বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে চায় সরকার
সরকার বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে চায় বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা। বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতে গেলে রাষ্ট্রের দায় কমবে। ভারতের মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স, দিল্লিতে আদানি বিদ্যুৎ বিতরণ করে। বিনিয়োগের জন্য ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শিরোনামে আয়োজিত পলিসি কনক্লেভে এ কথা বলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী। আজ বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে এর আয়োজন করে দৈনিক বণিক বার্তা। সেখানে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, খুচরা পর্যায়ে সরকারের ব্যবসা পরিচালনা করা উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, সরকারি খরচে আর কিছু না করে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে।
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
এর আগে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের প্রতিনিধিরা দেশের জ্বালানিসংকট নিয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়, অনুমোদনের পরও গ্যাস–সংযোগ না পাওয়ায় কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের অভাবে শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ওষুধশিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে।
এসব প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, পুরো দেশ আমদানিনির্ভর হয়ে গেছে। গত ১৭ বছরে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। খুলনায় তিনটি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র বসে আছে। আবার গ্যাস আমদানির প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও তৈরি করা হয়নি। একটি এলএনজি টার্মিনালে গতকাল (মঙ্গলবার) আগুন লেগেছে, এতে করে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। বিদ্যুৎ খাতে ৬৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সরকার এগুলো সামলে নিচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) একটি বড় সমস্যা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এদের সার্বভৌম গ্যারান্টি আছে। তাই রাষ্ট্র তাদের বিল দিতে বাধ্য। জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েই সরকার কাজ করছে, কিন্তু এটা কঠিন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিকল্প উৎস থেকে আনতে গেলে দাম অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এত দামে কিনতে গেলে বাজেটের ভর্তুকি বরাদ্দ ছাড়িয়ে যাবে। এমনিতেই বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করছে সরকার। বকেয়া শোধ করতে আলাদা কমিটি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দেশে আরও গ্যাস আছে কি না, সেটা নিশ্চিত নয়। দেশের স্থলভাগের পুরোটা দ্বিমাত্রিক জরিপ করলে এই ধারণা পরিষ্কার হতো। গত ১৭ বছরে সমুদ্রেও অনুসন্ধান করা যায়নি। এখন দরপত্রে সাড়া পাওয়ার পর চুক্তি হলেও অন্তত ৫ বছর লাগবে ফলাফল জানতে। যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের সংকট দেখা গেছে। একক উৎসের কারণে এটি হয়েছে, তা ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে না পারলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমবে না।
বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, জ্বালানি শুধু একটি খাতের অগ্রাধিকার নয়, এটি বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং রাজস্ব টেকসই করার একটি অন্যতম মূল ভিত্তি। সবার কাছে জ্বালানি বা বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু এই খাতটি এখনো বড় ধরনের কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। গ্যাস চাহিদার ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ শতাংশ এবং কয়লার ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। বৈশ্বিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং সরবরাহের ব্যবস্থার বিঘ্ন সরাসরি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকটে ভুগছে শিল্প
অনুষ্ঠানে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, এত উৎপাদন সক্ষমতা, তবু বিদ্যুৎ আমদানি করতে হয়। অলস বসে থাকলেও হাজার হাজার কোটি টাকা কেন্দ্র ভাড়া দিতে হয়। এসব অর্থ জনগণকে দিতে হচ্ছে। জ্বালানিসংকটের কারণে বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলো যেমন চরম ভোগান্তিতে পড়েছে, তেমনি নতুন কোনো দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও আসছে না। জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত না হলে কেউ বিনিয়োগ করবে না। এটা দেশি, বিদেশি সব বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। জ্বালানিসংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দেশের শিল্প নিজেদের অপরাধ ছাড়াই শাস্তি পাবে। মন্ত্রীর কাছে এর সমাধান দাবি করেন তিনি।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) সহসভাপতি ও ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান বলেন, অর্থনৈতিক রূপান্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ সময় শুধু জ্বালানির সরবরাহ নয়, নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু জ্বালানির প্রাপ্যতা নয়, বরং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং বিদ্যুতের মান নিশ্চিত করা দরকার। বিদ্যুতের ঘাটতি, ভোল্টেজের ওঠানামা এবং হঠাৎ বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে পরিচালন ব্যয় বাড়ে এবং পুরো সরবরাহের ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। জ্বালানি তেলের দামও বাড়তি। উৎপাদনমুখী সব খাতে এর প্রভাব আছে।
