বাংলাদেশের কোন কোন অবকাঠামো খাতে তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে?

মোস্তফা ওসমান তুরান: ঢাকা ওয়াসার পানি শোধনাগার প্রক্রিয়ার দরপত্রে অংশ নিয়ে তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠান শর্ট লিস্টেড হয়েছে। আরেকটি প্রতিষ্ঠান ঢাকার বাইরে সাড়ে চার শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে দরপত্রে অংশ নিয়েছে। সড়ক ও সেতু প্রকল্পের দরপত্রে অংশ নিয়েছে তুরস্কের প্রতিষ্ঠান।

তার মানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে?

মোস্তফা ওসমান তুরান: বিশ্বের সেরা আড়াই শ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪০টি তুরস্কের। আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, বলকান ও মধ্যপ্রাচ্যের পর তারা এখন বেশি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে এশিয়ার দিকে। কাজেই তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে বাংলাদেশ।

তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন বেছে নেবে বাংলাদেশ?

মোস্তফা ওসমান তুরান: তারা দ্রুততার সঙ্গে প্রকল্পের কাজ শেষ করে। কাজের মান ভালো। খরচের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে কম। এই তিন কারণে তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলো সফল হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতির কারণে তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তহবিল সংগ্রহ করাটাও সহজ।

বাংলাদেশ নিয়ে তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণগুলো কী?

মোস্তফা ওসমান তুরান: বাংলাদেশে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্ত হওয়ার আগ্রহ চট করে তৈরি হয়েছে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। এ দেশের অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এখানকার বাজার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দুই দেশের সম্পর্ক—সব মিলিয়েই আগ্রহটা বাড়ছে।

বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ কেমন?

মোস্তফা ওসমান তুরান: বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশকে কিন্তু আদর্শ বলা যাবে না। সরকারের আন্তরিকতা আছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে। সমস্যাটা হচ্ছে এখানকার আমলাতন্ত্রের নিচের দিকে। শুল্কের বিষয়ে কিছু সমস্যা রয়েছে, যা ঠিক করা জরুরি। আমলাতন্ত্র পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে। তুরস্কের একটি এলপিজি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। তারা ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে দেখতে পেল, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার জন্য অন্তত ৩৮টি আলাদা লাইসেন্স লাগে। গত দুই বছরে তারা ৩৬টি লাইসেন্স করতে পেরেছে। আরও দুটির জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। এ ধরনের সমস্যার দ্রুত সুরাহা হওয়াটা জরুরি।

ব্যবসা, বিনিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে উন্নয়নের ক্ষেত্রে সুসম্পর্ককে অন্যতম প্রধান উপাদান বলছেন। দুই দেশের ভালো সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো উপাদান কি ছিল?

মোস্তফা ওসমান তুরান: ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে দুই দেশের মধ্যে সাযুজ্য রয়েছে। দুই দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিও দুই পক্ষের জন্য অনেক সুযোগ সামনে এনেছে। আমরা দুই দেশই শান্তিকামী। এখন বাংলাদেশের পর্যটকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য তুরস্ক। ইদানীং চিকিৎসার জন্যও বাংলাদেশের লোকজন তুরস্কে যাচ্ছেন। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব সামগ্রিকভাবে সম্পর্কের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন। তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহমর্মিতার সেই বার্তা।

আপনি ২০১৬ সালে তুরস্কের তখনকার প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই চিঠির কথা বলছেন?

মোস্তফা ওসমান তুরান: হ্যাঁ। ২০১৬ সালের তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সমর্থনের কথাই বলছি। এরপর আসে ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের পরপরই তুরস্কের ফার্স্ট লেডির বাংলাদেশ সফর। এরপর তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদ্রিম বাংলাদেশে আসেন। এগুলো হচ্ছে সম্পর্ক জোরদার এবং দুই দেশের মধ্যে আস্থার ক্ষেত্রে মাইলফলক।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা সফরের সময় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত সাভাসগলু বাংলাদেশের কাছে সমরাস্ত্র বিক্রির কথা বলেছিলেন।

মোস্তফা ওসমান তুরান: বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ফোর্সেস গোল–২০৩০ অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী তাদের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর সামর্থ্যের বিষয়টি যাচাই করে দেখেছে। তখন তারা জানতে চেয়েছে, তাদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা সরবরাহ করতে পারব কি না। গত বছরের জুনে রকেটসানের সঙ্গে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী চুক্তি করেছে লেজার গাইডেড বোমা সরবরাহের জন্য।

বাংলাদেশের সঙ্গে সামগ্রিক কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের কথা কি ভাবছেন?

মোস্তফা ওসমান তুরান: প্রশিক্ষণসহ নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর পারস্পরিক সহযোগিতা ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে বোঝাপড়া বেশ ভালো। তাই নতুন করে চুক্তির প্রয়োজন নেই। তবে এটার প্রয়োজন আছে কি না, তা সময় বলে দেবে।

আপনাদের ড্রোনের খ্যাতি এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছর আপনি এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে তুরস্কের সমরাস্ত্র উৎপাদনের কথা বলেছিলেন। এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কি?

