সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল, গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে ওঠে

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়াছবি: তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম ও খুনের ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ ইকবাল করিম এই জবানবন্দি দেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল–১–এর অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো.মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি অসমাপ্ত রয়েছে। আগামীকাল সোমবার তাঁর আবার জবানবন্দি দেওয়ার কথা। ইকবাল করিম ভূঁইয়ার দেওয়া প্রথম দিনের জবানবন্দির পূর্ণ বিবরণ এখানে দেওয়া হলো—

‘আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক সেনাপ্রধান। আমি ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলাম। আমি সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গুম ও খুনের সংস্কৃতি কীভাবে বেড়ে উঠেছে, সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। পাশাপাশি আমি সেনাপ্রধান থাকাকালে র‍্যাব সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে এসেছি।’

সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল। গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে উঠেছে। আমরা যদি ধরে নিই যে ২০০৮ সাল থেকে খুন শুরু হয়েছে, তবে সেটা ভুল বলা হবে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সে সময় কথিত অপরাধীদের ধরে সেনা ক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবে তার সংখ্যা ছিল সীমিত। পরে তদন্ত আদালতের মাধ্যমে এবং আইন প্রয়োগ করে সেগুলোকে নিয়মিত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অপারেশন চলাকালে বেশ কিছু মৃত্যু হয়েছে। যেগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে, সেগুলোকে ধর্তব্যে নিয়ে দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

সামরিক বাহিনীর প্রধান কাজ হচ্ছে বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সামরিক বাহিনীকে তাদের সাহায্যে সময়–সময় মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া দুর্যোগকালেও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। এমনকি নির্বাচনকালেও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। সবার ধারণা সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, তাই এটি একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সেনাবাহিনীকে যখনই বাইরে মোতায়েন করা হয়, অধিনায়কদের মনে একটি সার্বক্ষণিক চাপ থাকে তাদের কত তাড়াতাড়ি সেনানিবাসে ফেরত আনা হবে। কারণ, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ ‘এক গুলি, এক শত্রু’ নীতির ওপর পরিচালিত হয়ে থাকে। বস্তুত এটি না হলে সেনাবাহিনী কখনো যুদ্ধ করতে পারবে না। এ জন্য প্রশিক্ষণকালে সেনাসদস্যদের ডিহিউম্যানাইজ করা হয়। তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ মনে করা ভুলে যায়, মানুষকে টার্গেট বলতে শুরু করে। ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের ওপর গুলি করে তাদের মানুষ হত্যার মনস্তাত্বিক বাধা দূর করা হয়। এ কথা মনে রেখে সেনাবাহিনীকে কখনো বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে, যখন র‍্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনাসদস্যদের যে প্রশিক্ষণ তা র‍্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে। র‍্যাব গঠনের পূর্বে অপারেশন ক্লিনহার্টে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেনাসূত্র অনুযায়ী ১২ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এই সংখ্যাটি ছিল ৬০ জন। পরে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। বস্তুত এই ইনডেমনিটি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান।

২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর জন্য যে সংঘাত শুরু হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে স্টেট অব ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই হয়ে ওঠে দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক। বিভিন্ন সময়ে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে তাদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করত। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ছিলেন। তাঁরা বিএনপির জনাব তারেক রহমানকেও উঠিয়ে এনে নির্যাতন করে। এ সময় থেকে বস্তুত বেসামরিক ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে আটক রাখার সেলের মধ্যে রাখা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। বস্তুত যেকোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে এনে যা ইচ্ছা তাই করা যায় মর্মে তারা ভাবতে শুরু করে। তারা ভাবতে শুরু করে যা কিছুই তারা করুক না কেন শেষ পর্যন্ত তারা পার পেয়ে যাবে। জরুরি অবস্থায় সেনাসদস্যদের সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। তারা রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের মধ্যে আধিপত্যবোধের জন্ম হয়, সিনিয়র ও জুনিয়রের মধ্যে একটি বিভাজন সৃষ্টি হয়, নগদ সংস্কৃতির উত্থান হয় এবং উপরস্থদের আদেশ অন্ধভাবে পালন করার প্রবণতা জন্ম হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিডিআর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা এবং ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। পরে বিদ্রোহ দমন করার পর বিডিআর সদস্যদের অন্তরিণ করা হয় এবং সেখানে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদকালে পিলখানায় (বিডিআর সদর দপ্তর) র‍্যাব ও সামরিক সদস্য দ্বারা নির্যাতনের কারণে আনুমানিক ৫০ জন বিডিআর সদস্য মৃত্যুবরণ করেন বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়। পরে দায়রা আদালত কর্তৃক ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ অনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনা অফিসারদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্রতর হয়, সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক রূপ ধারণ করে, পেশাদার অফিসারদের এক পাশে সরিয়ে অনুগত অফিসারদের ওপরে নিয়ে আসা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করে বাহিনীটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়। এর বড় কারণ হলো শেখ হাসিনা ভাবতেন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।

পরে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের শাসন আমলের দুর্বল দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ ও প্রশাসনের ওপর তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন। এ জন্য তিনি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনেক রাজনৈতিক নেতার বিচার করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেন এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেন।

এ সময় তিনি তাঁর আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁর মাধ্যমে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সচেষ্ট হন। মেজর জেনারেল সিদ্দীকি অচিরেই প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনী প্রধানদের মধ্যে সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব, এনটিএমসি, আনসার, বিজিবি ইত্যাদি সংস্থাগুলোকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে চারটি চক্রের উদ্ভব ঘটে। প্রথম চক্রটি হচ্ছে অপরাধ চক্র, যেটি ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব ও এনটিএমসিকে নিয়ে তিনি পরিচালনা করতেন। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন, হত্যা ও গুমের মতো ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে। দ্বিতীয় চক্রটি ছিল ডিপ স্টেট। এটি তিনি পরিচালনা করতেন এমএসপিএম (প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব), ডিজিএফআই, এনএসআই ইত্যাদির মাধ্যমে। এর মাধ্যমে তিনি তিন বাহিনী সম্পর্কে সব নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতেন। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বাহিনী প্রধানদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তৃতীয় চক্রটি ছিল কেনাকাটা চক্র। এটিতে সংযুক্ত ছিল পিএসও, এএফডি, ডিজিডিপি, বাহিনী প্রধান ইত্যাদি। এই চক্রের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার করতেন। চতুর্থ চক্রটি ছিল সামরিক প্রকৌশলী চক্র। মেজর জেনারেল সিদ্দীকি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের অফিসার হওয়ায় তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে আলাদা চক্র গড়ে তোলেন। এদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে তাঁর প্রভাব বিস্তার করা শুরু করেন। এটি ছিল অবৈধ অর্থের প্রধান উৎস।

এবার র‍্যাবের কথা বলছি। সেনাপ্রধান হওয়ার পূর্ব থেকেই অন্য সামরিক সদস্যদের মতোই র‍্যাব সদস্যদের অবৈধ ও বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলাম। সেনাপ্রধান হওয়ার পরপরই আমি র‍্যাবের এডিজি তৎকালীন কর্নেল (পরবর্তী সময় লে. জেনারেল) মুজিবকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাই এবং এসব ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলি। আমি তাকে র‍্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলি। তিনি আমাকে কথা দেন আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। পরবর্তী কিছুদিন আমি পত্রিকাতে ক্রসফায়ারের ঘটনা দেখিনি। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করতে পারি ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা চাপা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও বদলে যায় যখন বেনজীর আহম্মেদ র‍্যাবের ডিজি হয়ে আসেন এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান ও কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (যিনি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আছেন) জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে বলি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান এসে আমাকে জানান তিনি কথা বলেছেন কিন্তু কোনো ভালো প্রতিশ্রুতি তাঁর কাছ থেকে পাননি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল এসে আমাকে জানান কথা বলে কোনো লাভ হয়নি, ওর মাথা ইট ও পাথরের টুকরা দিয়ে ঠাসা। পরে আমাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল জানায় জিয়াউল আহসান তার বাসায় অস্ত্র রাখে, গার্ড মোতায়েন রাখে ও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে। তাকে সামরিক কোয়ার্টারে থাকার নিয়মকানুন মেনে এগুলো পরিত্যাগ করতে বলা হয়। পরে জিয়াউল আহসান, মেজর জেনারেল সিদ্দীকি ও তার কোর্সমেট এএমএসপিএম কর্নেল মাহবুবের (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ছত্রচ্ছায়ায় আমার আদেশ অমান্য করতে শুরু করে। দুজন অফিসারকে বিভিন্ন নেতিবাচক রিপোর্টের কারণে শান্তি দেওয়ার জন্য র‍্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য পোস্টিং আদেশ জারি করার পরও সে তাদের ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে। আমি জিয়াউল আহসানকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করি। এটি কার্যকরী করার জন্য লজিস্টিক এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে দায়িত্ব দেই। পরে তিনি বিষয়টি মেজর জেনারেল তারেক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে না জানানোর জন্য তার বিরাগভাজন হন। অচিরেই আমি এমএসপিএম মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিনের কাছ থেকে ফোন পাই। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জিয়াউল আহসানের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তা তুলে নেওয়ার জন্য। আমি না বলেছি। আমাকে তখন মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিন জিজ্ঞাসা করেন কোনো চাকরিরত অফিসারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা কি বিশেষ পদক্ষেপ? আমি বলি হ্যাঁ, এটি বিশেষ পদক্ষেপ এবং তুমি যদি সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করো, তাহলে তোমারও একই অবস্থা হবে। দুদিন পর সংঘাত এড়ানোর জন্য আমি নিজে থেকেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেই।

