দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন শরীফ। তিনি কক্সবাজারে ৭২টি প্রকল্পে সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি, কিছু রোহিঙ্গার এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতি, কর্ণফুলী গ্যাসে অনিয়মসহ বেশ কিছু দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মামলা করেন।

গত বছরের ১৬ জুন শরীফ উদ্দিনকে চট্টগ্রাম থেকে পটুয়াখালীতে বদলি করা হয়। এরপর তাঁকে  ১৬ ফেব্রুয়ারি চাকরিচ্যুত করা হয়। চাকরিচ্যুতির কোনো কারণ উল্লেখ করেনি কর্তৃপক্ষ। তিনি ২৭ ফেব্রুয়ারি ওই আদেশ প্রত্যাহারপূর্বক চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন করেন। তবে তাঁর আবেদন কমিশনের কাছে বিবেচিত হয়নি।শরীফকে চাকরিতে পুনর্বহাল চেয়ে এক আইনজীবী হাইকোর্ট রিট করেন। সেটির এখনো শুনানি হয়নি।

সাড়ে সাত বছরের চাকরিজীবনের প্রথম ছয় বছরই বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) শরীফ উদ্দিনকে দুদকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ‘অতি উত্তম’ হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তাঁকে তদন্তকাজে ‘অভিজ্ঞ’ এবং ‘উদ্যমী ও দক্ষ কর্মকর্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে দুদক। চাকরিচ্যুতির কোনো কারণ উল্লেখ করেনি কর্তৃপক্ষ।

শরীফ বলেন, ‘আমি নিজের ইচ্ছায় কিছু করিনি। অনুসন্ধান, মামলা দায়ের ও তদন্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে করেছি। যেসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দিয়েছি, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে। তদন্তে যা পেয়েছি, তা–ই তুলে ধরেছি। দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে কখনো আপস করিনি। দুর্নীতিবাজরা বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়ে বলেছিলেন কীভাবে চাকরি করি দেখে নেবে। ফেসবুকে দেওয়া তাঁদের হুমকির স্ক্রিনশট রয়েছে।’

দেশের জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বলে মনে করছেন শরীফ। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে আপস করলে আজকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক হতাম। তা করিনি বলে বড় ভাইয়ের দোকানে কাজ করতে হচ্ছে সংসার চালানোর জন্য।’

শরীফ ২০১১ সালে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন পাস করেন। ২০১৪ সালে তিনি দুদকে যোগদান করেন। এত পড়াশোনা করে কেন দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন প্রশ্নের জবাবে শরীফ বলেন, ‘চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করলেও দুদক চাকরিচ্যুত করায় ভয়ে কেউ নিচ্ছেন না। আর নিজেও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর ছেলেমেয়েরা সকালে জিজ্ঞেস করত অফিসে যাব কি না। তাদের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারতাম না।’

শরীফের বড় ভাই ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাই অনেক চেষ্টা করেও বিভিন্ন জায়গায় চাকরি পাচ্ছেন না। তাই গত দেড় মাস ধরে তাঁর দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন। বিনিময়ে সংসার চালানোর জন্য সামান্য কিছু টাকা দেওয়া হয়।

শরীফ বলেন, ‘সঞ্চয় যা ছিল সব এত দিনে শেষ হয়ে গেছে। কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন সহযোগিতা করায় এখনো বেঁচে আছি।’ তিনি বলেন, ঘরে অসুস্থ বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, সন্তান রয়েছে। তাই বড় ভাইয়ের দোকানে চাকরি নিয়েছেন তিনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কাজ করে শরীফ আজ চাকরিচ্যুত। পুরস্কার পাওয়ার জায়গায় তিরস্কৃত হয়েছেন। এতে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হচ্ছেন। যার কারণে দুর্নীতি না কমে বাড়তে থাকবে।