আদালতে জেলা প্রশাসকের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন ফকির। পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে আদালত অবমাননার ওই আবেদন করা হয়েছিল। আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রিপন বাড়ৈ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায় উপস্থিত ছিলেন।    

বেলা দুইটার দিকে শুনানির শুরুতে জেলা প্রশাসকের আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন ফকিরের উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘ঢালাওভাবে আদালত অবমাননার রুল ইস্যু করা হয় না। তাঁকে (জেলা প্রশাসক) অনেকবার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আদালতের আদেশ পালন করেননি। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলও সারেন্ডার করেছেন। তারপর তাঁকে (জেলা প্রশাসক) ডেকেছি।’

জেলা প্রশাসকের আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, এসব বিষয়ে উনি (জেলা প্রশাসক) সচেতন। আদালত বলেন, ‘আগের আদেশ বাস্তবায়ন করেননি? একটির পর একটি মামলা বের হয়। উনি কি আনডিউ (অন্যায্য) সুবিধা পাচ্ছেন? জেলা প্রশাসক হিসেবে তাঁর উচিত ছিল স্থগিতাদেশ (উচ্ছেদ কার্যক্রম) প্রত্যাহারের আবেদন করা।’

আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, এ জন্য সুযোগ দিতে হবে। এক ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ অনুসারে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সময় আছে। এ সময় আবেদনকারী (আদালত অবমাননার) পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৩১ অক্টোবরের পরিবর্তে ২৪ অক্টোবর আপিল বিভাগে শুনানির জন্য দিন ধার্য আছে।

২৫ আগস্ট থেকে চুপ কেন

একপর্যায়ে জেলা প্রশাসকের উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘পর্যটন এলাকা হিসেবে কক্সবাজারকে সবাই চেনে।  কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক হিসেবে আপনাকেও চেনে। কক্সবাজার থাকবে কি না, তা আপনার ওপর নির্ভর করে। এ বিষয়ে আপিল বিভাগও আদেশ দিয়েছেন। যদি কক্সবাজারকে সুন্দর করতে ও রাখতে পারেন, তাহলে আপনার ক্রেডিট। না পারলে আপনার ডিসক্রেডিট।’

আদালত আরও বলেন, ‘বলছি না উচ্ছেদ করে তাদের (দখলদার) বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিতে। পুনর্বাসন করা যায় কি না—চিন্তা করবেন। এত সুন্দর সৈকতকে আমরা ইউটিলাইজ করতে পারছি না। সুন্দর ব্যবস্থাপনা করুন। এখানে দায়িত্ব পেলে কাজ করার সুযোগ অনেক বেশি পাওয়া যায়। এ সুযোগ নিচ্ছেন না কেন?’

জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। আদালত বলেন, ‘গত ২৫ আগস্ট আদেশ দেওয়া হয়। পত্রিকা-টিভি দেখি আপনার পারফরমেন্স আছে কি না? পারফরমেন্স শুধু জিরো নয়, নেগেটিভ। ২৫ আগস্ট থেকে চুপ কেন?’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘উচ্ছেদ করতে গিয়ে আদালতের আদেশ (উচ্ছেদ না করাসংক্রান্ত) পেয়েছি। আদালতের আদেশ শতভাগ বাস্তবায়নে অঙ্গীকার আছে। তবে বোঝায় কিছু ভুল হতে পারে।’  

আদালত বলেন, ‘করব বললে হবে না, আদালতের আদেশ অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ না মানলে আপনার ক্যারিয়ার নষ্ট হবে।’
জেলা প্রশাসক বলেন, অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে।

শুনানি নিয়ে আদালত জেলা প্রশাসককে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়ে ৯ নভেম্বর পরবর্তী দিন রাখেন।

পরে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ প্রথম আলোকে বলেন, আদালতে দাখিল করা লিখিত বক্তব্যে জেলা প্রশাসক নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। হাইকোর্ট তা গ্রহণ করে তাঁকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। তবে উচ্ছেদ কার্যক্রম বিষয়ে আপিল বিভাগে শুনানির জন্য ২৪ অক্টোবর দিন রয়েছে। শুনানির পরে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত এলাকায় থাকা বাকি অবৈধ দখল-স্থাপনা উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসককে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

৪১৭ স্থাপনা উচ্ছেদ, বাকি ২৩৩টি

আদালতে জেলা প্রশাসক একটি হলফনামা দাখিল করেন, যাতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবরে জেলা প্রশাসকের পাঠানো একটি স্মারক যুক্ত রয়েছে।

হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ে স্মারকের চতুর্থ প্যারায় বলা হয়, আদালতের আদেশ অনুসরণে উচ্ছেদ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ১০ অক্টোবর পুনরায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে সুগন্ধা পয়েন্ট, লাবণী ও কলাতলী সমুদ্রসৈকত এলাকায় ৪১৭টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। দুটি সংগঠন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের আদেশ দেখান। এ আদেশে দেখা যায়, সুগন্ধা ঝিনুক মার্কেট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষে জাকির হোসেন এবং অপর একজন সমুদ্রসৈকতে অবস্থিত তাঁদের ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য সময় প্রার্থনা করেন। আদালত সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেন এবং এই সময় পর্যন্ত তাঁদের উচ্ছেদ না করার আদেশ দেন। এ কারণে ১০ অক্টোবর দুটি সমিতির ২৩৩টি (১৪৩+৯০) দোকান উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ওই দোকানদারেরা তাঁদের মালামাল বেশির ভাগই সরিয়ে নিয়েছেন। বাকি মালামাল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।