নিজের গাড়ি রেন্ট-এ–কারের মাধ্যমে বাসসকে ভাড়া দিয়েছিলেন মাহবুব মোর্শেদ
নিজের মালিকানাধীন একটি গাড়ি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেছিলেন মাহবুব মোর্শেদ, যখন তিনি সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে ছিলেন। ওই গাড়ি ভাড়া বাবদ মাসে নেওয়া হতো দেড় লাখ টাকা।
মাহবুব মোর্শেদ সম্প্রতি বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট গল্পকার-সাংবাদিক মাহবুব মোর্শেদকে দুই বছরের জন্য বাসসের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পরদিনই বাসসে গিয়ে কর্মীদের ‘বিক্ষোভের’ মুখে পড়েন তিনি। তখন তিনি অফিস থেকে চলে যান এবং ফেসবুক এক পোস্টে ‘মব তৈরি করে’ তাঁকে ‘অপসারণের’ জন্য চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। পরে তাঁর পদত্যাগের খবর আসে। সর্বশেষ ১ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনে তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
না, এ রকম কিছু ঘটে নাই।
এর আগে মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি গঠিত এ কমিটিকে ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর সপ্তাহ তিনেক পর মাহবুব মোর্শেদের পদত্যাগের খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, এমন খবর পাওয়া যায়নি।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং বাসস সূত্রের দাবি, মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ তদন্ত কমিটির কাছে জমা পড়েছে। এর মধ্যে নিজের গাড়ি বাসসকে ভাড়া দেওয়া, নিজের বেতন ও ভাতা নিজেই নির্ধারণ, পদ না থাকলেও নিয়োগ এবং কর্মীদের হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
নথিপত্র থেকে জানা গেছে, মাহবুব মোর্শেদের মালিকানাধীন টয়োটা এলিয়ন মডেলের একটি গাড়ি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাসিক দেড় লাখ টাকা ভাড়ায় বাসসের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। এটি স্বার্থের দ্বন্দ্ব ঘটায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
বাসস সূত্র বলছে, গাড়িটি মাহবুব মোর্শেদ নিজে ব্যবহার করতেন। তবে এমডির ব্যবহারের জন্য আগে থেকেই বাসসের নিজস্ব একটি গাড়ি রয়েছে। সেটা মাঝেমধ্যে ব্যবহার করতেন মাহবুব মোর্শেদ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট দুই বছরের জন্য বাসসের এমডি পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন মাহবুব মোর্শেদ। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর বাসসে গিয়ে কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। তাঁকে অপসারণের চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর ১ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে।
নথিপত্র বলছে, মাহবুব মোর্শেদের ব্যক্তিগত গাড়িটির জন্য দেড় লাখ টাকা ভাড়া (জ্বালানি, চালক, অন্যান্য ব্যয়সহ) নির্ধারণ করা হয়। এটা সপ্তাহে ৭ দিন ও দিনের পুরো ২৪ ঘণ্টা সময়ের জন্য।
একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি গাড়িও বাসসে ভাড়ায় চলছে, সেই গাড়ির ভাড়া মাসে ৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এই গাড়ির ভাড়া অর্ধেকের কম। দ্বিতীয় গাড়ির চুক্তিতে অবশ্য সপ্তাহে ৭ দিন ও ২৪ ঘণ্টার কথা উল্লেখ নেই।
এ বিষয়ে মাহবুব মোর্শেদের বক্তব্য জানতে গত ১৬ মার্চ তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। তিনি বলেন, ‘এগুলো নিয়ে কথা বলার মতো মানসিকতা নাই আমার।...রিপোর্ট করেন আপনি। শুভেচ্ছা থাকল।’
