‘প্রথম আলোর ওপর হামলা বাংলাদেশকে পেছনে নিয়ে যাওয়ার বড় চক্রান্ত’
সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার প্রথম আলো ভবনে চলছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে এই শিল্প-আয়োজনে দর্শনার্থীরা দেখছেন পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্র ইত্যাদি।
প্রদর্শনীর ১২তম দিনে আজ রোববার ব্যতিক্রমী এ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’ দেখতে এসেছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি নুর মোহাম্মদ তালুকদার। প্রথম আলোকে আক্রান্ত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটা বড় চক্রান্ত।’ এ আঘাতকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার ওপর আঘাত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আবার নতুন উদ্যমে আমরা এগিয়ে যাব।’
নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে দেশীয় শক্তির পাশাপাশি বিদেশি চক্রান্ত থাকতে পারে। তাদের থামাতে আবারও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
প্রথম আলোয় হামলার ফলে সেই রাতে প্রথম আলোর অনলাইন সংবাদপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম আলোর ২৬ বছরের প্রকাশনার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৯ ডিসেম্বর ছাপা পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ থাকে। তবে এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও প্রথম আলো ঘুরে দাঁড়ায়। মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যে আবার অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ ডিসেম্বর সকালে সারা দেশের পাঠকেরা ছাপা পত্রিকা হাতে পেয়ে যান।
রোববার প্রদর্শনী দেখতে এসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘ভেতরে কতটা ঘৃণার চাষ এবং সেটির অভিব্যক্তি কতটা ভয়ানক হলে মানুষ এমন ঘটনা ঘটাতে পারে।’ তিনি বলেন, এ হামলা সবার বাংলাদেশ গড়ার যে আওয়াজ, তার বিরুদ্ধের আওয়াজ। এ আওয়াজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আওয়াজ ছিল এই সংসদ সদস্যের কণ্ঠেও।
অগ্নিকাণ্ডকবলিত ভবনটি নিয়ে শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের ‘আলো’ নামের এই প্রদর্শনীর সময় দুই দিন বাড়িয়ে চলবে ২ মার্চ পর্যন্ত। সর্বস্তরের দর্শকদের জন্য প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। শিল্প-আয়োজনটি সবার জন্য উন্মুক্ত।
প্রদর্শনী দেখতে আসেন বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায় ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মিঠু রঞ্জন দেব। মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায় বলেন, মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু তা মোকাবিলা করতে হবে যুক্তি দিয়ে। গণমাধ্যমের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া বা কণ্ঠরোধ করা যাবে না।
হামলার শিকার প্রথম আলোর ভবনটিতে ঢুকতেই এখনো পোড়া গন্ধ আসে। ঢোকার পর বাঁ দিকে গেলে সেখানে রয়েছে কিছু চিত্রকর্ম। একটি চিত্রকর্মে দেখা যায়, পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া একটি ভবন। আরেকটি চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে পোড়া ভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাঁড়িয়ে আছে—আরেকটি চিত্রকর্মে এমনটি উঠে এসেছে।
চারজন মানুষ পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে—এমন স্থাপত্যও রয়েছে প্রথম তলায়। চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যের পাশাপাশি সেখানে রাখা হয়েছে প্রথম আলোর পুড়ে যাওয়া কম্পিউটারসামগ্রী ও আসবাব।
প্রদর্শনী দেখতে এসে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, রাষ্ট্রের মদদ পেলে কীভাবে দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্বাধীনতার চেতনাকে অস্বীকার করার প্রবণতা যে উসকে দেওয়া যায়, তা–ও প্রত্যক্ষ করেছি। কে কী করেছে, তার দায় জাতির কাছে একদিন না একদিন দিতেই হবে।
বড় ভাই ইয়াসিন আরাফাতকে নিয়ে প্রদর্শনী দেখতে এসেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম কিবরিয়া। দৃষ্টিশক্তিহীন এই দর্শনার্থী প্রদর্শনীতে এসে হাতে স্পর্শ করে বোঝার চেষ্টা করলেন হামলার ভয়াবহতা। তিনি বলেন, প্রথম আলোকে যেভাবে জ্বালিয়ে দিয়েছে, এগুলো আসলে কোনো সভ্য সমাজ বা সভ্য মানুষের কাজ নয়; এটি একটি উগ্রপন্থী মনোভাবের প্রকাশ।
বিষয়টিকে উগ্রতা আখ্যা দিয়ে এই শিক্ষার্থী বলেন, যারা রাষ্ট্রের এবং জনগণের ভালো চায়, তারা কখনো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে এভাবে ধ্বংস করতে পারে না।
প্রদর্শনীর দোতলায় পোড়া বই প্রদর্শন করা হয়েছে। আগুনে যেসব বই পোড়েনি, সেগুলোই প্রদর্শন করা হয়েছে। অক্ষত বইয়ের প্রদর্শনীতে লেখা, ‘এই মহাসাগরে স্নান করে জাগোরে’। দোতলার নথিপত্র, বই, আসবাব, যন্ত্রাংশসহ যাবতীয় ধ্বংসস্তূপের ওপর রয়েছে সাদা কফিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহমান মৈশান বলেন, ‘গণমাধ্যমের ওপর আঘাত সমাজকে নেওয়ার চেষ্টা। এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।’ তিনি বলেন, ‘মতপ্রকাশের কারণে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদী আচরণ।’
প্রথম আলোর ওপর হামলাকে দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থানকারীদের ওপর আঘাত বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি সুজিত চ্যাটার্জী বাপ্পী। এ ঘটনাকে অনেকে দীর্ঘদিনের একটি গোপন আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ উল্লেখ করে প্রদর্শনী দেখে তিনি বলেন, ‘যারা একাত্তরে পরাজিত হয়েছিল, তাদের পক্ষ থেকে সেই চেতনা ও মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা।’ এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবিও জানান এই আইনজীবী।
তৃতীয় তলায় পুড়ে যাওয়া লোহালক্কড় প্রদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি এই ফ্লোরের বৈদ্যুতিক পোড়া তার এবং অন্যান্য জিনিসও আছে। ওই সময় প্রথম আলোর যেসব কর্মী ভবন পুড়তে দেখেছেন, তাঁদের বক্তব্যও প্রদর্শিত হচ্ছে।
চতুর্থ তলায় প্রদর্শন করা হচ্ছে প্রথম আলো ভবনে হামলার ভিডিও চিত্র। সেই সঙ্গে চতুর্থ তলায় উগ্রবাদীরা যে লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে, তা–ও প্রদর্শিত হচ্ছে। ভাঙচুর করা ও এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্রের ওপর রয়েছে একঝাঁক কবুতর।