কালীগঙ্গা নদীর পূর্ব পাড় হলুদ হয়ে আছে শর্ষে ফুলে ফুলে। পশ্চিম পাশে মৌসুমি ফুলের সমারোহ। মাঝেমধ্যে আমগাছের সারি। তার শাখা থেকে ঝুলছে দোলনা। শীতের তীব্রতাও কয়েক দিন থেকে কমেছে। আর মিষ্টি রোদ পরিবেশকে করে তুলেছে নাতিশীতোষ্ণ। উপভোগ্য এই পরিবেশেই দিনভর পিঠাপুলি, গ্রামীণ মেলা, মজার মজার খেলাধুলা আর গানে গানে অনুষ্ঠিত হলো পার্বণ নবান্ন উৎসব।
আজ বৃহস্পতিবার মানিকগঞ্জ পৌরসভার চর বেউথা এলাকার কালীগঙ্গা নদীর তীরে ‘দ্য গার্ডেন টি হাব’ নামের আমবাগানে দেশের অন্যতম প্রধান ব্র্যান্ড পার্বণের উদ্যোগে এই পার্বণ উৎসব আয়োজন করেছে প্রথম আলো ডটকম। এবার তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই পার্বণ নবান্ন উৎসব।
সকালে উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফারজানা প্রিয়াঙ্কা। তিনি বলেন, ‘নবান্ন আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক উৎসব। আবহমান কাল থেকে জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই উৎসবে অংশ নেন। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।’
উৎসবের অতিথি বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পী ফজলুর রহমান বাবু বলেন, ‘শীতের সকালে নদীর পাড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন আয়োজন অত্যন্ত আনন্দময়। আমাদের জীবন থেকে অনেক কিছুই ক্রমে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক কিছু মুছে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। কিন্তু আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার ধারণ করে সবাই মিলে সুন্দরভাবে, আনন্দের সঙ্গে বেঁচে থাকতে চাই।’
টানা তিনবার এ অনুষ্ঠান আয়োজন করায় আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান মানিকগঞ্জ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার আবু মো. নাহিদ।
ইস্পাহানি গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক এইচ এম ফজলে রাব্বি বলেন, ইস্পাহানি দেশের একটি জনপ্রিয় ও দীর্ঘকালের আস্থার প্রতিষ্ঠান। ইস্পাহানির অ্যাগ্রো প্রডাক্ট পার্বণ চাল নিয়ে নবান্ন উৎসব করছে। গান, খেলা, পিঠাপুলির অঞ্চল হিসেবে মানিকগঞ্জের সারা দেশে খ্যাতি রয়েছে। তিনি উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য সবাইকে শুভেচ্ছা জানান।
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, ‘আজ সারা দিন এখানে গান, খেলাধুলা, পিঠাপুলিসহ অনেক রকম আয়োজন থাকবে। আমরা সবাই মিলে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি দিন কাটাব।’
আনুষ্ঠানিকতার পর শুরু হয় গানের পালা। মানিকগঞ্জের বিশিষ্ট লোকসংগীতশিল্পী আবুল বাসার আব্বাসী তাঁর নিজের লেখা গান ‘ভাসাইলাম দেহতরি দয়াল তোমার নাম লইয়া/ কিনারায় ভিড়াইও তরি নিজে মাঝি হইয়া’ গেয়ে শুরু করেন তাঁর পরিবেশনা। সঙ্গে ছিলেন তাঁর দলের সহশিল্পীরা। এরপর তিনি গেয়েছেন ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান’, ‘আমারে পিরিত কইরাছে বৈরাগিণী’সহ বেশ কয়েকটি গান। এরপর মঞ্চে আসেন মানিকগঞ্জের স্বনামখ্যাত প্রবীণ লোকসংগীতশিল্পী সাইদুর রহমান বয়াতি ও তাঁর দলের শিল্পীরা। তাঁরা পরিবেশন করেন ‘আমার মনন আছে আমার প্রাণন আছে’। তাঁর পরিবেশনার পর মঞ্চের অনুষ্ঠানে মধ্যাহ্নবিরতি ঘোষণা করেন সঞ্চালক জোনাকি জ্যোতি।
পার্বণ উৎসবে বরাবরের মতো এবারও গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আলোকে সাজানো হয় মঞ্চ। মাঠের পশ্চিম দিকে বসেছে গ্রামীণ মেলার আদলে স্টলের সারি। সেখানে ছিল খাজা-গজা, পিঠাপুলির স্টল। আরও ছিল মৃৎশিল্প, বাঁশবেতের সামগ্রী। উপস্থাপন করা হয়েছে হরেক রকমের ধান, সবজি ও ঔষধি গাছের নমুনাসহ হরেক রকম সামগ্রী।
