স্থাপত্যচর্চায় হোক গণতান্ত্রিক স্থান

সায়কা ইকবাল

২০২৫ সালে জেবুন নেসা মসজিদ যেভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে আনন্দের। টাইম ম্যাগাজিনের ‘দ্য ওয়ার্ল্ডস গ্রেটেস্ট প্লেসেস’ তালিকায় জায়গা পাওয়া, জেকে আর্কিটেক্ট অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড, রিবা এশিয়া প্যাসিফিক অ্যাওয়ার্ডের শর্টলিস্ট এবং দ্য গার্ডিয়ান–এ ‘ডিজাইন আ বেটার ওয়ার্ল্ড’-এ প্রকাশ—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চার জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত। সাভারের এই প্রকল্প নিয়ে ৯টি ভাষায় প্রতিবেদন বা ফিচার প্রকাশিত হয়েছে। ফিলিস্তিনের একদল শিক্ষার্থী তাঁদের গবেষণাপত্র পাঠিয়েছেন জেবুন নেসা মসজিদকে কেন্দ্র করে বা প্রায় ৮০ বছর ধরে প্রকাশিত নরওয়েজিয়ান আর্কিটেকচার ম্যাগাজিনে এ মসজিদকে তাদের প্রচ্ছদে তুলে ধরেছে। এতে স্পষ্টভাবে বুঝেছি—স্থাপত্য সত্যিই ভৌগোলিক সীমা মানে না।

বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চায় এখনো সহমর্মিতা ও পরিবেশভাবনার ঘাটতি রয়ে গেছে। নারী, শিশু ও শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় নকশার কেন্দ্রে আসে না, পাশাপাশি নির্মাণপ্রক্রিয়ায় পরিবেশগত দায়বদ্ধতাও উপেক্ষিত থাকে। তবু আমি আশাবাদী। এই বছরটি আমি দেখতে চাই অন্তর্ভুক্তিমূলক জনপরিসর তৈরির সময় হিসেবে। এমন জায়গা, যেগুলো আকারে হয়তো বড় নয়, কিন্তু প্রভাবের দিক থেকে গভীর। যেখানে মানুষ শুধু প্রবেশই করবে না; নিজেকে নিরাপদ, দৃশ্যমান এবং গ্রহণযোগ্যও মনে করবে। বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় দৃশ্যমান হওয়াটাই অনেক সময় একটি অবস্থান। দৃশ্যমানতা, মর্যাদাপূর্ণতা ও শিল্প স্বাধীনতা—এই তিনটি বিষয় আজ আমাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। নীরব থেকে নয়, দায়িত্বশীল উপস্থিতির মধ্য দিয়েই আমাদের কথা বলতে হবে।

স্থাপত্য আমার কাছে শুধু মানুষের জন্য নয়। এটি মানুষসহ অন্যান্য জীব, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সহাবস্থানের একটি ভাষা। বৈচিত্র্যকে ভয় নয়, সম্মান করতে পারলেই একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক স্থান তৈরি সম্ভব। এই সময়ে সবচেয়ে জরুরি হলো মর্যাদাপূর্ণভাবে দৃশ্যমান থাকা। কারণ, বহু ক্ষেত্রে দৃশ্যমানতাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের প্রথম ভাষা। আমাদের প্রয়োজন সংযত কিন্তু দৃঢ় উপস্থিতি—যেখানে কাজের মধ্য দিয়েই দায়িত্ব নেওয়া হয়, অবস্থান স্পষ্ট করা হয়। 

স্থাপত্য যদি কেবল ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে যত্ন, অন্তর্ভুক্তি ও মর্যাদার প্রকাশ হয়ে উঠতে পারে, যদি আমরা শিল্পীসত্তার স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান দেখাতে পারি, তাহলেই হয়তো ধীরে ধীরে আমরা আরও ন্যায়, মানবিক ও সুন্দর এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।


সায়কা ইকবাল: স্থপতি