দরবারে ঢুকে পীরকে কুপিয়ে হত্যা

নিহত শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরছবি: সংগৃহীত

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এক পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর দরবারে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

গতকাল শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর ওই গ্রামের মৃত জেছের আলীর ছেলে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, শামীম পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন—কয়েক বছর আগের ৩০ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও গত শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সকালে শামীমের দরবার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন। এরপর দুপুরের পর তাঁরা ওই দরবারে হামলা চালান এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রামের পাকা সড়কে শতাধিক মানুষ স্লোগান দিয়ে শামীমের দরবারের দিকে যান। মিছিলে থাকা লোকজনের একটি অংশ তাঁর দরবারের একতলা দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ঢুকে পড়ে। তাঁরা ভবনের ছাদসহ ঘরগুলোতে ভাঙচুর চালান ও আগুন ধরিয়ে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, হামলার সময় ওই দরবারের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ থেকে সাতজন আহত হয়েছেন। অন্যরা দৌড়ে চলে যান। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে আগুন নেভান।

এ ঘটনায় গতকাল গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি, এবি পার্টি, উদীচী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন পৃথক বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে তারা পীর শামীম রেজা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।

শামীম রেজার পরিচয়

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শামীম সেখানকার ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ফিলিপনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি, কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। পরে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম। পরে চাকরি ছেড়ে কেরানীগঞ্জের গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন এবং সেখানে খাদেম হিসেবে বসবাস শুরু করেন। পরে ২০১৮ সালের দিকে পৈতৃক বাড়িতে এসে তিনি নিজে একটি দরবার গড়ে তোলেন। স্থানীয় লোকজন জানান, তাঁর দরবারে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে গানবাজনা হতো।

পুলিশ, প্রশাসন ও স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৬ মার্চ এক অনুসারীর শিশুপুত্রের মরদেহ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শামীম রেজা আলোচনায় আসেন। পরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিন মাস কারাভোগের পর তিনি নিজ দরবারে ফিরে আসেন।

হামলাকারীদের ‘নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি’ পুলিশ

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, শামীম রেজাকে পুলিশ উদ্ধার করলেও বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশ কম ছিল। এ জন্য নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তাঁরা তাঁকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছেন।

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান বলেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শামীম রেজার মৃত্যু হয়। তাঁর সঙ্গে হাসপাতালে আনা অপর দুজনের মধ্যে একজন নারী, একজন পুরুষ। তাঁরা শঙ্কামুক্ত।

কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, শামীমে মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় তাঁর ভাই একটি হত্যা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত। তবে বিজিবির টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা বাড়িতে গেলেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এ ছাড়া দৌলতপুরের হোসেনাবাদের বাসিন্দা লালনশিল্পী শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশি পাহারা রাখা হয়েছে। শফি মণ্ডল ঢাকায় রয়েছেন।

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, ‘আমি ঢাকা থেকে ফেরার পথে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। কেউ যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, সেটা প্রশাসন দেখবে। হত্যা করার অধিকার কাউকে দেয়নি। সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রশাসন এর বিচার করবে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একের পর এক মবের ঘটনা ঘটে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর গণপিটুনি বা ‘মব সন্ত্রাসের’ শিকার হয়ে প্রাণ গেছে ১৯৭ জনের। আগের বছর সংখ্যাটি ছিল ১২৮।

এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের ৩১ জুলাই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা ও মব সন্ত্রাস অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।

নতুন বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না।’