সব খাতেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে উল্লেখ করে সিমিন রহমান বলেন, ওষুধশিল্পে উৎপাদন চলুক বা বন্ধ থাকুক; ২৪ ঘণ্টা আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হয়। একবার বিদ্যুৎ ব্যাহত হলে জীবন বাঁচানো একটি ইনজেকশনের পুরো ব্যাচের উৎপাদন বাতিল করতে হতে পারে। একটি ব্যাচের ওষুধ বাদ হলে কয়েক কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। গুণগত মান, রোগীর নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক মান বজায় রেখে ওষুধশিল্পের উৎপাদন নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানির সরবরাহ জরুরি।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, আকাশের যত তারা, তিতাসের তত ধারা। কালক্ষেপণ কমাতে পারে তিতাস। জ্বালানি খাতের সব প্রতিষ্ঠান মিলে ব্যবসা সহজ করার চেয়ে কঠিন থেকে কঠিনতর করছে। টাকা জমা দিয়েও গ্যাস–সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বলে বিনিয়োগ আটকে আছে। গ্যাস না পেয়ে দেউলিয়া হয়ে গেলে মেঘনা গ্রুপের ৫৭ প্রতিষ্ঠানের ৬৫ হাজার কর্মী বেকার হবেন।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, যেকোনো নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি। নীতি তৈরির আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা আবশ্যক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সোলার খাতের শুল্কছাড়–সংক্রান্ত যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটা এখনো কেউ বোঝে না। একজন বিনিয়োগকারী যখন মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে জ্বালানি–সংযোগের অপেক্ষায় থাকেন, তখন তাকে জ্বালানি সরবরাহ করা সরকারের একটি নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সঠিক পূর্বাভাসের অভাব ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার সার্বিক প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতির ওপর।
গ্যাস–সংকটের কারণে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যাংকগুলোর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আটকে রয়েছে বলে জানান ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অনেক ব্যাংক বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্যাস। শুধু ট্রাস্ট ব্যাংকেরই প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ গ্যাস–সংকটের কারণে আটকে আছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, শিল্পোদ্যোক্তাদের হাতেই থাকা উচিত। তাঁরা এগিয়ে নিতে পারবেন। হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোনো ব্যবসায়ীর হাতে নয়।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসইআরএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বিনিয়োগের জায়গা নেই। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খাত ছিল, সেখানেও ভ্যাট, এআইটি (অগ্রিম আয় কর) যুক্ত করে দিয়েছে। নীতি দিয়ে আটকে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে জ্বালানি রূপান্তর ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। শুল্কমুক্ত–সুবিধার ঘোষণা শর্তের বেড়াজালে আটকে গেছে।
সংকট সমাধানে বিশেষজ্ঞ মত
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, দেশের ৬০ শতাংশ গ্যাস বিতরণ করে তিতাস। সাড়ে ৪ হাজার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এখন চাহিদা ২২০ কোটি ঘনফুট। ১৭০ কোটি ঘনফুট পেলে মোটামুটি চালানো যায়। একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় ১৫০ কোটি ঘনফুট আসছে। নতুন সংযোগের আবেদন আছে ১৩০০, যার মধ্যে প্রতিশ্রুত আছে ৫০০–এর বেশি। দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়লে সমাধান হতে পারে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান এম রিজওয়ান খান বলেন, পাকিস্তানে ৩০ হাজার মেগাওয়াট সৌর থেকে এসেছে, যার মধ্যে সরকার করেছে মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আইএমএফকে খুশি করতে গিয়ে বিদ্যুতের দাম দেশটির সরকার এত বাড়িয়েছে, মানুষ নিজ থেকে বিকল্প উৎস তৈরি করেছে। তিনি বলেন, দেশে পরিকল্পনা ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এগুলো রেখে নবায়নযোগ্য থেকে বিদ্যুৎ বাড়ানো হলে সক্ষমতা আরও বাড়বে।
বুয়েটের সহ–উপাচার্য আবদুল হাসিব চৌধুরী বলেন, দেশের মানুষ ১৮ কোটি, জমি সীমিত। গ্যাসের ৩৫ শতাংশ এলএনজি থেকে আসে। কৃষি, শিক্ষা, শক্তি ও পরিবহন-লজিস্টিক; এ চারটি খাতে গুরুত্ব দিয়ে সব সাজাতে হবে। আর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অদক্ষতা ও নীতিগত পরিকল্পনার ঘাটতি হলো অন্যতম বাধা। এ ছাড়া দুটো সংস্কার করতে হবে, ভূমি সংস্কার ও শিক্ষা সংস্কার।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য ম তামিম বলেন, প্রাথমিক জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা হলো সব সমস্যার মূলে। জ্বালানি স্বাধীনতা পুরোপুরি সম্ভব নয়। তবে আমদানির নির্ভরতা কমাতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। কয়লা উত্তোলনে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ আছে, যা পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। পাকিস্তানের মডেল বাংলাদেশে হবে না। ছাদ ও সোলার পার্ক সমাধান হতে পারে। সরকারি উদ্যোগ ছাড়া সোলার পার্ক বাড়বে না। সমন্বিত সমাধান ভাবতে হবে।