একুশের চেতনা ও আদালতে বাংলার ব্যবহার

প্রতীকী ছবি

এ দেশের জনগণের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার ইতিহাস দীর্ঘকালের। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর এবং স্বাধীনতার ৫১ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও আমাদের আদালতে বাংলার যথেষ্ট সমাদর নেই। অধস্তন আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন থাকলেও উচ্চ আদালতের ব্যবহারিক ভাষা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এখনো ইংরেজি। বাংলায় বিচারকাজ না হওয়ায় সাধারণ জনগণ মাতৃভাষায় বিচার প্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আইনের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আইনের ব্যাখ্যা দেওয়ার গুরুদায়িত্ব আদালতের। এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আদালতে বিচার পরিচালনার ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিচার প্রার্থনা থেকে শুরু করে বিচার পরিচালনা, রায় দেওয়া, এমনকি রায় কার্যকর করা পর্যন্ত সব কার্যক্রম ভাষার মাধ্যমেই হয়। মাতৃভাষায় রায় দেওয়া হলে মামলার বাদী-বিবাদীর রায়ের সারমর্ম বোঝা বা পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়। অধস্তন আদালতে আরজি, জবাব, আপত্তি, নালিশ, আদেশ ও রায় সাধারণত বাংলা ভাষাতেই হচ্ছে। তবে উচ্চ আদালতে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজির প্রাধান্য ও ব্যবহার চলছে। উচ্চ আদালতে যখন ইংরেজি ভাষায় রায় ঘোষণা করা হয়, তখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য রায়ের বিষয়বস্তু, রায়ের কারণ ইত্যাদি উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী ‘বাংলা’ প্রজাতন্ত্রের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃত। সাংবিধানিক বিধানাবলি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর এবং সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন করা হয়। এ আইন পাস ও প্রচলনের পর ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশে নতুন সব আইন, অধ্যাদেশ, বিধি-বিধান ও প্রজ্ঞাপন প্রভৃতি বাংলা ভাষায় প্রণীত হচ্ছে। কিন্তু ১৯৯১ সালে এই আইনের কার্যকারিতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয় মো. হাসমত উল্লাহ বনাম আজমেরি বিবি মামালার (ডিএলআর ভলিয়ম ৪৪, ১৯৯২, ঢাকা, পৃ.৩৩২-৩৩৮) মাধ্যমে। অধস্তন আদালত ইংরেজিতে লিখিত আপত্তি প্রত্যাখ্যান করায় মামলাটির সূত্রপাত হয়। হাইকোর্ট বিভাগ নিম্ন আদালতের আদেশ নাচক করে দেন।

অধস্তন আদালত আরজি খারিজের আবেদন শুনানির পর তা বাতিল করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ওই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন মামলা করেন। ওই রিভিশন মামলা শুনানির পর বিচারপতি এ আর এম আমিরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ এম মাহমুদুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ১৯৯১ সালের ২৮ নভেম্বর ‘বাংলা ভাষাবিরোধী’ একটি রায় দেন। রায়ে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনকে সংবিধানপরিপন্থী বা বেআইনি ঘোষণা না করলেও অধস্তন আদালতে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার আইনসম্মত বলে ঘোষণা করা হয়।

আদালতের মতে প্রচলিত আইনে ইংরেজি ব্যবহারের যেসব বিধান যেমন, দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ (২) এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৫৮ ধারাকে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনে বাতিল করা হয়নি। এর ফলে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭’ প্রণীত হওয়া সত্ত্বেও অধস্তন আদালতের কার্যক্রম ইংরেজি ভাষায় চলতে পারে। এটি বিস্ময়কর যে পরবর্তীকালে এই মামলায় কোনো আপিল বা রিভিশন হয়নি। অর্থাৎ এ আইনে ‘অন্য আইনে যা কিছু থাকুক না কেন, এই আইনের বিধান কার্যকর হবে’ এমন নির্দেশনা না থাকায় আদালতের কার্যক্রমে বাংলা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতাও সৃষ্টি হয়নি। আইনটি দ্বারা আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সুযোগ বেড়ে গেলেও আইনটির কিছু অন্তর্গত দুর্বলতার কারণে এটি একটি কাগুজে আইনে পরিণত হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১১ সালে বাংলাদেশ আইন কমিশন বাংলা ভাষাকে আদালতের সব কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুপারিশ করে। কিন্তু আজও সেই সুপারিশ ফাইলবন্দী রয়েছে।

উচ্চ আদালতে ২০১২ সালে হাইকোর্ট বিধিমালা, ১৯৭৩ সংশোধনের মাধ্যমে হাইকোর্টে এবং আপিল বিভাগে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষা ব্যবহারে কোনো বাধা নেই। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষায় ‘মেমো অব আপিল’, আবেদনপত্র ইত্যাদি দাখিল বা বিজ্ঞ বিচারপতিদের বাংলা ভাষায় তাঁদের রায় লেখার সব রকম বাধা অপসারিত হয়েছে। বর্তমানে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় রায় কিছু লেখা শুরু হয়েছে, তবে এর সংখ্যা খুবই কম।