ব্যক্তিগত গাড়ি বাসসে ভাড়ায় খাটানো এবং বিল তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুব মোর্শেদ বলেন, ‘না, এ রকম কিছু ঘটে নাই।’ এরপর এই প্রতিবেদকের পরিচয় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ফোন রেখে দেন তিনি।
পরে মাহবুব মোর্শেদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অভিযোগের বিস্তারিত জানিয়ে তাঁর বক্তব্য চাওয়া হয়। প্রয়োজনে দেখা করে পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে বক্তব্য নেওয়া হবে বলে জানানো হয়। তবে তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাসসের সঙ্গে গাড়িভাড়ার চুক্তি করা প্রতিষ্ঠানটির নাম রেন্ট–এ-কার সার্ভিস। বর্তমানেও প্রতিষ্ঠানটির একটি গাড়িই বাসসের সঙ্গে ভাড়ায় চুক্তিতে চলছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবদুল কাদেরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা প্রতিষ্ঠানের এমডি যদি ডেকে বলে যে এই গাড়িটা তোমার নামে চালাও, তখন আসলে আমার কিছু করার থাকে না।’
ভাড়া বাবদ টাকা থেকে তিনি কত পেতেন, জানতে চাইলে আবদুল কাদের জানান, দেড় লাখ টাকার পুরোটাই মাহবুব মোর্শেদ নিতেন।
একটা প্রতিষ্ঠানের এমডি যদি ডেকে বলে যে এই গাড়িটা তোমার নামে চালাও, তখন আসলে আমার কিছু করার থাকে না।
আরও অভিযোগ
বাসস সূত্র বলছে, এমডি পদে নিয়োগের সময় মাহবুব মোর্শেদের কোনো বেতন-ভাতা উল্লেখ করা হয়নি। পরবর্তীকালে তিনি নিজ উদ্যোগে একটি চুক্তিনামা করে মূল বেতন নবম ওয়েজ বোর্ডের বিশেষ গ্রেডের সর্বোচ্চ সিলিং ১ লাখ ২ হাজার ৩৭৫ টাকা নির্ধারণ করেন। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, ডেস্কভাতা, আপ্যায়নভাতা, দায়িত্বভাতা, চিকিৎসাভাতাসহ মোট বেতন ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৩৮ টাকা নির্ধারণ করেন। এ ছাড়া তিনি পত্রিকা বিল ৪ হাজার ৯৫০ টাকা, মুঠোফোন বিল ৬ হাজার টাকা, ইন্টারনেট বিল আড়াই হাজার টাকা এবং জার্নাল অ্যান্ড পিরিওডিক্যাল বিল বাবদ ১০ হাজার ২৫০ টাকা ভাউচারের মাধ্যমে আলাদাভাবে নিতেন।
আরও জানা গেছে, মাহবুব মোর্শেদের বেতন-ভাতা নির্ধারণের পর দেখা যায়, এমডি পদে তাঁর বেতন-ভাতা বাসসের কয়েকজন সাংবাদিকের চেয়ে কম। তখন তিনি বিশেষ ভাতা হিসেবে বেতনের সঙ্গে মাসিক ২২ হাজার টাকা করে নেওয়া শুরু করেন।
বাসসের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মাহবুব মোর্শেদের উত্তোলিত বেতন–ভাতা ও অন্যান্য বিল নির্ধারণের বিষয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাসসের পরিচালনা পর্ষদ জানত না এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কাছেও বিষয়টি ছিল অজ্ঞাত।
নথিপত্রে দেখা যায়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে মাহবুব মোর্শেদ ২২ জনকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ এবং ৪১ জনকে খণ্ডকালীন নিয়োগ দেন। সংস্থার বিদ্যমান জনবলকাঠামোতে উল্লেখ নেই, এমন পদে কর্মীদের পদায়ন করে বিভিন্ন ভাতা প্রদানও করেছেন।
যেমন সিটি এডিটর এবং বাংলা সার্ভিসের চিফ রিপোর্টারের কোনো পদ জনবলকাঠামোতে নেই। কিন্তু সেসব পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মাহবুব মোর্শেদের সময়ে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেসরকারি সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের পদ আছে। তবে সরকারি মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হলে আগে পদ তৈরি করতে হয়। কিন্তু তা না করেই দেওয়া হয় নিয়োগ।