মোস্তফা ওসমান তুরান: আর্টিলারি শেলের যৌথ উৎপাদনের বিষয়ে তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরির একটি চুক্তি হয়েছে। আমরা অন্য ক্ষেত্রে এ ধরনের যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছি।

ড্রোনের ব্যাপারে বলতে চাই, সম্প্রতি তুরস্কের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাইকার, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে বাইরাকটার টিবি২ ড্রোন বিক্রির বিষয়ে একটি চুক্তি সই করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে কি অন্যতম প্রধান উপাদান মনে করেন?

মোস্তফা ওসমান তুরান: তা তো বটেই। আমরা নৌবাহিনীর সরঞ্জাম সরবরাহের দরপত্রে অংশ নিয়েছি। ফ্রিগেট ও কোস্টগার্ডের পেট্রল নৌযান সরবরাহ করতে আমরা তৈরি আছি। এ দেশের প্রকৌশলীদের যুক্ত করে কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে খুলনা শিপইয়ার্ড ও চট্টগ্রাম ড্রাই ডকের দুটি দরপত্রে অংশ নিয়েছি। বিমানবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতায় যুক্ত হওয়ার জন্য আলোচনা হচ্ছে।

আরেকটা বিষয় বলতে চাই যে আমাদের সমরাস্ত্রের ৮০ শতাংশই নিজেরা উৎপাদন করি। বাকি ২০ শতাংশ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো থেকে সংগ্রহ করি। আমাদের উৎপাদিত সমরাস্ত্র মান ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর উৎপাদিত অস্ত্রের সমপর্যায়ের। দামও তুলনামূলকভাবে কম। অস্ত্র বিক্রিতে আমরা কোনো রাজনৈতিক শর্ত দিই না।

বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল করার জন্য তুরস্ক ৬০ একর জমি চেয়েছে। এত বড় জমি কেন চাইছেন?

মোস্তফা ওসমান তুরান: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন তুরস্ক সফরের সময় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে এ প্রস্তাব দেন। মনে রাখতে হবে, বিশেষায়িত এই হাসপাতাল একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প। পিপিপির (সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্ব) আওতায় দুই থেকে তিন হাজার শয্যা হাসপাতালের অন্তত ১৫টি প্রকল্প করার অভিজ্ঞতা তুরস্কের রয়েছে। বাংলাদেশে প্রস্তাবিত প্রকল্পটিও সে রকম। ছোট হাসপাতালে বিদেশি বিনিয়োগকারী পাওয়া যায় না। বড় প্রকল্প পিপিপিতে হওয়াটা জরুরি। যেখানে স্বাস্থ্যসেবাসহ সব ধরনের সেবাই পাওয়া যাবে।

রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের পর থেকেই বাংলাদেশকে নানাভাবে সহযোগিতা করছে তুরস্ক। কিন্তু প্রত্যাবাসনের কোনো অগ্রগতি নেই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হলে এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কীভাবে সহায়তা করতে চায় তুরস্ক?

মোস্তফা ওসমান তুরান: রোহিঙ্গারা যদি নিজের ভিটায় ফিরে যেতে না পারে, তবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠতে পারে। এ সমস্যা সমাধানের চূড়ান্ত সমাধান হচ্ছে প্রত্যাবাসন। এ জন্য মিয়ানমারকে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কক্সবাজারের শিবিরে রোহিঙ্গাদের সবাই আদি নিবাসে ফিরে যেতে চায়। তবে এর আগে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ন্যূনতম শর্তগুলো পূরণ হতে হবে। মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিও আন্তর্জাতিক সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে।

রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় আইসিজেতে (আন্তর্জাতিক বিচার আদালত) বাংলাদেশকে আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে তুরস্ক। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

বিশ্ববাজারে শস্য ও সার রপ্তানির জন্য কৃষ্ণসাগরে অবস্থিত ইউক্রেনের বন্দরগুলো খুলে দিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিতে জাতিসংঘ ও তুরস্ক মধ্যস্থতা করেছে। এ ক্ষেত্রে তুরস্ক কীভাবে সফলকাম হলো?

মোস্তফা ওসমান তুরান: যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আমরা দুই স্তরে কাজ করছি। প্রথমত, মানবিক সংকট যতটা সম্ভব কমাতে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। দ্বিতীয়ত, আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছি। দুই পক্ষের বৈরিতা দূর করতে আমরা তাদের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত রেখেছি। ইউক্রেনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং বিভিন্ন অঞ্চলে রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করার মতো সম্পর্ক বজায় থাকার ফলে আমরা একটি অনন্য অবস্থানে রয়েছি।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান দুই পক্ষের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর ১৩ জুলাই ইউক্রেনের শস্য রপ্তানির বিষয়ে ইস্তাম্বুলে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হয়। ওই আলোচনায় তুরস্ক, রাশিয়া এবং রাশিয়ার সামরিক প্রতিনিধি ও জাতিসংঘ অংশ নেয়। নিবিড় আলোচনা শেষে ইস্তাম্বুলে ২২ জুলাই চুক্তিটি সই হয়।

আপনাকে ধন্যবাদ।

মোস্তফা ওসমান তুরান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন