টিস্যুর মতো প্রশাসনকে ব্যবহার করা যায় কী করে, প্রশ্ন আইনজীবী শিশির মনিরের
‘প্রশাসন বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কাছে যে কেউ চাইলেই যে কারও বিরুদ্ধে মামলা করে কী করে? কীভাবে প্রশাসন টিস্যুর মতো ব্যবহৃত হতে পারে? মামলা করতে চাইলেই কি মামলা করা যাবে? এখানে কি কোনো ভেরিফিকেশন সিস্টেম নেই?’ এই প্রশ্নগুলো করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে এক আলোচনায় অংশ নিয়ে শিশির মনির এ কথাগুলো বলেন। ভুক্তভোগী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৬১টি ভুয়া মামলা দায়েরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
শিশির মনির জানান, ওই ভুক্তভোগী পেশায় একজন সাধারণ লবণ ব্যবসায়ী। তাঁর বিরুদ্ধে একে একে মোট ৬১টি মামলা করা হয়। সব কটি মামলাতেই ‘মানব পাচারের’ অভিযোগ আনা হয়। এই আইনজীবীর সহায়তায় সম্প্রতি ওই ব্যক্তি সব মামলা থেকে জামিন পেয়েছেন।
শিশির মনির বলেন, আইনি হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনা বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারই প্রতিফলন। সতর্ক করে তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি ‘নির্যাতনের যন্ত্র’ (টর্চার মেকানিজম) হয়েই থাকবে। এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে, যেখানে দ্রুততম সময়ে মানুষের বিচার পাওয়া বা না পাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
আইনি হেফাজতে মৃত্যু ৪৮৬
আলোচনাসভায় ‘নির্যাতন প্রতিরোধ, প্রতিকার, ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও করণীয়’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধিকারের পরিচালক (প্রোগ্রাম) মো. সাজ্জাদ হোসেন। প্রতিবেদনে ২০০১ থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত আইনি হেফাজতে মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরা হয়। অধিকার জানায়, এই দীর্ঘ সময়ে দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও হেফাজতে মৃত্যু থামেনি। গত ২৫ বছরে হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে ৪৮৬ জন মারা গেছেন।
প্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি আমলে ১৮৪ জন আইনি হেফাজতে মারা গেছেন, যা মোট মৃত্যুর ৩৮ শতাংশ। আর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মারা গেছেন ২১৩ জন বা ৪৪ শতাংশ। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মৃত্যু হয়েছে ২৯ জনের (৬ শতাংশ)। এ ছাড়া বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত আইনি হেফাজতে দুজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
অধিকার আরও জানায়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৪৮টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন। সংস্থাটির মতে, শাসনামল বদলালেও আইনের কাঠামোগত ত্রুটির কারণে মানবাধিকার সংকট কাটছে না।
নির্যাতন প্রতিরোধে সুপারিশ
নির্যাতন প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য ‘অধিকার’ ১০টি সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, স্বাধীন তদন্ত সংস্থা ও মনিটরিং সেল গঠন এবং একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা। এ ছাড়া গুম ও নির্যাতন রোধে বিশেষ আইনি সংস্কার, ‘শূন্য সহনশীলতা নীতি’ বাস্তবায়ন, ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানায় সংস্থাটি।
অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব এবং ‘ডেইলি ওয়াদা’র এডিটর ইন চিফ শফিকুল আলম বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাড়াও বড় বড় মামলায় নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। এতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি আদৌ প্রকৃত অপরাধী কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় থেকে যায়। তিনি বলেন, শুধু আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করলেই হবে না; বরং পুরো নিরাপত্তা বাহিনী, তদন্তব্যবস্থা ও প্রসিকিউশন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বিচারব্যবস্থাকে গণমুখী করতে সংস্কারের বিকল্প নেই।
এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পেছনে যারা যুক্ত ছিল, তাদের অপরাধের বিচার না হলে দেশ এগোবে না। পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর মানুষের বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রবণতা ফ্যাসিবাদের সময়ে গড়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে দানব হয়ে উঠেছিল, সংস্কার ছাড়া তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা বলেন, বিগত সরকারের সময়ে গুম, খুন ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, জুলাই সনদের সঙ্গে প্রতারণা করা হলে পুরোনো নির্যাতনের সংস্কৃতিই ফিরে আসবে। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ফয়েজুল হাকিম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কারের যেসব উদ্যোগ ছিল, নতুন সরকার সংসদকে সব ক্ষমতার উৎস ভেবে সেগুলো বাদ দিয়েছে। তিনি আইনি হেফাজতে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।
অধিকারের পরিচালক তাসকিন ফাহমিনার সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাইমা ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মিরপুরে নির্যাতনে নিহত ইশতিয়াক হোসেন জনির ভাই ইমতিয়াজ হোসেন, জুলাই আন্দোলনের ভুক্তভোগী মুহাইমিন পুলক এবং শহীদ শেখ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম। বক্তারা দলমত–নির্বিশেষে সবার জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।