রাইড শেয়ারিং চালুর পর মোটরসাইকেলও এখন অনেকটা গণমানুষের বাহনে পরিণত হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর রাইড শেয়ারিংয়েও ভাড়া বেড়েছে। মাসের বাজার খরচের সঙ্গে জ্বালানির বাড়তি খরচ নিয়ে চিন্তায় প্রাইভেট কারের মালিকেরা।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশের জ্বালানির ৬৫ শতাংশের ভোক্তা পরিবহন খাত। গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যানের প্রায় পুরোটাই ডিজেলনির্ভর। এর মধ্যে বাস, লঞ্চ, ট্রেন, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান, পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান উল্লেখযোগ্য।

গণপরিবহনের মূল ব্যবহারকারী নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। এই পরিস্থিতিতে দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি বেকায়দায় ফেলেছে তাঁদের।

default-image

সরকার শুধু নন-এসি বাস, লঞ্চ ও ট্রেনের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। বাকি যানবাহনের ভাড়া মালিক-শ্রমিকের ইচ্ছায় বাড়ে। তবে বাস ও লঞ্চের ভাড়া সরকার ঠিক করে দিলেও তা মালিক-শ্রমিকেরা কখনোই মানেননি। তাই সরকার ভাড়া ঠিক করে দিলেও গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

গতকাল দিনভর পেট্রলপাম্প, বাস টার্মিনাল, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে মানুষের মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিই ছিল আলোচনার প্রধান বিষয়। এমনকি বাসাবাড়ির দারোয়ান, কাজের মানুষ, গাড়ির চালক—সবারই এক জিজ্ঞাসা, জীবনযাত্রার ব্যয় কত বাড়বে।

রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডে একটি বহুতল ভবনের গ্যারেজে দেখা যায়, দারোয়ান ও চালকেরা জটলা করে মুঠোফোনে পেট্রলপাম্পে জ্বালানি নিতে আসা মানুষের দুর্ভোগ ও ক্ষোভের ভিডিও দেখছেন। তাঁদের মধ্যে একজন বলে ওঠেন, ‘এই চাপ মনে হয় নিতে পারব না। এত দিন ছিল বাজারে আগুন (মূল্যবৃদ্ধি)। এখন সব জায়গায় তা ছড়িয়ে পড়বে।’

নতুন ভাড়া নির্ধারণ

গত বছরের নভেম্বরে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সারা দেশে বাসের ভাড়া গড়ে ২৭ শতাংশ বাড়ায় সরকার। তবে তখন পরিবহনমালিক-শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সরকার নির্ধারিত হারের বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ওঠে। ৯ মাসের মাথায় আবারও দূরপাল্লার পথে ২২ শতাংশ আর নগরে বাসভাড়া বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ৪০ পয়সা বেড়ে ২ টাকা ২০ পয়সা হয়েছে। বর্তমানে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৮০ পয়সা। এর সঙ্গে বিভিন্ন সড়ক, সেতু ও ফেরির টোল তো থাকছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ নগর পরিবহনে প্রতি কিলোমিটার ৩৫ পয়সা ভাড়া বেড়ে এখন ২ টাকা ৫০ পয়সা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২ টাকা ১৫ পয়সা। মিনিবাসে বর্তমানে ২ টাকা ৫ পয়সা। এটি বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ টাকা ৪০ পয়সা। বাস-মিনিবাসে সর্বনিম্ন ভাড়া আগের মতোই যথাক্রমে ১০ ও ৮ টাকা থাকছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ধারণার চেয়ে বেশি নির্ধারণ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাস ও লঞ্চে ভাড়া কত বাড়তে পারে, তার একটি ধারণা দিয়েছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গতকাল মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রতি কিলোমিটারে বাসভাড়া সর্বোচ্চ ২৯ পয়সা আর লঞ্চে ৪২ পয়সা বাড়তে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার নিজেদের হিসাব ধরে রাখতে পারেনি।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গতকাল বনানীতে বিআরটিএ কার্যালয়ে ভাড়া নির্ধারণী বৈঠকে সড়ক মন্ত্রণালয় বাসভাড়া ৩০ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। কিন্তু পরিবহনমালিক-শ্রমিকনেতারা মানেননি। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা চলে বৈঠক। শেষ পর্যন্ত রাত পৌনে ১০টার দিকে চূড়ান্ত ভাড়ার হার ঘোষণা করেন বিআরটিএর চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার। আজ রোববার থেকে নতুন ভাড়া কার্যকর হবে।

