ভূমি বিরোধসহ নানা সমস্যা কাটেনি

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস আজফাইল ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশে জাতিগোষ্ঠী মানুষের অধিকার, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এখনো পুরোপুরি কাটেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি থমকে আছে। সমতলের জাতিগোষ্ঠীর মানুষও ভূমি দখল, উচ্ছেদ ও আইনি জটিলতার মুখে রয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চলাচল ও প্রশাসনিক অনুমতির নানা বাধা।

এ বাস্তবতার মধ্যে আজ ৯ আগস্ট পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’।

দিবসের প্রাক্কালে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রের নীতির প্রশ্নগুলোকে সামনে এনেছে। সেটি হলো আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) দুই বিদেশি কর্মকর্তার পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর বাতিলের ঘটনা। কৃষি ও পর্যটন উন্নয়ন নিয়ে একটি প্রকল্পের কাজ দেখতে চলতি মাসের শুরুতে রাঙামাটি ও বান্দরবানে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। আইএলওর ঢাকা কার্যালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিলেও দুই কর্মকর্তা সফরের অনুমতি পাননি বলে আইএলও সূত্র জানায়। অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রও নিশ্চিত করেছে।

এ বাস্তবতার মধ্যে আজ ৯ আগস্ট পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশিদের প্রবেশে বিশেষ অনুমতির এই বিধান বহু বছরের। ঢাকায় আইএলওর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল বার্তা গেছে।

এদিকে নির্বাচনের আগে বিএনপি বাংলাদেশকে ‘রেইনবো নেশন’—বহু জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ—হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু পাহাড় ও সমতলের বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা মিলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

রেইনবো নেশন তৈরির তেমন প্রচেষ্টা দেখছি না। ...পাহাড় বা সমতলের আদিবাসী মানুষের অধিকার নিশ্চিতে খুব একটা তৎপরতা নেই।
দেবাশীষ রায়, চাকমা সার্কেল প্রধান

পার্বত্য ভূমি কমিশন স্থবির

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম জটিল সমস্যা ভূমি। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর ১৯৯৯ সালে গঠিত হয় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন। খাগড়াছড়ি শহরের মাস্টারপাড়ায় এই কমিশনের কার্যালয়। ৪ আগস্ট সেখানে গিয়ে দোতলা ভবনটির মূল ফটক বন্ধ পাওয়া যায়। ভেতরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও দেখা যায়নি। স্থানীয় লোকজন জানান, কার্যালয়টি অধিকাংশ সময়ই বন্ধ থাকে।

৩ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের চলমান ও ‘সবুজ পাতা’য় অন্তর্ভুক্ত প্রকল্প নিয়ে পর্যালোচনা সভা হয়। সভাপতিত্ব করেন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। এ সভায় কোনো পাহাড়ি প্রতিনিধি ছিলেন না। এ ছাড়া এই মন্ত্রণালয় গঠনের পর এবারই প্রথম এর নেতৃত্বে কোনো পাহাড়ি ব্যক্তি নেই। ফেব্রুয়ারিতে দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী এবং মীর হেলাল উদ্দীনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছিল। পরে নানা মতভেদের মধ্যে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ১ জুন মন্ত্রীর পদ ছাড়েন দীপেন দেওয়ান।

উত্তরাঞ্চল, ময়মনসিংহ, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকার জাতিগোষ্ঠীর সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে পৃথক ভূমি কমিশনের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, ভূমি দখল, জাল কাগজপত্র, উচ্ছেদ ও দীর্ঘ আইনি জটিলতায় বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, কিন্তু এ দাবি বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদনকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাসে ভূমি বিরোধ বা পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। তিনি মনে করেন, মন্ত্রণালয়ে একজন অপাহাড়িকে রাখা পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং পাহাড়ি মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী।

সমতলেও ভূমি নিয়ে সমস্যা

উত্তরাঞ্চল, ময়মনসিংহ, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকার জাতিগোষ্ঠীর সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে পৃথক ভূমি কমিশনের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, ভূমি দখল, জাল কাগজপত্র, উচ্ছেদ ও দীর্ঘ আইনি জটিলতায় বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, কিন্তু এ দাবি বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

টাঙ্গাইলের মধুপুরে গারোরা ভূমি উচ্ছেদের আতঙ্কে রয়েছে। বন বিভাগের সঙ্গে তাদের ভূমি বিরোধ এবং বন মামলা এখনো চলছে। রাজশাহী ও দিনাজপুরেও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ভূমিহীনতা বড় সমস্যা। সিলেটে গারো, পাত্র ও চা–শ্রমিক জনগোষ্ঠীর ভূমি সমস্যা রয়েছে।

মধুপুরের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, বন মামলা ও ভূমি সমস্যা সমাধানে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি সমতলের জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তাঁদের জন্য পৃথক উন্নয়ন অধিদপ্তর গঠনের বিষয়টি আলোচিত হয় বলে জানান বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং।

ভূমি, পার্বত্য চুক্তি, অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে উদ্যোগ না নিয়ে রেইনবো নেশন কীভাবে হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে জাতিগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনকারীদের অনেকের মধ্যে। রেইনবো বা রংধনুর রং ফিকে হয়ে যাচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) বিজন কান্তি সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রং একত্র করার চেষ্টা করছি। অনেক প্রকল্প নেওয়া হবে নৃগোষ্ঠীর মানুষদের উন্নয়নে। সেগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।’

যদিও চাকমা সার্কেল প্রধান দেবাশীষ রায় বলেন, ‘রেইনবো নেশন তৈরির তেমন কোনো প্রচেষ্টা দেখছি না। চলাফেরার স্বাধীনতা, মানবাধিকার, ভূমি ইত্যাদি প্রশ্নে পাহাড় বা সমতলের আদিবাসী মানুষের অধিকার নিশ্চিতে খুব একটা তৎপরতা নেই।’

আমরা রং একত্র করার চেষ্টা করছি। অনেক প্রকল্প নেওয়া হবে নৃগোষ্ঠীর মানুষদের উন্নয়নে। সেগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) বিজন কান্তি সরকার