ছবি: প্রথম আলো

দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে এবার বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হলেও নতুন সরকার এখন ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) ঋণে অর্থায়নের পথ খুঁজছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে আইডিবির কাছে প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি ডলার ঋণ চাওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে)।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঋণের সুদহার ও অন্যান্য শর্তে দুই পক্ষের সমঝোতা হলে আইডিবির ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। তবে ঋণের শর্তে একমত না হলে বিকল্প পথে হাঁটবে সরকার। সে ক্ষেত্রে চীনের এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এ প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে।

‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল-২’ নামে প্রকল্পটি প্রথম নেওয়া হয় ২০১২ সালে। এরপর অন্তত ১১ বার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধিত হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। দীর্ঘ বিলম্বের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুমোদন পেলেও অর্থায়ন কাঠামো আবার পরিবর্তনের মুখে পড়েছে।

ইআরডির অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আইডিবি এ প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ প্রকল্পে অর্থায়নে আইডিবিকে অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে বিষয়টি আর এগোয়নি।

ইআরএল প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনায় ৮ মার্চ আইডিবির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে এসেছিল। চার দিনের সফরে দলটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রকল্প এলাকা ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট পরিদর্শন করে। চার দিনের সফর শেষে ১১ মার্চ সৌদি আরবে ফিরে যায় প্রতিনিধিদলটি। দেশটির জেদ্দায় আইডিবির সদর দপ্তর।

দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত হয়
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

সরকারের কাছে বেশ কিছু তথ্য চেয়েছে আইডিবি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, সরকার ইতিমধ্যে আইডিবির চাওয়া সমীক্ষা প্রতিবেদন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি), সরকারি ক্রয়কৌশল পরিকল্পনা, ঋণছাড় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার তথ্য পাঠিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে দুই পক্ষের মধ্যে ঋণচুক্তি হবে।

আইডিবি এ প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব, ইআরডি

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, আইডিবি এ প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হবে।

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, আইডিবির ঋণের বর্তমান সুদহার সাড়ে ৩ শতাংশ। ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ৩ থেকে ৫ বছর এবং পরিশোধকাল ২০ থেকে ২৫ বছর। তবে সরকার চায় সুদহার দেড় শতাংশের মধ্যে রাখতে। দুই পক্ষের বৈঠকে ঋণের সুদের হার নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

একনেকে অনুমোদন, তবে অর্থায়ন বদলের ইঙ্গিত

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গত ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ইআরএল আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয় ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা দিয়ে বাকি ১২ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে অর্থায়ন হবে বলে ধরা হয়েছিল।

২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখন বিদেশি ঋণ প্রক্রিয়ায় গেলে সময় আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা।

কখনো সরকারি অর্থায়নে, কখনো বিদেশি ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা বলে ইতিমধ্যে এক যুগের বেশি সময় চলে গেছে। ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল-২’ নামে প্রকল্পটি প্রথম নেওয়া হয় ২০১২ সালে। এরপর অন্তত ১১ বার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধিত হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। দীর্ঘ বিলম্বের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুমোদন পেলেও অর্থায়ন কাঠামো আবার পরিবর্তনের মুখে পড়েছে।

বিপিসি জানিয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইআরএলের বার্ষিক পরিশোধনক্ষমতা বর্তমান ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে প্রায় ৫৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এতে দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নিজেদের টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গেলে বাজেটের ওপর চাপ পড়বে। নিজেদের টাকায় এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই। তাই সরকার প্রকল্পটি বিদেশি ঋণে বাস্তবায়ন করতে চাইছে। এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরবের কাছে ঋণসহায়তা চাওয়া হয়েছে। সুদহারসহ ঋণের অন্যান্য শর্তে দুই পক্ষ এক না হলে সরকার অন্য কোনো উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে আলোচনা করবে।

ক্ষমতা বাড়বে তিন গুণের বেশি

দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর প্রতিবছর দেশে তেলের চাহিদা বাড়লেও ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধনক্ষমতা বাড়েনি। এ কারণে প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫৭ বছর পর এসে পতেঙ্গায় নিজস্ব জায়গাতেই ইআরএলের দ্বিতীয় তেল পরিশোধন ইউনিট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

ইআরএলের বার্ষিক পরিশোধনক্ষমতা বর্তমানে ১৫ লাখ টন
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

বিপিসি জানিয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইআরএলের বার্ষিক পরিশোধনক্ষমতা বর্তমান ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে প্রায় ৫৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এতে দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে।

বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট চালু করা গেলে দেশে জ্বালানি খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে। এ ছাড়া পরিবেশসহায়ক জ্বালানি তেল উৎপাদন এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি-নির্ভরতা কমবে। মজুতের ক্ষমতাও বাড়বে।

আরও পড়ুন

সালফার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে চাপ

জ্বালানি তেল পরীক্ষা করা দুটি সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) পরীক্ষায় দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি সালফার পাওয়া গেছে।

দুটি সংস্থার পরীক্ষায় কিছু নমুনায় জ্বালানি তেলে সালফার নির্ধারিত মাত্রা, অর্থাৎ ৩৫০ পিপিএমের (পার্টস পার মিলিয়ন) নিচে পাওয়া গেছে। কিছু নমুনায় পাওয়া গেছে ১ হাজার ৩৪৮ থেকে ২ হাজার ৮০০ পিপিএম পর্যন্ত।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানিনিরাপত্তা বাড়ানো, পরিবেশসহায়ক জ্বালানি তেল উৎপাদন এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি-নির্ভরতা কমাতে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইআরএলের পরিশোধনক্ষমতা বর্তমানের চেয়ে আরও ৩০ লাখ টন বাড়বে।