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী বলেন, ‘যাত্রী ও মালিক সবার কথা বিবেচনা করে মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ভাড়ার প্রস্তাব আমরা করেছি।’

আগেই যাত্রীদের গলা কাটা শুরু

গতকাল বিকেল পাঁচটার কিছু পর বাসের ভাড়া পুনর্নির্ধারণে বনানীতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রধান কার্যালয়ে পরিবহনমালিক-শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে বৈঠক শুরু হয়। ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা আসে রাত পৌনে ১০টার দিকে। তবে এর আগেই গতকাল সকাল থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে বাস চলাচল কমিয়ে দেন পরিবহনমালিকেরা। এতে দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ। রাজধানী ঢাকা ও দূরপাল্লার পথে যেসব বাস নেমেছে, সেগুলোতে ১০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়। সিএনজিচালিত অটোরিকশায়ও বাড়তি ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। বাসের সংকট থাকায় মানুষকে মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে দেখা যায়। এতেও বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়।

রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে সকাল ১০টার দিকে মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে সদরঘাট রুটের তানজিল পরিবহনের একটি বাসের সহকারী যাত্রীদের উদ্দেশে বলছিলেন, ‘ফার্মগেট ২৫, গুলিস্তান ৪০।’ শুক্রবার পর্যন্ত এই দূরত্বে ভাড়া ছিল যথাক্রমে ১৫ ও ২৫ টাকা।

গতকাল সকালে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, দূরপাল্লায় যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহনশ্রমিকদের বাগ্‌বিতণ্ডা হচ্ছে।

রাজধানী এক্সপ্রেস পরিবহনে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ার ভাড়া ৪০০ টাকা। গতকাল সকালে ৫০০ টাকা নিতে দেখা গেছে। রাজবাড়ীর ভাড়া ৩০০ টাকা, নেওয়া হয় ৪০০ টাকা।

ঝিনাইদহ যেতে স্ত্রীকে নিয়ে গাবতলী আসেন ইকবাল মিয়া। তিনি বলেন, ‘বাসে জনপ্রতি ৭০০ টাকা ভাড়া চাইছে। অথচ ভাড়া ৫০০ টাকা। দর-কষাকষি করে দুজনের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকায় টিকিট নিলাম।’

সেখানে জননী পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাত্রীপ্রতি ১০০ টাকা ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ ৫০ টাকা বেশি দিচ্ছে। যার থেকে যতটা নেওয়া যাচ্ছে আরকি।’

আমাদের ঢাকার বাইরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-উত্তরবঙ্গের প্রায় সব পথে বাস কম ছিল। যারা চলেছে, তারা বাড়তি ভাড়া নিয়েছে। চট্টগ্রাম নগরের একটি শিল্পকারখানায় কাজ করেন মোহাম্মদ ইউনুস। জরুরি প্রয়োজনে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে যেতে নগরের অলংকার মোড়ে প্রায় এক ঘণ্টা ঘুরে টিকিট পান। তবে সাধারণ মানের একটি বাসে ভাড়া গুনতে হয়েছে ৭০০ টাকা। তিনি বলেন, আগে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় টিকিট পাওয়া যেত। সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকার পথে নন-এসি বাসে ভাড়া ৬০০-৬৫০ টাকা। গতকাল সকাল থেকে ১০০ টাকা বেশি নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন