মুক্তি কাউন্সিলের প্রথম সম্মেলনে বক্তারা
বর্তমান পরিস্থিতিতে দরকার জনগণের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশের ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু জনগণের হাতে ক্ষমতা যায়নি। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, বিদ্যমান ব্যবস্থায় দেশের কৃষক-শ্রমিক-নিপীড়িত জনগণের অবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে দরকার জনগণের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা।
আজ শুক্রবার জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের প্রথম সম্মেলনে এ কথা বলেন বক্তারা। রাজধানীর বিএমএ ভবন মিলনায়তনে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনের ডাক: ‘সংস্কার বা জোড়াতালি নয়, শ্রমিক-কৃষক জনগণের হাতে ক্ষমতা চাই, জনগণের সরকার সংবিধান রাষ্ট্র চাই।’
সম্মেলনের শুরুতে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত বদরুদ্দীন উমর ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করা হয়। এ জন্য দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, কৃষক, শ্রমিক ও নিপীড়িত জনগণের অবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে হলে দেশে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান প্রয়োজন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণ অংশ নিলেও সেখানে তাঁদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কোনো রূপরেখা ছিল না। তাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও তাঁরা বঞ্চিত থেকেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দরকার জনগণের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা। আগামী সংসদ নির্বাচনে সেটা না এলেও তাঁরা সেই নির্বাচন সমর্থন করেন। গণতান্ত্রিকপন্থায় দেশে নির্বাচিত সরকার চান তাঁরা। সভা, সমাবেশ, সংগঠন করার অধিকারসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চান তাঁরা। বর্তমান বিশৃঙ্খলা ও মব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এর বিকল্প নেই।
সম্মেলনে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম। তিনি বলেন, এই সম্মেলন করার উদ্দেশ্য হলো কৃষক, শ্রমজীবী ও নিপীড়িত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁদের সংগঠিত করা। অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটা রাজনৈতিক গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত করতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়ী শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা, নতুন সংবিধান সভার নির্বাচন আয়োজন করা এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য। এই কাজ কঠিন মনে হতে পারে। তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, মানুষকে সংগঠিত করা গেলে গণ-অভ্যুত্থান ঘটানো সহজ হয়।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সদস্যরা যাতে মানুষকে সংগঠিত করার কাজে কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাকালীন ১৮ দফা অনুসরণ করেন, সেই আহ্বান জানান ফয়জুল হাকিম। পাশাপাশি বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির সংকট ও বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদের যে সংকট, সেটাকে কাজে লাগাতে বলেন তিনি।
বদরুদ্দীন উমরকে উদ্বৃত্ত করে ফয়জুল হাকিম বলেন, ‘আমাদের আসল কাজ হচ্ছে, সংগঠন, সংগঠন এবং সংগঠন। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার জন্য এই সম্মেলন কাউন্সিল সদস্যদের অঙ্গীকারাবদ্ধ করবে।’
সম্মেলন সঞ্চালনা করেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের জাতীয় পরিষদ সদস্য আমীর আব্বাস। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশের ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু জনগণের হাতে ক্ষমতা যায়নি। শ্রমিক-মজুর-জনতা এখনো শোষণের শিকার। তাই জনগণের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে, জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, জনগণের হাতে রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা হস্তান্তর করাই এই জাতীয় সম্মেলনের উদ্দেশ্য। তাঁরা চান, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একটি সাম্যের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হোক।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের জাতীয় পরিষদের সদস্য ভুলন ভৌমিক বলেন, বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকের মুক্তির একটাই পথ, তা হলো গণ-অভ্যুত্থান। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে কৃষক-শ্রমিকের মুক্তির কোনো রূপরেখা ছিল না। তাই অভ্যুত্থানের পরও তাঁরা নিপীড়িত। যতক্ষণ দেশের কৃষক-শ্রমিক ঐক্যবদ্ধ না হবে, আমলাদের থেকে দেশের শাসনকে মুক্ত না করবে, ততক্ষণ তাঁদের মুক্তি নেই।
বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সভাপতি কাজী ইকবাল বলেন, বামপন্থী মহলের অতীতের রাজনৈতিক ভুলের ফলে তারা এখন মানুষের কাছ থেকে দূরে আছে। সমাজতন্ত্র কখনো হঠাৎ প্রতিষ্ঠা হয় না। এর জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। বদরুদ্দীন উমর প্রণীত ১৮ দফা কর্মসূচিতে সেই প্রক্রিয়া বিদ্যমান।
সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন কৃষক ও গ্রামীণ মজুর ফেডারেশনের সভাপতি সজীব রায়, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মিতু সরকার, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল নেতা মিনহাজ আহমেদ, বাংলাদেশ লেখক শিবিরের শফি রহমান, ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় কমিটির সভাপতি আকমল হোসেন, সাম্যবাদী দলের জেনারেল সেক্রেটারি আবদুল হাকিম প্রমুখ।