অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন। খুব কম শিক্ষকই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা শাস্ত্রকে তাঁর মতো সহজ করে বলতে পেরেছেন। সাখাওয়াত আলী খানের নিয়মানুবর্তিতা, ক্লাসের পাঠ ও সহজবোধ্য উপস্থাপনকে অধ্যয়ন করতে হবে।
আজ সোমবার দুপুরে এক স্মরণসভায় অংশ নিয়ে সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের ভূমিকাকে এভাবেই মূল্যায়ন করেন তাঁর ছাত্রছাত্রীরা। তাঁদের কেউ এখন পেশায় শিক্ষক–গবেষক, কেউ সাংবাদিক, কেউবা আছেন অন্যান্য পেশায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘স্মৃতি তর্পণ’ শিরোনামে এই স্মরণসভার আয়োজন করেছিল গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ।
১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে স্নাতক কোর্স চালু হয়। সে সময় বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান। স্নাতকের প্রথম ব্যাচে প্রথম হয়ে বিভাগের শিক্ষক হয়েছিলেন সুব্রত শংকর ধর। অবশ্য পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। অধ্যাপক সাখাওয়াতের স্মরণসভায় অংশ নিয়ে সুব্রত শংকর ধর বললেন, ‘আমাদের জীবনের অনেকগুলো জায়গা স্পর্শ করে আছেন সাখাওয়াত স্যার। তাঁর জীবনে আড়ম্বর ছিল না। শিক্ষকের পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকও ছিলেন।’
সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক কাজী আবদুল মান্নান ১৯৭৪ সাল থেকে অধ্যাপক সাখাওয়াতের সহকর্মী ছিলেন। স্মরণসভায় স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘সাখাওয়াত ভাইয়ের সেন্স অব হিউমার খুব শক্তিশালী ছিল। তাঁকে আমি মিস করব।’
প্রধানমন্ত্রীর ‘স্পিচ রাইটার’ এস এ এম মাহফুজুর রহমানও অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের ছাত্র ছিলেন। বেসরকারি বার্তা সংস্থা ইউএনবির সাবেক এই সম্পাদক স্মৃতিচারণা করেন, ‘আমাদের শিক্ষকেরা ক্লাসে যা বলতেন, তাঁদের বলার ভঙ্গি ও ভাবনাগুলো এখনো আমাদের কানে বাজে।’
স্মরণসভায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা বলেন, যেসব জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক সম্পর্কে সব সময় ইতিবাচক কথা শুনেছি, তাঁদের মধ্যে সাখাওয়াত স্যার একজন। শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ার কাজটা স্যার অত্যন্ত সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছেন। শুধু পরিবার নয়, স্নেহধন্য সবার জন্য তিনি একজন অভিভাবক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। এ বিষয়টি অনুসরণীয়।
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ১৯৭২ সাল থেকে পাঁচ দশকের বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। ২০০৮ সালে অবসর নেওয়ার পর তিনি সেখানে পাঁচ বছর সংখ্যাতিরিক্ত (সুপারনিউমারারি) অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি বিভাগটির ‘অনারারি প্রফেসর’ ছিলেন। বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ৮৫ বছর বয়সে গত ৯ মার্চ ঢাকায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণসভার শুরুতে তাঁর জীবনী তুলে ধরেন সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাওন্তী হায়দার। অধ্যাপক সাখাওয়াতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করার পর শুরু হয় স্মৃতিচারণা।
সাংবাদিকতার পাঠ সহজ হওয়ার পেছনে ছিলেন অধ্যাপক সাখাওয়াত
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বর্তমান শিক্ষকদের সবাই অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের ছাত্র। পরে সহকর্মী হিসেবেও তাঁকে পেয়েছেন তাঁরা। স্মরণসভায় বর্তমান শিক্ষকদের কয়েকজন স্মৃতির ঝাঁপি থেকে অধ্যাপক সাখাওয়াতকে তুলে ধরলেন সাবেক–বর্তমান শিক্ষার্থীদের সামনে।
বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন বললেন, ‘কী করে যেকোনো সময়ে হাসিমুখে থাকা যায়, এটা ছিল স্যারের একটা বড় ব্যাপার। যত কঠিন বিষয়ই হোক, স্যার বললে সেটা মজার হয়ে যেত। সাংবাদিকতা বিভাগের সহজতার কারণও ছিলেন সাখাওয়াত স্যার। স্যারের অজস্র গল্প সব সময় আমাদের মনে থেকে যাবে।’
সাংবাদিকতা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শেখ আবদুস সালাম বলেন, ‘আমাদের কেউ বেশি শিক্ষক, কেউ বেশি পলিটিশিয়ান। কিন্তু সাখাওয়াত স্যার ছিলেন একজন মানুষ। তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন কর্ম, কথা ও সমাজকে দেওয়ার মধ্যে।’
অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বলেন, ‘সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ শাস্ত্রকে অধ্যাপক সাখাওয়াতের মতো সহজ করে আমরা আর কেউ বলতে পেরেছি কি না, জানি না। একজন শিক্ষক কোনো পদবি ছাড়াই শুধু শিক্ষক হয়েই সম্মানিত থাকতে পারেন—তিনি এর একটা উদাহরণ দেখিয়ে গেছেন। এ সময়ে তিনি সেই বিরল শিক্ষকদের একজন, যাঁর মৃত্যু হয় না।’
বিভাগের অধ্যাপক মফিজুর রহমান বলেন, ‘সাখাওয়াত আলী খানের মতো রাশভারী ও সরলতার মিশেল কম পাওয়া যায়। তাঁর নিয়মানুবর্তিতা, ক্লাসের পাঠ এবং সহজবোধ্য উপস্থাপনকে অধ্যয়ন করতে হবে। সাখাওয়াত অধ্যয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। তাঁকে অধ্যয়ন করলে আমরা নিজেদের শুধরে নিতে পারব।’
শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে অধ্যাপক সাখাওয়াতের দারুণ আন্তরিকতা ছিল বলে উল্লেখ করেন বিভাগের অধ্যাপক আবুল মনসুর আহাম্মদ। সাংবাদিকতা বিভাগ বা বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে অধ্যাপক সাখাওয়াতসহ এই বিভাগের প্রয়াত শিক্ষকদের স্মরণে বছরের অন্তত একটি স্মরণসভা আয়োজনের প্রস্তাব দেন তিনি।
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের মতো স্টোরিটেলার (কথক) আর পাওয়া যাবে কি না, সে ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম আসাদুজ্জামান।
অধ্যাপক সাখাওয়াতের অনূদিত ‘কালিদাসের মেঘদূতের পাণ্ডুলিপি’ থেকে ভূমিকাসহ কিছু অংশ পড়ে শোনান সহকারী অধ্যাপক মার্জিয়া রহমান।
‘বাবার মনজুড়ে ছিলেন ছাত্রছাত্রীরা’
স্মরণসভায় অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্ত্রী মালেকা খান, মেয়ে সুমনা শারমীন, ছেলে নওশাদ আলী খানসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন সুমনা শারমীন। তিনি প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক।
সুমনা শারমীন বলেন, ‘বাবার মনজুড়ে ছিলেন ছাত্রছাত্রীরা। তাঁর জীবন ছিল নিয়মতান্ত্রিক, পেশার প্রতি ছিল অঙ্গীকার। তিনি ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসতেন, ছাত্রছাত্রীরাও তাঁকে ভালোবাসত। তিনি কবিতা ভালোবাসতেন, ভালোবাসতেন খেলা। সাংবাদিকতাটাকেও জীবনযাপন দিয়ে লালন করেছেন।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের (ডিইউএমসিজেএএ) সভাপতি শামসুল হক বলেন, মৃত্যু পর্যন্ত অ্যালামনাইয়ের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন সাখাওয়াত আলী খান। তিনি এমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন যে যা বলতেন, তা-ই শিরোধার্য ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তৈয়েবুর রহমানের সভাপতিত্বে ও অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও প্রশিক্ষক কুর্রাতুল-আইন-তাহ্মিনা, প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মিনহাজ উদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ, সংগীতবিষয়ক পত্রিকা ‘সরগম’–এর সম্পাদক কাজী রওনাক হোসেন, শহীদ আসাদ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান মিলন, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) পরিচালক ফিলিপ গাইন, পেট্রোবাংলার উপমহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তরিকুল ইসলাম খান, ডিইউএমসিজেএএর সাধারণ সম্পাদক মীর আত্তাকী মাসরুরুজ্জামান প্রমুখ। অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর দুজন শিক্ষার্থী স্মরণসভায় গান পরিবেশন করেন।