‘সত্যে তথ্যে ২৪’ আহ্বানে ‘পাঠক উৎসব’ শুরু হয় গতকাল সকাল সাড়ে আটটায়। শুরুতে ছিল শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। বিকেলে প্রথম আলোর সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা মুখোমুখি হন পাঠকদের। এর মধ্যে দিনভর ছিল নানা আয়োজন।

পাঠক উৎসবে একটি মূলমঞ্চ যেমন ছিল, তেমনি নকশার মঞ্চেও চলে ভিন্নধর্মী আয়োজন। ছিল প্রথম আলোর বিভিন্ন বিভাগ ও কার্যক্রমভিত্তিক আলাদা স্টল। গান, নৃত্য, ফ্ল্যাশমব, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, শিশুদের খেলার আয়োজন, প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে উৎসব হয়ে ওঠে আনন্দমেলা।

প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এ উৎসব আয়োজনের লক্ষ্য ছিল পাঠক, লেখক, শুভানুধ্যায়ী, হকার—সব মিলিয়ে সব শ্রেণি–পেশার মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি। করোনাকালে এ ধরনের উন্মুক্ত অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এখন করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে, নতুন স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হয়েছে মানুষ। এমন সময়ে প্রথম আলো আয়োজিত অনুষ্ঠানে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে যোগ দেন ২০ হাজারের বেশি মানুষ।

রাজধানীর পাশাপাশি গতকাল দেশের অন্যান্য জেলায়ও প্রথম আলোর ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করা হয়। এ উপলক্ষে আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, মিষ্টি বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা, নীলফামারী, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, সিলেট, মৌলভীবাজার, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও রাজবাড়ীতে বন্ধুসভার সদস্যরা এসব কর্মসূচির আয়োজন করেন।

শিশুদের রং-তুলিতে বর্ণিল উৎসব

চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে সকাল সকাল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এসে হাজির হয় হাজারখানেক শিশু, সঙ্গে তাদের অভিভাবকেরা। বাংলা একাডেমির প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনের প্রবেশমুখ পর্যন্ত দীর্ঘ পথে সারি বেঁধে ক্যানভাসে মন ডুবিয়ে আঁকছিল তিন বছর বয়সী শিশু থেকে দশম শ্রেণিপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা।

রাজধানীর আফতাবনগরের জয়নুল আবেদিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নার্সারি শ্রেণির শিক্ষার্থী অরুণিমা আহির এসেছিল বাবার সঙ্গে। মনোযোগ দিয়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছিল প্রকৃতি। অরুণিমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা এ এস এম মামুন বলেন, এমন আয়োজন শিশুদের মনে দাগ কাটে। সব বয়সের পাঠকের কথা চিন্তা করে এমন আয়োজনের জন্য প্রথম আলোকে ধন্যবাদ।

ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে ছিলেন বরেণ্য শিল্পী রফিকুন নবী, সৈয়দ আবুল বার্‌ক্ আলভী, আবদুল মান্নান, অশোক কর্মকার ও আতিয়া ইসলাম। তাঁরা জানান, এত ছবি থেকে মাত্র ছয়টি ছবি বাছাই করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে তাঁদের। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অভিভাবকদের উদ্দেশে শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, ‘শিশুদের হাতে রং-তুলি তুলে দিয়েছেন আপনারা, এটা একটা বড় ব্যাপার। যাদের হাতে রং-তুলি থাকবে, তারা প্রকৃতি চিনতে শিখবে, রং চিনতে শিখবে। পাশাপাশি নিজেদের ভুলগুলো ধরতে শিখবে।’

তরুণেরা আস্থা পান প্রথম আলোতে

পাঠক উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা দেশের ছয় তরুণকে নিয়ে মঞ্চে ওঠেন। এই তরুণেরা বলেন, তাঁরা আস্থা পান প্রথম আলোয়। পত্রিকাটি তাঁদের পাশে থাকে, সংগ্রাম-সাফল্যের কথা তুলে ধরে।

আর্ক এশিয়া পুরস্কারজয়ী তরুণ স্থপতি তাওরেম সানানু বলেন, ‘আমরা যে যাঁর জায়গা থেকে নিজের বাধা যেন অতিক্রম করতে পারি।’ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ওয়ালটনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) গোলাম মুর্শেদ বলেন, প্রথম আলো তাঁর কাছে ভালোবাসার জায়গা।

