সেদিন রূপন্তীদের জন্য আরও খারাপ কিছু অপেক্ষা করছিল। তাঁদের ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে না থেমে স্টেশনের দ্বিতীয় লাইনে দাঁড়ায়। দরজা এতটা উঁচুতে ছিল যে ট্রেনের কামরায় চড়া পুরুষ যাত্রীদের জন্যই কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে, রূপন্তী তো সেখানে অন্তঃসত্ত্বা। এ অবস্থা দেখে এগিয়ে আসেন স্টেশনে থাকা একজন ভ্যানচালক। শুভ পাল প্রথমে স্ত্রী রূপন্তীকে ভ্যানের ওপরে তোলেন। সেখান থেকে তিনি ট্রেনে ওঠেন। শুভ পাল তাঁর ফেসবুক পোস্টটি শেষ করেন এভাবে, ‘দুঃখটা শেয়ার করলাম। কোনো অভিযোগ নেই। কারণ, এটা বাংলাদেশ।’

১৬ অক্টোবর তাঁর স্বামী শুভ পাল বাংলাদেশ রেলওয়ে ফ্যান গ্রুপ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে তাঁদের ট্রেনযাত্রার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কুষ্টিয়ার কুমারখালী স্টেশনে সকালের ট্রেন ধরতে গিয়েছিলেন তাঁরা। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী যেন সহজে প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে চড়তে পারেন, সে জন্য স্টেশনমাস্টারের কক্ষে গিয়ে একটি চেয়ার বা টুল চান। বলেন, স্ত্রী ট্রেনের কামরায় উঠলেই তা ফেরত দিয়ে যাবেন। তবে স্টেশনমাস্টারের কক্ষে থাকা দুজন সাফ জানিয়ে দেন, চেয়ার দেওয়া যাবে না।

২৩ অক্টোবর রূপন্তীর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, কুষ্টিয়ায় বাবার বাড়ি থেকে গোপালগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে ট্রেনেই যাতায়াত করেন তিনি। তবে সেদিন ট্রেনে চড়ার ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতা তাঁকে এখনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তিনি জানান, স্টেশনে ট্রেনের জন্য আধা ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল তাঁদের। ট্রেনে চড়ার অনেকক্ষণ পরে সিট পান। চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার যাত্রায় ট্রেনের শৌচাগারের অবস্থাও ছিল খুব খারাপ। তাঁর ছয় বছরের সন্তানকে স্বামী কাঁধে করে ট্রেনে ওঠান।

মুঠোফোনে শুভ পাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যাত্রী বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা, প্রতিবন্ধী ও শিশুরা যদি ট্রেনে চড়তেই না পারেন, তাহলে নারীদের জন্য ট্রেনে আলাদা কামরা বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকলেও কোনো লাভ হবে না।’

ভোগান্তিতে ট্রেনের নারী কর্মী ও প্রতিবন্ধীরাও

ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে দেশের প্রথম নারী ট্রেনচালক সালমা খাতুনের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ট্রেনের ইঞ্জিনরুমে ঢুকতে হয় খাড়া সিঁড়ি দিয়ে। শুধু নারীচালক নন, পুরুষদেরও ওই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে বেশ কষ্ট হয়। সালমা বললেন, ‘আমি ২০০৪ সাল থেকে সহকারী ট্রেনচালক এবং পরে ট্রেনচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমাকে এখনো মাঝেমধ্যে প্ল্যাটফর্ম থেকে ওই সিঁড়ি দিয়ে ইঞ্জিনরুমে ওঠানামা করতে অন্য সহকর্মীর সহায়তা নিতে হয়।’

উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার হুইলচেয়ারে যাতায়াত করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, হুইলচেয়ার নিয়ে ট্রেনে চড়তে পারেন না। ২০১৯ সালে তাঁর সংগঠনের পক্ষ থেকে রেলমন্ত্রী বরাবর একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সেখানে প্রতিবন্ধী, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারীদের ট্রেনে প্রবেশগম্যতার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবে এ নিয়ে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। কোনো কোনো স্টেশনে হুইলচেয়ার ও ট্রেনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। তবে প্রতিবন্ধীরা হুইলচেয়ার নিয়ে ট্রেনে চড়তে পারছেন না। ট্রেনে চড়ার জন্য র‍্যাম্প বা বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেই।

স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম উঁচু করা সংক্রান্ত এক প্রকল্পের আওতায় ৫৪টি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম উঁচু করা হয়েছে। ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখার জন্য যাত্রী মোরশেদুল হকের যে সুপারিশ, তা বাস্তবায়ন করা যায় কি না, তা-ও দেখবেন।
ড. মো. হুমায়ুন কবীর, সচিব, রেলপথ মন্ত্রণালয়

বাংলাদেশ রেলওয়ের সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখার কথা বলা আছে। অসুস্থ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সার্বক্ষণিক হুইলচেয়ার সেবা দিতে হবে বলেও উল্লেখ আছে।

শুধু ট্রেনে চড়াই ভোগান্তির কারণ নয়, ট্রেনের ভেতরের পরিবেশও এখনো নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ রেলওয়ে ফ্যান গ্রুপেই ২৪ অক্টোবর মোরশেদুল হক নামের এক যাত্রী লিখেছেন, ২৩ অক্টোবর পঞ্চগড়গামী একটি ট্রেনে ছিলেন তিনি। তাঁর পাশের এক নারী যাত্রী মুঠোফোনে কান্নাকাটি করছিলেন। জানতে চাইলেও নিজের সমস্যার কথা বলতে চাননি তিনি। পরে আরেক নারী যাত্রীর সহায়তায় জানা যায়, ওই নারীর মাসিক শুরু হয়েছে, কিন্তু এ নিয়ে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি নেই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিনের কোনো ব্যবস্থা নেই। পরে ক্রসিং থাকায় ট্রেন এক জায়গায় ২০ মিনিটের মতো থামলে মোরশেদুল হক নিচে নেমে ওই নারীকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে এনে দেন।

মোরশেদুল হক তাঁর ফেসবুক পোস্টে দূরপাল্লার আন্তনগর ট্রেনে নারীদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিনের সুবিধা রাখার অনুরোধ জানান। তবে তিনিও শুভ পালের মতো আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘আমি জানি, আমার এ লেখা কর্তৃপক্ষের কান পর্যন্ত যাবে না। তবু লিখলাম।’

নারীদের জন্য রেলওয়ের নেই তেমন কার্যক্রম

সরকারের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০২২-২৩-এ রেলপথ মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, নারীবান্ধব রেলওয়ে পরিষেবা প্রতিষ্ঠায় রেলপথ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ভবিষ্যতে সব রুটের ট্রেনে নারীদের জন্য ৩০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়েতে নারী উন্নয়নে সরাসরি কোনো প্রকল্প বা কার্যক্রম নেই।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখার কথা বলা আছে। অসুস্থ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সার্বক্ষণিক হুইলচেয়ার সেবা দিতে হবে বলেও উল্লেখ আছে।

ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী লোকাল ট্রেনে পুরোপুরি আলাদা একটি কামরায় নারীরা ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন। সরকারের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে (২০২২-২৩) উল্লেখ করা রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের পাশাপাশি তুরাগ এক্সপ্রেস ও টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেনে নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা কামরা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বাড়ছে। তবে রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেনে এখন পর্যন্ত আলাদা কামরা চালু হয়নি।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২১-২২-এ বলা হয়েছে, ট্রেন পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন। শিশু, নারী, বৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও অসুস্থ ব্যক্তিদের যাতায়াতে বিশ্বব্যাপী ট্রেনের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে দেশের ট্রেন নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। ঈদ ছাড়া ট্রেনে নারী যাত্রীদের স্বস্তি নেই। ঈদে আন্তনগর ট্রেনে নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ কামরা যুক্ত করা হয়। তবে ঈদ শেষে এ সুবিধা আর থাকে না।

রূপন্তী রানী পালের ভোগান্তির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই নারীকে যে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে ট্রেনে চড়তে হয়েছে, তা খুবই দুঃখজনক। স্টেশনে দায়িত্বরত যাঁরা ছিলেন, তাঁদের উচিত ছিল টুল বা চেয়ার দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে ওই নারীকে সহায়তা করা।’

সচিব জানান, একটি প্রকল্পের আওতায় ৫৪টি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম উঁচু করা হয়েছে। ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখার জন্য যাত্রী মোরশেদুল হকের যে অনুরোধ, তা বাস্তবায়ন করা যায় কি না, তা-ও দেখবেন তাঁরা।