এক পাশে ছিল ইস্পাহানি চায়ের স্টল। সেখান থেকে দর্শকদের সারা দিন চাহিবামাত্র সরবরাহ করা হয়েছে বিনা মূল্যে গরম-গরম চা। পার্বণের স্টলে ছিল তাদের বিখ্যাত চালের সমাহার। ইস্পাহানি অ্যাগ্রোর ব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান জানালেন, তাঁরা নিজেদের সরবরাহ করা বীজ থেকে তালিকাভুক্ত চাষিদের মাধ্যমে ধান উৎপাদন করেন। এ কারণে তাঁদের চালের গুণমান ঠিক থাকে। তাঁদের সুগন্ধি পোলাওয়ের চালের মধ্যে আছে দিনাজপুরের ‘চিনিগুঁড়া’, শেরপুর জেলার ‘কালিজিরা’ ও ‘তুলসীমালা’। এগুলো ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। এ ছাড়া তাঁদের ভাতের চালের মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের ‘কাটারিভোগ’, ‘জিরাশাইল’, ‘নাজিরশাইল’, ‘পাইজাম’, বিআর-২৮ ও ‘বাংলামতি’। এসব চাল পাঁচ কেজির প্যাকেট পাওয়া যায় ৪৫০ থেকে ৪৭৫ টাকায়। মধ্যাহ্নবিরতির সময় দর্শক ও অতিথিদের আপ্যায়িত করা হয় পার্বণ চালের খিচুড়ি খাইয়ে।
বিকেলের উৎসব
বিকেলে জমে উঠেছিল উৎসব, কুইজ, পুরস্কার বিতরণী আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। দর্শক সমাগমে ভরে উঠেছিল আমবাগান। শিশুদের জন্য ছিল বিস্কুট দৌড়, বড়দের চোখ বেঁধে হাঁড়িভাঙা এমন মজার মজার খেলা। ওদিকে মঞ্চে শুরু হয় কুইজ প্রতিযোগিতা। বিজয়ীরা নগদ পুরস্কার পেয়েছেন পার্বণ চালের প্যাকেট। এই পর্বে দর্শকদের সঙ্গে মজার মজার কথাবার্তায় অংশ নেন অভিনয়শিল্পী ফজলুর রহমান বাবু, চিত্রনায়িকা প্রার্থনা ফারদিন দীঘি, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান শাওন মজুমদার ও ফুড ব্লগার নুসরাত ইসলাম। দর্শকদের অনুরোধে ফজলুর রহমান বাবু ‘নিথুয়া পাথারে’ গানটি গেয়ে শোনান।
দীঘি বলেন, মানিকগঞ্জ তাঁর খুব প্রিয় এলাকা। এখানে অনেক নাটক বা চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রহণ হয়। তিনিও কাজের প্রয়োজনে আসেন। পার্বণ নবান্ন উৎসবটি খুব উপভোগ করেছেন। পরে আয়শা আক্তার জেরিন পরিবেশন করেন ‘মীনা কার্টুন’–এর চরিত্রগুলোর কণ্ঠ অনুকরণ করে ‘মিমিক্রি’।
সমাপনী অনুষ্ঠানে সারা দিন ধরে এই উৎসবে অংশ নিয়ে আয়োজন উপভোগ করার জন্য দর্শকদের ধন্যবাদ জানান ইস্পাহানি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক ওমর হান্নান। তিনি বলেন, তিন বছর ধরেই মানিকগঞ্জে পার্বণ নবান্ন উৎসব হচ্ছে। এই এলাকার দীর্ঘকালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে নবান্ন উৎসব আয়োজন করা হবে বলে তিনি জানান। সমাপনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর চিফ ডিজিটাল বিজনেস অফিসার জাভেদ সুলতান ও হেড অব কালচারাল প্রোগ্রাম কবির বকুল।
বিকেলে গানের পালা শুরু হয়েছিল ব্যান্ডদল ‘প্রখর’–এর পরিবেশনা দিয়ে। তারা এলআরবি, মাইলস, নগর বাউল জেমসের বেশ কিছু জনপ্রিয় গান গেয়ে শোনান। গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘সেই তুমি’, ‘নিঃস্ব করেছ আমায়’, ‘পাগলা হাওয়ার তোড়ে’।
অনুষ্ঠান শেষ হয়েছিল শিল্পী জিনিয়া জাফরিন লুইপার গানে গানে। তিনি শুরু করেছিলেন ‘তোমার আকাশ দুটি চোখে/ আমি হয়ে গেছি তারা’ গেয়ে। পরের দুটি গান ছিল ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’ এবং ‘বকুল ফুল, বকুল ফুল’। ওদিকে নদীর ওপর আকাশে তখন ঘন হয়ে আসছিল বেলা শেষের কুয়াশা। আনন্দময় উৎসব থেকে গানের সুর প্রাণে নিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন দর্শকেরা।