৪০তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, প্রথম আলো তরুণদের পাশে থাকে, তরুণদের সংগ্রাম তুলে ধরে।

প্রথম আলোর একসময়ের কার্টুন বেসিক আলীর প্রতি ভালোবাসার কথা জানান বিতার্কিক সৌরদ্বীপ পাল। অভিনেত্রী নাজিফা তুষি বলেন, তিনি একসময় প্রথম আলোর নকশার সব কপি সংগ্রহ করতেন।

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, সবাই যখন জ্বলে উঠবে, তখন দেশ আলোকিত হবে। প্রথম আলো সবার মনে সেই আগুনের পরশমণি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছে। ২৪ বছর ধরে প্রথম আলো চেষ্টা করেছে পাঠককে বস্তুনিষ্ঠ খবর দিতে।

‘সত্যের পক্ষে থাকব’

সকালে উদ্বোধনের পর ছিল প্রথম আলোর লেখকদের সঙ্গে পাঠকদের মুখোমুখি প্রশ্নোত্তরপর্ব। পাঠকেরা প্রিয় লেখকদের সামনে পেয়ে তাঁদের লেখা, লেখকের স্বাধীনতা, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইন ইত্যাদি নিয়ে নানা প্রশ্ন করেছেন।

পাঠকদের কৌতূহলী প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, লেখক মহিউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, সাংবাদিক কামাল আহমেদ ও কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম। এ পর্ব সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও কিশোর আলো সম্পাদক আনিসুল হক।

লেখকেরা বলেছেন, ভয়ভীতি, বাধাবিঘ্ন যা-ই আসুক, তাঁরা সত্যের পক্ষে থাকবেন। প্রতিবাদ করবেন মিথ্যা ও অন্যায়ের। এর জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

বিকেলে পাঠকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানসহ পত্রিকার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা। সম্পাদক বলেন, সত্য প্রকাশ করাই প্রথম আলোর উদ্দেশ্য।

স্টলে স্টলে বিনোদন বাক্স

পাঠক উৎসবে গোল্লাছুট, ছুটির দিনে, প্র অধুনা, প্র স্বপ্ন নিয়ে, নকশা, কিশোর আলো, বিজ্ঞানচিন্তা, প্রতিচিন্তা, সমন্বিত বার্তাকক্ষ, প্রথম আলো ট্রাস্ট, প্রথম আলোর চাকরিবাকরি, চরকি, প্রথম আলো ডিজিটাল, বন্ধুসভা ও তথ্যকেন্দ্রের আলাদা স্টল ছিল। স্টলগুলোতে ছিল পাঠকের সরব উপস্থিতি।

কিশোর আলো স্টলে ছিল কুইজ ও গেম; বিজ্ঞানচিন্তার স্টলে বিজ্ঞানের পরীক্ষা, দাবা, কুইজ ও গেম; অধুনার স্টলে মনোবিদ, পুষ্টিবিদ, আইনজীবী ও শিশু বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন; শিশুদের জন্য গোল্লাছুট কর্নার, নকশার স্টলে মেহেদি ও চোখের সাজ, রান্নাবিদেরা দিয়েছেন রান্নাবিষয়ক টিপস, পাঠকদের নিয়ে বিশেষ ফ্যাশন শো, হালফ্যাশন স্টলে নেইল আর্ট, স্কিন টেস্টিং ও ফ্যাশন শো; ছুটির দিন স্টলে পাঠক কুইজ, স্বপ্ন নিয়েতে ফিচারের নানা আয়োজন এবং বন্ধুসভার স্টলে নতুন বন্ধুদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা ছিল।

ডিজিটাল স্টলের গেমসে ছিল নিশ্চিত পুরস্কার। চলতি ঘটনার স্টলে বিসিএস, ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ। প্রথম আলোর চাকরি–বাকরি তথ্যকেন্দ্রে বিভিন্ন তথ্য পেয়েছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। প্রথম আলো ট্রাস্টের স্টলে ছিল মানসিক স্বাস্থ্য ও মাদকমুক্ত থাকার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক খেলা, কুইজ ও পুরস্কার। উৎসবে ছিল বইমেলা, ‘ফুড জোনে’ খাবারের ব্যবস্থা।

