ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলাদেশ–কুয়েত মৈত্রী হলে পানি পান করে গত কয়েক দিনে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হওয়ার পরেও হল প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ আবাসিক ছাত্রীদের।
ছাত্রীরা বলছেন, কয়েক দিন ধরেই প্রতিনিয়ত হলের কোনো না কোনো শিক্ষার্থী পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছুটছেন। হলের ফিল্টারের পানি থেকেই এই অসুস্থতার সূত্রপাত বলে দাবি তাঁদের।
সম্প্রতি অসুস্থ হওয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রথমে আমরা ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভেবেছিলাম। কিন্তু কিছুদিন আগে হল গ্রুপে এক আপুর পোস্টের মাধ্যমে জানতে পারি, হলের অনেক মেয়েরই একই সমস্যা হচ্ছে। তখন আমরা ধরে নিই, হয়তো ক্যানটিনের খাবারে সমস্যা, নয়তো পানিতে। কিন্তু অসুস্থ হওয়াদের মধ্যে অনেক আপু নিজেরাই রান্না করে খান। এমনকি আমি নিজেও রান্না করে খাই। তাই সমস্যা ক্যানটিনে নয়, অবশ্যই পানিতে।’
ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, হলের মোট ভবন তিনটি। তিন ভবনের মেয়েরাই অসুস্থ হচ্ছেন। ঠিক কোন ফিল্টারের পানির সমস্যা, তা বলা মুশকিল।
জানা গেছে, ৫ মে অভিযোগ আসার পর হল সংসদের উদ্যোগে ৬ মে সকালে ক্যানটিন ও ফিল্টার পরিদর্শক দল আনা হয়। হল প্রশাসনের মাধ্যমে খাবার ও পানির উৎস থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন সায়েন্সেস (কার্স)’ এবং মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠানো হয়। তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট আসার কথা থাকলেও সেটি আসে ৯ দিন পরে।
এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ–কুয়েত মৈত্রী হলের প্রাধ্যক্ষ মাহবুবা সুলতানাকে ফোন করা হলে তিনি জানান, পানির নমুনার রিপোর্ট এসেছে। ছাত্রীদের কাছে রিপোর্ট রয়েছে, তারাই বিস্তারিত জানাবে।
ল্যাব রিপোর্টে ফিল্টারে জীবাণু
ল্যাব রিপোর্টের বিস্তারিত জানাতে শুক্রবার বিকেলে কুয়েত মৈত্রী হল সংসদের উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে হল সংসদের সহসভাপতি রাফিয়া রেহনুমা সাংবাদিকদের বলেন, তিনটি পানির উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এর মধ্যে ভবনের ছাদে অবস্থিত ট্যাংকের পানিকে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ, ডাইনিং হলের পাশের খাওয়ার পানিকে পানের অনুপযোগী এবং হল অফিসের ট্যাংকের পানিকে বিশুদ্ধ ও খাওয়ার উপযোগী বলা হয়েছে।
রেহনুমা হৃদি আরও বলেন, হল প্রশাসনের মাধ্যমে পাঠানো পানির নমুনার রিপোর্ট আসতে দেরি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে হল সংসদ স্বতন্ত্রভাবে পানির নমুনা ল্যাবে পাঠায়। সেই রিপোর্টে দেখা যায়, হলের পানির মূল উৎসে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। মূলত ফিল্টারগুলো জীবাণুযুক্ত হওয়ায় পানি দূষিত হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হয়েছেন।
এর আগে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার খবর পেয়ে গত শনিবার (৯ মে) উপাচার্য ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিতে হল পরিদর্শন করে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, পানির ফিল্টারের ডিভাইসগুলো সব পুনঃ স্থাপন করা হয়েছে। ফিলট্রেশন যেন ভালোভাবে হয়, সে জন্য কার্টিজ পরিবর্তন করা হয়েছে এবং ফিল্টারে ইউভি প্রটেক্টর (জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি) যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া যে ট্যাংকগুলোতে পানি জমা হয়, সেগুলোও তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে।
আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী আরও বলেন, হলে একটি মেডিক্যাল ক্যাম্প বসানো হয়েছে। সেখানে অসুস্থ মেয়েদের স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পানির গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রশাসন সচেষ্ট আছে।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
এদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রশাসনের অবহেলার প্রতিবাদে গত বুধবার রাত ১২টার দিকে হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। স্বাস্থ্যসেবার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বাজেট নেই—প্রশাসনের এমন বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁরা বিক্ষোভে নামেন।
ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর যখন আমাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো, তখন যে ওষুধগুলো লিখে দেওয়া হয়, তার একটিও বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টারে পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর ভর্তির সময় স্বাস্থ্য খাতে যে টাকা দেয়, সেগুলো কোথায় যায়?’
বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আবাসিক শিক্ষার্থী অদিতি ইসলাম তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো—১. হলের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ক্যানটিন সংকট সমাধানে প্রশাসন ও হল সংসদের নেওয়া পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট বাজেটের পূর্ণ স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা; ২. হল প্রশাসনের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে শিক্ষার্থীদের অসুস্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ৩. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
সংহতি ও ছাত্রসংগঠনগুলোর দাবি
কুয়েত মৈত্রী হলের চলমান সংকট সমাধানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির সঙ্গে সর্বাত্মক সংহতি প্রকাশ করেছে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী। বৃহস্পতিবার বিকেলে মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
একই দিন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এক বিজ্ঞপ্তিতে চার দফা দাবি জানায়। তাদের দাবিগুলো হলো—হলে সুপেয় পানি ও মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা, অসুস্থ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার দায়ভার প্রশাসনকে নেওয়া, হল প্রশাসনের চরম অব্যবস্থাপনার জবাবদিহি করা এবং হলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
সংগঠনটি অভিযোগ করে, হলের সংকট সমাধানে হল প্রশাসনকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টার থেকেও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না।