সুপ্রিম কোর্ট
ফাইল ছবি

১৯৯০ সালের পূর্বে হাইকোর্ট বিভাগে কোনো মামলার রায় বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৮ বছর পর ১৯৯০ সালে সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে সর্বপ্রথম বিচারপতি এ আর এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী আদালতের কার্যক্রম বাংলা ভাষায় লেখা শুরু করেছিলেন। ১৯৯৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক এবং বিচারপতি মো. হামিদুল হক একটি দ্বৈত বেঞ্চে ‘নজরুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র’ (ডিএলআর, খ-৫০, ১৯৯৮, পৃ.১০৩-১০৯) নামক ফৌজদারি রিভিশন মামলায় বাংলায় রায় প্রদান করেছিলেন। এটি ছিল একটি নজির সৃষ্টিকারী রায় এবং আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্ট–এ তা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগে কোনো মামলার রায় বাংলা ভাষায় দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত (২৫ বছর) এবং ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত (৭ বছর)—মোট ৩২ বছর হাইকোর্ট বিভাগে কোনো মামলার রায় বাংলা ভাষায় হয়নি।

২০০৭ সাল থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ কয়েকজন বিচারপতি বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করেন। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগে প্রায় ৪০০টি দেওয়ানি, ফৌজদারি ও রিট মামলায় বাংলায় রায় দেওয়া হয়। ২০১২ সালের মার্চ মাসে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বাংলা ভাষায় একটি করে রায় দিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য যে বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ২০১০ সালের ১১ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করছেন। এ বছর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে আপিল চেম্বার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীম বাংলায় আদেশ ও সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। একই দিনে বিচারপতি নায়মা হায়দার ও বিচারপতি মো. আক্কাস আলী বাংলায় রায় ঘোষণা করেছেন।

এটি সর্বজনস্বীকৃত যে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষা শেখা, জানা ও উপযুক্ত স্থানে চর্চার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জাতীয় উন্নতিকল্পে বিদেশি ভাষায় জ্ঞানার্জন ও সেই ভাষায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনা, আইন, বিধি-বিধান ও এর অধ্যয়ন, গবেষণা, অনুশীলন ও প্রয়োগের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস সর্বদাই প্রশংসিত ও স্বাগত। তবে বিচারপ্রার্থী বিশাল জনগোষ্ঠীর সহজে বোধগম্যতার কথা বিবেচনা করে আদালতের ভাষা বাংলা বা ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা করা অপরিহার্য। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সদিচ্ছা ভাষার যথার্থ প্রয়োগকে সহজ ও গতিশীল করবে।

আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের ‘সীমাবদ্ধতা’

আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রসঙ্গ উঠলে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও চলে আসে। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে আদালতের বিচারকাজে বাংলা ভাষার প্রাধান্য ও চর্চার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো হলো দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধিতে আদালতের ভাষার অস্পষ্ট বিধান, বাংলা ভাষা প্রচলন আইনটির বিধির অভাব, বাংলা ভাষায় অপর্যাপ্ত আইনের বই ও অনুবাদের অভাব, আইনি পারিভাষিক শব্দাবলির অপ্রতুলতা, নজির হিসেবে রায়ের ব্যবহারে ইংরেজির প্রাধান্য, প্রদত্ত বাংলা রায়ের বোধগম্যতার অভাব, নিম্ন আদালতে দক্ষ জনবলের অপ্রতুলতা এবং উচ্চ আদালতের আইনি কার্যক্রম ইংরেজি ভাষায় লেখা।

বিচারক ও আইনজীবীদের ভূমিকা

বিচারক ও আইনজীবী পরস্পরের পরিপূরক। আদালতের ভাষা কী হবে, সে বিষয়ে তাঁদের এমন ভূমিকা নেওয়া উচিত, যাতে বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। বিচারকদের দায়িত্ব সংবিধান ও আইনের বিধান অনুসারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, এটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। যেহেতু বর্তমানে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহারে কোনো আইনগত বাধা নেই, সেহেতু বিচারকদের আগ্রহ, ঐকান্তিকতা ও সুবিবেচনাই এ ক্ষেত্রে মূল বিষয়। যদিও অনেকের ধারণা, উচ্চ আদালতে বাংলা বাধ্যতামূলক করা হলে আইনসংশ্লিষ্ট পেশাগুলোর ‘মান–মর্যাদা’ কমে যাবে। প্রকৃতপক্ষে পেশার মর্যাদা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অর্জিত জ্ঞান, মেধা, প্রজ্ঞা ও বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতার সুষ্ঠু প্রয়োগ করে পেশাগত কার্যক্রম পরিচালনার ওপর, ভাষার ওপর নয়।

শেষ কথা

আদালতের ভাষা হচ্ছে বিচার কার্যক্রমে ব্যবহৃত ভাষা। বিচারপ্রার্থী মানুষের মুখের ভাষায় তথা বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করলে শুধু আইনের সাহায্য নয়, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আইনের কাছে যাওয়ার সুযোগও সহজ হবে। ভাষা দুর্বোধ্য হলে সে ভাষায় অধিকার সংরক্ষিত হয় না। বাংলা ভাষায় প্রণীত ও অনূদিত গ্রন্থের অপ্রতুলতা থাকতে পারে, কিন্তু তা বাংলাকে আদালতের ভাষা হিসেবে ব্যবহার না করার যুক্তি হতে পারে না। আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সাধারণ জনগণের একটি সাংবিধানিক অধিকার এবং এ অধিকার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সহজবোধ্যতার লক্ষ্যে আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন জরুরি। দেশের সব আদালতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রাধান্য ও চর্চার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

নাহিদ ফেরদৌসী বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (আইন)