ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ৫৩ ধারায় জরিমানার রায় দেওয়া হয়। ‘অবহেলা, ইত্যাদি দ্বারা সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য, জীবনহানি, ইত্যাদি ঘটানো’ শিরোনামের ৫৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সেবা প্রদানকারী কর্তৃক অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতা দ্বারা সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি ঘটলে অনূর্ধ্ব ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।

রায়ের পর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে মহিউদ্দিন বলেন, তাঁর দাবিগুলো এখন জনগণের। সাধারণ লোকজন আশ্বস্ত হতে পারবেন যে ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করলে বিচার পাবেন। তিনি হয়রানির শিকার অন্য যাত্রীদেরও অভিযোগ করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, তাঁর কাছে যে তথ্য আছে তা নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবেন। রেলের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে জানান। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস পেলেই তিনি আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াবেন।

এদিকে রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবেন বলে জানিয়েছেন সহজ ডটকমের আইনজীবী মির্জা রাজীব হাসনাত।

সহজ ডটকমের অবহেলা ছিল: ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর

জাতীয় ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে নেতৃত্ব দেন অধিদপ্তরের পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। আরও উপস্থিত ছিলেন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান, আবদুল জব্বার মণ্ডল ও ফাহমিনা আক্তার। শুনানিতে অভিযোগকারী হিসেবে মহিউদ্দিন এবং অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সহজ ডটকম ও বিকাশ–এর প্রতিনিধিদের ডাকা হয়। রেল কর্তৃপক্ষের কাউকে ডাকা হয়নি। দেড় ঘণ্টা শুনানির পর সম্মেলনকক্ষে রায়ের বিষয়ে সাংবাদিকদের জানানো হয়। শুনানি উপলক্ষে অধিদপ্তরে সকাল ১০টা থেকে গণমাধ্যমকর্মীরা ভিড় করতে শুরু করেন।

বেলা দেড়টার দিকে সংবাদ সম্মেলেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, রেলের অব্যবস্থাপনার নানা অভিযোগ করে মো. মহিউদ্দিনের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এ আন্দোলন জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। তিনি যে ছয় দফা দাবি করেছেন, তার তিনটি ভোক্তা অধিকারবিষয়ক। সেগুলো অধিদপ্তর দেখেছে। বাকিগুলো রেলের উন্নয়ন দাবির বিষয়ে, যেটিতে অধিদপ্তরের কিছু করার নেই। সহজ ডটকম অনলাইনে ৫০ শতাংশ এবং অফলাইনে রেলের কাউন্টারে ৫০ শতাংশ টিকিট বিক্রি করেছে। মহিউদ্দিনের অভিযোগ, অনলাইনে চারটি টিকিট কেটে টাকা পরিশোধ করলেও টিকিট পাননি এবং পরে কাউন্টারে গিয়ে দেখেন, তাঁর টিকিটগুলোর একটি অপর একজনের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। যদিও তাঁর টিকিটটিই অফলাইনে বিক্রি হয়েছে কি না, সে প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে পুরো বিষয়টিতে সহজ ডটকমের অবহেলা প্রমাণিত হয়েছে। তাদের সিস্টেমের ত্রুটিজনিত কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। আগেও প্রতিষ্ঠানটির টিকিট বিক্রি নিয়ে একটি অভিযোগ এসেছিল অধিদপ্তরে।

মহাপরিচালক জানান, টিকিট কালোবাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। ভোক্তাকে জিম্মি করে বাইরে অতিরিক্ত দামে টিকিট বিক্রির বিষয়গুলো বন্ধ হতে হবে। সহজ ডটকমের সিস্টেমের ত্রুটি এবং তার টিকিট বিক্রির বিষয়টি পর্যালোচনা করবে অধিদপ্তর। কোন প্রক্রিয়ায় তারা টিকিট বিক্রি করে, সে বিষয়ে অধিদপ্তরের কাছে সহজ ডটকমকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