আমাকে যে জিনিসটা সবচেয়ে ব্যথিত করত তা হলো আমরা সেনাবাহিনী থেকে র‍্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দেই র‍্যাব, ডিজিএফআই এবং বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার পূর্বে ও পরে আমার ইন্টারভিউতে আসবে। যারা র‍্যাবে যেত তাদের আমি এই বলে মোটিভেট করতাম যে নরহত্যা মহাপাপ এবং কাউকে হত্যা করলে তার পরিবারের অভিশাপ তোমার পরিবারের ওপর পড়বে। একজনকে হাত–পা বেঁধে হত্যা করা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ। সত্যিকারের সাহস হচ্ছে হাত–পা খুলে তার হাতে একটি অস্ত্র দিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। যারা ফেরত আসত, তাদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আমি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনীর র‍্যাব সদস্যদের সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য আবেদন জানাই। তিনি স্বীকার করলেন র‍্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ। তিনি কোনো কথা দেননি এবং পরে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।

পরে আমি ইন্টারভিউতে আসা অফিসারদের এই বলে সাহস জোগালাম যদি কাউকে কোনো কিলিং মিশনের জন্য বলা হয়, সে যেন আমাকে সরাসরি ফোন করে। আমি তাদের সেনাবাহিনীতে সম্মানের সঙ্গে ফেরত নিয়ে আসব এবং পুনর্বাসিত করব। আমার পাশাপাশি যারা র‍্যাবে নতুন যাচ্ছেন, তাঁদের মিলিটারি সেক্রেটারি মেজর জেনারেল আনোয়ার, ডিএমআই এবং আমার পিএস কর্নেল সাজ্জাদও (বর্তমানে মেজর জেনারেল) মোটিভেট করতে থাকেন। কিছুদিন পর ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জগলুল আমাকে এসে জানান, আমাদের মোটিভেশনে কোনো কাজ হচ্ছে না। র‍্যাবে যোগদানের পরে অফিসারদের ডিমোটিভেট করা হচ্ছে। তবুও দুজন অফিসারকে যখন প্রথম রাত্রেই কিলিং মিশনে যেতে বলা হয়, তাঁরা ওখান থেকে চলে এসে ঢাকা সেনানিবাসের এমপি চেকপোস্টে রিপোর্ট করেন। আমি তাঁদের সসম্মানে সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত করি।

এর মধ্যে ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জগলুল কর্নেল জিয়াউল আহসানের বিরাগভাজন হন। তাঁকে মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দীকি ডিএমআই পদ থেকে সরিয়ে দেন। সাধারণত ডিএমআই সেনাপ্রধানের পছন্দের ব্যক্তি হয়ে থাকেন এবং তাঁকে সেনাপ্রধানই নিয়োগ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বদলি করে দেওয়া হয়, যা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার ফজলকেও বদলি করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আমার প্রবল বিরোধিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়।