আদানির সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে কী চিন্তা, জানালেন মন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু)ফাইল ছবি

ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তির বিষয়ে সরকারের কী চিন্তা, তা জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক মূল্যে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয়। এই চুক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের দ্বারস্থ হওয়া অথবা আদানির সঙ্গে আলোচনাক্রমে চুক্তি সংশোধন করার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (চট্টগ্রাম-১৫) শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নে বিদ্যুৎমন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে গতকাল বেলা সাড়ে তিনটায় সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ভারতের আদানি পাওয়ার (ঝাড়খন্ড) লিমিটেডের সঙ্গে ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি একটি জাতীয় কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হয়েছে। চুক্তিটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক মূল্যে স্বাক্ষর করেছে বলে জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্পূরক প্রশ্নে এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। কিন্তু ইতিমধ্যে অনেক পেট্রলপাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি, সবাই প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, মন্ত্রীরা বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন। জ্বালানিমন্ত্রী এই সমস্যা স্বীকার করার পরিবর্তে (আগের সরকারগুলোর) আগের মতো সমস্যা এড়িয়ে যাচ্ছেন। কবে নাগাদ সমস্যাগুলোর যথাযথভাবে সমাধান হবে এবং মন্ত্রী সমস্যা স্বীকার করবেন কি না?

জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, প্রতিটি পাম্পে যে পরিমাণ তেল প্রতিদিন দেওয়ার কথা, সেই পরিমাণ তেল পাম্পগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু ইরানের ঘটনার পর থেকে হঠাৎ করে বিক্রি বেড়ে গেছে। বিক্রি বেড়ে যাওয়ার ফলে পেট্রলপাম্পে আগে যে পরিমাণ তেল দেওয়া হতো, তা বিক্রি করতে এক দিন–দেড় দিন লাগত, এখন দুই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। মানুষ ‘প্যানিক বায়িং’ শুরু করছে। লাইন দেখা যায়, কিন্তু পেট্রল সাপ্লাই (সরবরাহ) হয় না, এটা ঠিক নয়। পেট্রল প্রতিদিন সাপ্লাই করা হয়।

এরপর স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর প্রশ্নে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী সম্পর্কে বলতে গিয়ে ‌‘মন্ত্রীরা’ উল্লেখ করেন। এতে মন্ত্রী হিসেবে তাঁর অধিকার ক্ষুণ্ন (মন্ত্রিসভার একজন সদস্য হিসেবে) হয়েছে উল্লেখ করে এ–সংক্রান্ত বক্তব্য এক্সপাঞ্জ (বাদ দেওয়া) করার দাবি জানান তিনি।

জবাবে স্পিকার রুলিং দিয়ে বলেন, সংসদ সদস্যের বক্তব্যে ‌‘মন্ত্রী’ বললে ঠিক আছে, তবে ‘মন্ত্রীরা’ বলে থাকলে ‘রা’ এক্সপাঞ্জ হবে।

বিদ্যুতের ঘাটতি নেই

ঢাকা-১৮ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। তবে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ঝড়বৃষ্টির কারণে মাঝেমধ্যে কিছুটা বিদ্যুৎ–বিভ্রাট ঘটে এবং চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।

কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মদের আরেক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট (শিল্পে উৎপাদিত নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ, যা ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত)।

ফেনী-২ আসনের জয়নাল আবদিনের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ৬টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির অধীন ১ হাজার ৮৩৪টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া ১৩৯টি নতুন উপকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন গড়ে ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।

ঢাকা-৫ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, আমদানি করা এলএনজিসহ সার্বিক চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাসের ঘাটতি হচ্ছে। ফলে সব এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের বিতরণ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে বর্তমানে ও ভবিষ্যতে আবাসিক গ্যাস–সংযোগের কোনো পরিকল্পনা নেই।

নোয়াখালী-১ আসনের সরকারদলীয় সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী জানান, আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি শ্রেণিতে নতুন গ্যাস–সংযোগ প্রদান স্থগিত রয়েছে। তবে শিল্প ও ক্যাপটিভ (শিল্পে উৎপাদিত নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র) শ্রেণিতে শর্তাধীনে নতুন সংযোগ চালু রয়েছে।

জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, দেশে গ্যাস–সংকট নিরসনে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী এক বছরে ১১টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের (সংস্কার) কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার মহাপরিকল্পনার আওতায় সব কূপ খননকাজের সফল সমাপ্তিতে আনুমানিক ১ হাজার ৫৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হবে।

৩১টি সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোকসানে

ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীরের অপর এক প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের ৫টি, চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের ১৪টি এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১২টি প্রতিষ্ঠান লোকসানি হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।

মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩১টি সরকারি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোকসানে রয়েছে।

দিনাজপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামান মিয়ার এক প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে ১৫টি চিনিকল রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টির মাড়াই স্থগিত রয়েছে।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল নীতিমালা সংশোধনের কাজ চলমান

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এক প্রশ্নের জবাবে জানান, অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জন্য বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, অনলাইন পোর্টাল সংবাদ পরিবেশনের জন্য বর্তমানে অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা রয়েছে। ওই নীতিমালার আলোকে অনলাইন নিউজ পোর্টালের নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান নীতিমালা আরও যুগোপযোগী করতে সংশোধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।