গান-ফ্ল্যাশমবে হইহুল্লোড়

উৎসবের বিভিন্ন পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন তরুণ ও জনপ্রিয় শিল্পীরা। নৃত্যদল তুরঙ্গমী করে বিশেষ পরিবেশনা।

বিকেলে ঢাকঢোল নিয়ে উৎসবে হাজির হন ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির সদস্যরা। নেচে-গেয়ে উৎসবস্থল মাতিয়ে তোলেন হকাররা। উৎসবে চরকির আয়োজনে ছিল চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। টান ও দুই দিনের দুনিয়া দুটি চরকি ফিল্ম দেখানো হয় প্রদর্শনীতে। বন্ধুসভার বন্ধুরা জনপ্রিয় বিভিন্ন গানের সঙ্গে পরিবেশন করেন ফ্ল্যাশমব। বিকেলে সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হয়।

পাঠক কুইজ বিজয়ীরা

প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাঠকদের জন্য আয়োজন করা হয় অনলাইন পাঠক কুইজের। প্রথম পর্বের কুইজ অনুষ্ঠিত হয় ২৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রথম পর্বের বিজয়ীদের থেকে সেরা ছয়জনকে নিয়ে গতকাল পাঠক উৎসবে সরাসরি চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। কুইজ পরিচালনা করেন প্রথম আলোর ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন ও যুব কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়কারী মুনির হাসান।

চূড়ান্ত পর্বে প্রথম হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক নুরুল আমিনকে এক লাখ, দ্বিতীয় হওয়া শাহিন আলমকে ৬০ হাজার এবং তৃতীয় হওয়া মুহাম্মদ আকবর হোসাইনকে ৪০ হাজার টাকার গিফট চেক দেওয়া হয়। দুই পর্বের বিজয়ীদের দেওয়া হয় মোট পাঁচ লাখ টাকা।

ছবি আঁকায় বিজয়ী যারা

ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার ক গ্রুপে ছিল তিন বছর বয়স থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। এ গ্রুপে প্রথম হয়েছে মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সুহাইল হোসেন, দ্বিতীয় হয়েছে স্কলাসটিকার কেজি টুর শিক্ষার্থী অর্ঘ্য চক্রবর্তী এবং তৃতীয় হয়েছে মতিঝিল কলোনি স্কুলের প্লে গ্রুপের শিক্ষার্থী জাসিয়া বিনতে জসীম।

খ গ্রুপে (পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি) প্রথম হয়েছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্নিলা ভৌমিক, দ্বিতীয় হয়েছে আকিজ ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আনিশা সান্তনি এবং তৃতীয় হয়েছে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মায়মুনা চৌধুরী।

ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিশুদের সবাই পেয়েছে অভিনন্দনপত্র। ক ও খ গ্রুপে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানজয়ী ছয় প্রতিযোগী পেয়েছে যথাক্রমে ১০ হাজার, ৬ হাজার ও ৫ হাজার টাকার বই, সনদ ও আঁকার সরঞ্জাম। শিশুদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন বিচারক শিল্পীরা।

পাঠকেরা যা বললেন

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক ছাইফুল ইসলাম স্ত্রী ও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ুয়া দুই মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন উৎসবে। ছাইফুল ইসলাম বলেন, প্রথম আলো না পড়লে মনে হয় কিছুই পড়া হয়নি। মেয়েরা নিয়মিত কিশোর আলো পড়ে। পাঠকদের নিয়ে এমন আয়োজনই বলে দেয় প্রথম আলো কেন ব্যতিক্রম।

উৎসবে আসা পাঠকদের মধ্যে তরুণদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ঢাকা কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী দুই বন্ধু সৌমিত্র কুমার ও অর্পণ রায় ঘুরছিলেন নিজেদের মতো। তাঁরা বলেন, ‘প্রথম আলোর আয়োজনে পাঠক উপস্থিতি অনেক। ছোটকাল থেকে প্রথম আলোর পড়ার অভ্যাস, তাই আগ্রহ নিয়ে এসেছি।’

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা ওয়াহিদা জামান বলেন, কোনো কিছুর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পাঠক হিসেবে যে কয়টি সংবাদমাধ্যমের ওপর তিনি নির্ভরশীল, প্রথম আলো তাদের মধ্যে অন্যতম। এভাবেই প্রথম আলো সত্য তথ্য দিয়ে পাঠকের চাহিদা মেটাতে থাকুক।