বিকাশ প্রসঙ্গে মহাপরিচালক বলেন, মহিউদ্দিনের অভিযোগ ছিল, পিনকোড ছাড়াই তাঁর টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। তবে বিকাশের প্রতিনিধিরা তথ্য উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন পিনকোড দেওয়া হয়েছিল। তাই অভিযোগটি প্রমাণিত হয়নি। রায়ের কপি রোববার দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

আন্দোলনের আগে টিকিট বিক্রি নিয়ে অধিদপ্তরে মহিউদ্দিন অভিযোগ করলেও তা এক মাসের বেশি সময় পর কেন আমলে নেওয়া হলো—জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, অনেক আবেদন জমা থাকে, তাই দেরি হয়েছে। আর অভিযোগের আবেদনটি গত রোববার তিনি প্রথম জানতে পেরেছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক সফিকুজ্জামান বলেন, ই–কর্মাস খাতে যত অভিযোগ আসছে, তাতে আলাদা ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চালু করতে হবে।

এদিকে শুনানির সময় মুঠোফোন দিয়ে রেকর্ড করার অভিযোগে সহজ ডটকমের জনসংযোগ ব্যবস্থাপক ফারহাত আহমেদের মুঠোফোন জব্দ করেছে অধিদপ্তর।

অভিযোগ অস্বীকার করেছে সহজ ডটকম

অভিযোগ অস্বীকার করে সহজ ডটকমের আইনজীবীসহ একাধিক প্রতিনিধি সাংবাদিকদের বলেন, অনলাইনে টিকিট কেনার প্রক্রিয়া শুরু করার ১৫ মিনিটের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে হয়। মো. মহিউদ্দিন ১৩ জুন সকাল ৮টা ৩৬ মিনিটে ঢাকা থেকে রাজশাহীর চারটি টিকিট কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেন। ওই সময় তাঁর মুঠোফোনে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তিনি সকাল ৯টা ২৭ মিনিটে বিকাশ থেকে তিন হাজার টাকা জমা করেন মুঠোফোনে এবং ৯টা ৩৭ মিনিটে টিকিটের ২ হাজার ৬৮০ টাকা পরিশোধ করেন। সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তিনি টিকিট পাননি। টিকিট না কাটা হলে ৮ কার্যদিবসের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়া হয়। সেখানে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ১৬ জুন বিকাশ টাকা ফেরত পাঠায়। ১৩ জুন অনলাইনে আরও ৩৫টি টিকিট ছিল। কিন্তু বিকাশে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় মো. মহিউদ্দিন টিকিট কাটেননি বলে জানান। এ ছাড়া মহিউদ্দিন কাউন্টারে গিয়ে তাঁর বুকিং দেওয়া একটি টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ার যে কথা বলছেন, তার প্রমাণ দেখাতে পারেননি। সহজ ডটকমের এ ব্যাপারে কোনো অবহেলা নেই বলে তাঁরা দাবি করেন।

রায়ে সন্তষ্ট: মহিউদ্দিন

মো. মহিউদ্দিন হাওলাদার জানান, তিনি রায়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট। এটা তাঁর কয়েকটি দাবির একটি। অন্য দাবিগুলো আদায়ে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। হাতে অভিযোগসহ কিছু তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এ কাগজগুলো মিসাইল। আমি আপার (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) কাছে, নেত্রীর কাছে এই কাগজগুলো নিয়ে যাব। বলব এই মিসাইলগুলো মারুন।’ তিনি বলেন, ‘রেলের সমস্যার যত দিন সমাধান না হবে, তত দিন বাড়ি ফিরে যাব না। এখান থেকে কমলাপুর যাব। তারা (রেল কর্তৃপক্ষ) ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। যত ভয় দেখাচ্ছে, তত আমি শক্ত হচ্ছি। রেলে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। শুনেছি, রেলমন্ত্রীকেও তারা হেনস্তা করে। ১৪ দিনের আন্দোলনে এক দিনও রেলমন্ত্রী আসেননি। তাঁর কাছে আর আশা করি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা করি। তিনি রেলের অব্যবস্থাপনা নিরসনে আশ্বাস দিলে আন্দোলন থেকে সরে যাব।’

মহিউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন