‘পুলিশ বলে—শাটার খুলবা নাকি গুলি করব’

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, পুলিশ গুলি করার সময় এক বন্ধু ইমাম হাসান ভূঁইয়া তাইমকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেছবি: সংগৃহীত

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান তাইম হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জবানবন্দি দিয়েছেন চা–বিস্কুটের দোকানদার মো. সালাউদ্দিন লিটন। ২০২৪ সালের ২০ জুলাইয়ের ঘটনা বর্ণনা করে জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘পুলিশরা বাহির থেকে বলতে থাকে, “শাটার খুলবা নাকি গুলি করব।” আমি সবাইকে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলি এবং দোকানের শাটার খুলে দিই।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২–এ আজ মঙ্গলবার মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলার ২২তম সাক্ষী হিসেবে সালাউদ্দিন লিটন জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে সালাউদ্দিন বলেন, যাত্রাবাড়ীর কাজলা ফুটওভার ব্রিজের উত্তর পাশে তাঁর চা-বিস্কুটের দোকান ছিল। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি দোকান খোলেন। দুপুর ১২টার দিকে তাইম, শাহরিয়ার ও রাহাত তাঁর দোকানে এসে চা খায়। তাঁরা কথাবার্তা বলার এক পর্যায়ে গুলির শব্দ শুনতে পান। তিনি দোকানের শাটার বন্ধ করে দেন।

এরপর দোকানের ভেতরে তাঁরা চারজন বসা অবস্থায় ছিলেন উল্লেখ করে সালাউদ্দিন বলেন, পুলিশ এসে এক পর্যায়ে দোকানের শাটার খুলতে বলে। তিনি প্রথমে শাটার খোলেননি। তিনি বলেন, ‘তখন পুলিশরা বাহির থেকে বলতে থাকে, “শাটার খুলবা নাকি গুলি করব।” আমি সবাইকে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলি এবং দোকানের শাটার খুলে দিই।’

চারজন হাত উঁচু করে দোকানে দাঁড়িয়ে থাকেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, তখন পুলিশ ভেতরে ঢুকে তাঁকে দুটি চড় মারে। রাহাতকে টেনে বাইরে নিয়ে যায়। তারপর তাইম ও শাহরিয়ারকেও টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায়। তাদের রাইফেলের বাঁট দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। দুজন পুলিশ সদস্য তাঁর দিকে রাইফেল তাক করে রাখেন এবং অপর দুজন পুলিশ সদস্য তাঁকে বেধড়ক মারতে থাকেন।

একজন পুলিশ সদস্য তাঁর দোকান থেকে চিপস ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে যান বলেও উল্লেখ করেন সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, আরেকজন পুলিশ সদস্য তাঁর দোকানের ক্যাশ বাক্স থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা এবং সিগারেট নিয়ে যান। একপর্যায়ে তাঁর দোকানের শাটার বন্ধ করতে বলা হয়।

দোকান থেকে বের হয়ে দেখেন তাইম পড়ে আছে এবং তাকে শাহরিয়ার ওঠানোর চেষ্টা করছে বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, শাহারিয়ার ও তিনি তাইমকে ওঠানোর চেষ্টা করেন। তখন একজন পুলিশ সদস্য তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী করতেছ?’ তিনি বলেন, ‘ছেলেটার শরীরে গুলি লেগেছে, ওকে হাসপাতালে নিতে হবে।’ তখন পুলিশ সদস্যরা বলেন, ‘আমরা ওকে হাসপাতালে পাঠাব। তোমরা যাবা নাকি গুলি করব?’ তারপর তাঁরা বাসায় চলে যান।

এই মামলায় মোট ১১ জন আসামি। তাঁদের মধ্যে ৯ জন পলাতক। তাঁরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. ওহিদুল হক ও সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) সাজ্জাদ উজ জামান।

কারাগারে থাকা দুই আসামি হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহদাত আলী।

নিহত তাইমের বাবা মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের এসআই। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে গুলি করে হত্যা করা হয় তাইমকে। সে (তাইম) নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজীনগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।