নদীতে চলছে আড়াই লাখ নৌযান, নিবন্ধিত মাত্র ২০ হাজার

প্রথম নৌশুমারিতে দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌযান পাওয়া গেছে ২ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি। নিবন্ধিত নৌযানের চেয়ে এই সংখ্যা প্রায় ১২ গুণ।

নৌযানফাইল ছবি

দেশের নদী–নৌপথে প্রতিদিন কত নৌযান চলছে, স্বাধীনতার পর এত বছরেও তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব ছিল না। অথচ এই নৌপথেই যাত্রী যায়, পণ্য যায়, মাছ ধরার ট্রলার চলে, চলে ফেরি, লঞ্চ, স্পিডবোট, বাল্কহেড ও ড্রেজার। অবশেষে সরকার প্রথমবারের মতো নৌযান শুমারি করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নৌযান শুমারি ২০২৬–এর লিস্টিং অপারেশনের (নৌযান তালিকাভুক্তি কার্যক্রম) প্রাথমিক হিসেবে দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌযান পাওয়া গেছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬০টি। এর মধ্যে ঘাটভিত্তিক নৌযান ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৪৪টি এবং অন্যভাবে তালিকাভুক্ত নৌযান ৭০ হাজার ৭১৬টি। তবে দুর্গম এলাকায় কিছু নৌযানের তথ্য এখনো তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্তির কাজ চলায় সংখ্যা সামান্য কম–বেশি হতে পারে বলে বিবিএস জানিয়েছে।

এই একটি সংখ্যাই নৌ খাতের পুরোনো সংকটকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। কারণ, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত নৌযান ছিল ২০ হাজার ৫৫২টি। অর্থাৎ শুমারিতে পাওয়া ইঞ্জিনচালিত নৌযানের সংখ্যা নিবন্ধিত নৌযানের চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি। এর অর্থ হলো, দীর্ঘদিন ধরে দেশের নদ–নদীতে বিপুলসংখ্যক নৌযান চললেও সেগুলোর বড় অংশই কার্যত সরকারি তদারকির বাইরে ছিল।

এই শুমারির সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা মো. আরিফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এটা কেবল ইঞ্চিনচালিত নৌযানের প্রাথমিক তালিকা। এসব নৌযানের বিস্তারিত তথ্য তথা ইঞ্জিনচালিত নৌযানের ক্যাটাগরি (ধরন), ইঞ্জিনের সক্ষমতা, নৌযানে নিয়োজিত জনবলের তথ্য, কোন রুটে কত নৌযান চলছে—এসবের বিস্তারিত শুমারি শুরু হবে চলতি বছরের আগস্ট মাস থেকে। ওই শুমারি শেষ হলে ইঞ্জিনচালিত নৌযানের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

বিবিএসের শুমারিটি হয়েছে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রকল্পের আওতায়। বিবিএস ২০২৬ সালের ৪ থেকে ১৭ মে দেশব্যাপী নৌযান তালিকাভুক্তি কার্যক্রম শুরু করে। তথ্য সংগ্রহে তারা কম্পিউটার এসিসটেড পারসোনাল ইনটারভিউয়িং (সিএপিআই) অ্যাপ ব্যবহার করেছে। এই শুমারিতে প্রতিটি নৌঘাটের জিপিএস অবস্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে। এ জন্য মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন ১ হাজার ২৯৩ জন তথ্যসংগ্রহকারী। তাঁদের কাজ তদারকিতে ছিলেন উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের শুমারি সমন্বয়কারীরা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এই শুমারির লক্ষ্য হলো দেশের সমুদ্রগামী, উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ ইঞ্জিনচালিত নৌযানের তথ্য সংগ্রহ করে একটি আধুনিক ‘ন্যাশনাল শিপস অ্যান্ড মেকানাইজড বোট ডেটাবেজ’ তৈরি করা। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত, ব্যয় প্রায় ৪৩ কোটি টাকা। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন নৌযান শনাক্ত, দুর্ঘটনা হ্রাস এবং নৌপরিবহন খাতে পরিকল্পনা প্রণয়নে এই শুমারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নৌশুমারিতে প্রায় ২৫ ধরনের নৌযানের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আছে কার্গো, বাল্কহেড, যাত্রীবাহী লঞ্চ, স্পিডবোট, ট্রলার, ড্রেজার, ফেরি ও প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ইঞ্জিনচালিত নৌযান। এই বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের নৌপথের বাস্তবতা বোঝায়। একই নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ, বালুবাহী বাল্কহেড, মাছ ধরার ট্রলার, ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ফেরি চলাচল করে। কিন্তু সবার গতি, আকার, চালকের দক্ষতা, নকশা ও নিরাপত্তা মান এক নয়। তাই শুধু নৌযানের সংখ্যা জানা যথেষ্ট নয়; কোন ধরনের নৌযান কোথায় চলছে, কার নিবন্ধন আছে, কার ফিটনেস আছে, কারচালক প্রশিক্ষিত—এসব তথ্যও নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি।

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৯৯১ সাল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ নৌপথে ৬৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮৮১ জন, আহত হয়েছেন ৭০৫ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫০৫ জন। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযান ছিল ২৫২টি, মালবাহী নৌযান ১৮০টি এবং অন্যান্য ২০৯টি।

সাম্প্রতিক বছরেও নৌপথ নিরাপদ হয়নি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ১৩২টি নৌ দুর্ঘটনায় ১৪৯ জন নিহত, ১২৩ জন আহত এবং ৩৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন। সংগঠনটি জাতীয় দৈনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও নিজস্ব উৎসের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীমাতৃক দেশে নৌপথকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সড়কের চাপ কমানো, পণ্য পরিবহন সাশ্রয়ী করা এবং উপকূল-হাওর-চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নৌপথের বিকল্প কম। কিন্তু নিরাপত্তাহীন নৌপথ উন্নয়নের প্রতীক হতে পারে না। স্বাধীনতার পর প্রথম নৌশুমারি তাই একটি বড় শুরু।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নৌশুমারি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত কাজ নয়; এটি নৌ নিরাপত্তার ভিত্তি হতে পারে। কারণ, সরকার এখন প্রথমবারের মতো বুঝতে পারছে, বাস্তবে কত নৌযান নদীতে আছে। কিন্তু এই হিসাব যদি শুধু ডেটাবেইসে আটকে থাকে, তাহলে দুর্ঘটনা কমবে না। প্রতিটি নৌযানকে নিবন্ধন, সার্ভে, ফিটনেস, চালকের সনদ, রুট অনুমতি ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে বাল্কহেড, ড্রেজার, স্পিডবোট ও যাত্রীবাহী নৌযানের ক্ষেত্রে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি দরকার।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. ইমরান উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, নদীমাতৃক দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো মূলত সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল। নৌপথকে আরও দক্ষ ও নিরাপদ করতে অনিবন্ধিত নৌযানগুলোর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ এবং সেগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা একটি প্রাথমিক ও জরুরি পদক্ষেপ। অধ্যাপক ইমরানের মতে, এটি যাতায়াত ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ নৌশুমারি হয়নি জানিয়ে ইমরান উদ্দিন বলেন, এর আগে ২০১৬ সালে একটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। নৌযানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা গেলে সেগুলোকে আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। এর ফলে নৌযানগুলোর নিয়মিত সার্ভে করা এবং মাস্টার বা চালকদের যথাযথ যোগ্যতা, ট্রেনিং ও সার্টিফিকেট আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা ও মনিটরিং করা সম্ভব হবে।