ক্রেতা কম, বেচাকেনায় ভাটা
আশীষ–উর–রহমান, ঢাকা
ব্যাগ ভরা বই নিয়ে ধীর কদমে হাঁটছিলেন মুহাম্মদ জহুরুল ইসলাম। এবার ক্রেতাবিরল অমর একুশের বইমেলায় এমন গ্রন্থানুরাগীর সংখ্যা আরও বিরল। গতকাল বুধবার ইফতারের পরে তাঁর সঙ্গে কথা হলো মেলার মাঠে। তিনি ইসলামিক স্টাডিজে অধ্যাপনা করেছেন পটুয়াখালী কলেজে। অবসরে গেছেন গত বছর। বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে গবেষণা করেই তাঁর সময় কাটছে এখন। বগুড়ার বিখ্যাত প্রত্নস্থান মহাস্থান গড়ের উত্তর পাশে তাঁর বাড়ি।
জহুরুল ইসলাম জানান, অবসর–পরবর্তী প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা, চাকরিবিষয়ক কিছু কাজ রয়েছে তাঁর বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোতে (ব্যানবেইস)। সেসব কাজ করা এবং মেলা থেকে বই কেনা—এই দ্বিবিধ উদ্দেশ্যেই তাঁর ঢাকায় আসা। পুরোনো ও নতুন নিয়মের বাইবেল, ব্রহ্মধর্ম তাৎপর্য, তথাগত গৌতমের জীবন ও বৌদ্ধধর্মবিষয়ক বেশ কয়েকটি বই তিনি কিনেছেন। দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় হয়তো তাঁকে আরও কয়েক দিন থাকতে হবে। মেলায় আসবেন প্রতিদিন বলে জানালেন প্রবীণ এই পাঠক। মহাসত্যের বাণী নামে ধর্মবিষয়ক একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। তিনি জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি নিয়মিত বইমেলায় আসেন। এবারের মেলার লোকসমাগমহীন বিষণ্ণ পরিবেশ তাঁর পছন্দ হয়নি। বললেন, এ সময় মেলা দেওয়া ঠিক হয়নি।
এবার শুরু থেকেই বইমেলার যে নিরিবিলি পরিবেশ, তাতে একুশের বইমেলার চিরচেনা রূপটি পাওয়া যাচ্ছে না। অনুপম প্রকাশনীর প্রকাশক মিলন নাথ বলেন, মেলায় এখন পর্যন্ত যেমন বেচাকেনা, তাতে কোনোভাবেই ভালো বলা যায় না। তাঁর ৪০টি বই প্রকাশের প্রস্তুতি ছিল। এরই মধ্যে ২৫টির মতো বই বেরিয়ে গেছে; কিন্তু ক্রেতা নেই।
এবার মেলায় অনুপম প্রকাশনী থেকে এসেছে মৃত্যুঞ্জয় রায়ের সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য: উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব।
প্রথমার স্টলে
গতকাল মেলায় বেচাকেনায় বড় রকমের কোনো পরিবর্তন হয়নি। গত কয়েক দিন যেমন ছিল, তেমনই পরিবেশ—একই রকম বিক্রি। প্রথমার স্টলে কাল আলতাফ পারভেজ অনূদিত গ্রামসি ও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা, মহিউদ্দিন আহমদের জাসদের উত্থান–পতন, জাভেদ হুসেন অনূদিত মির্জা গালিবের গজল ও এবার নতুন আসা মাসউদ আহমাদের উপন্যাস লাবণ্যর মুখ। কাল নতুন এসেছে ইসমাইল আরমানের কিশোর থ্রিলার অয়ন–জিমি সিরিজের নরক নিবাস।
প্রকাশক ঐক্যের দাবি
প্রকাশকদের সংগঠন প্রকাশক ঐক্য গত মঙ্গলবার মেলায় বিভিন্ন অনিয়মের প্রতি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখিত অভিযোগ করেছে। তারা বলেছে, একাডেমি কর্তৃপক্ষ বলেছিল, এবার কোনো প্রকাশককে পাঁচ ইউনিটের বেশি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হবে না। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানকে ছয় ইউনিটের স্টল দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মেলার মাঠে এখনো অবকাঠামোগত ত্রুটি রয়েছে। মশার প্রচণ্ড উপদ্রব, হকারদের অবাধ প্রবেশ এবং মাদক সেবনও চলছে বলে তারা অভিযোগ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ড. সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, প্রকাশক ঐক্যের নামে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারও স্বাক্ষর নেই, কোনো প্যাড নেই, ঠিকানা নেই। শুধু কয়েকটি প্রকাশকের নাম রয়েছে। মশা দমনের জন্য এর আগেই তারা সিটি করপোরেশনকে বলেছেন ব্যবস্থা নিতে। অন্য বিষয়গুলো নিয়ে মেলা পরিচালনা কমিটিতে আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
নতুন বই
গতকাল তথ্যকেন্দ্রে ৮১টি নতুন বইয়ের নাম এসেছে। এর মধ্যে ঐতিহ্য এনেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে নিয়ে জোবায়ের মিলন সম্পাদিত আমাদের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ইউপিএল এনেছে অমিত হাসান সোহাগের সাঁওতাল নৃগোষ্ঠী নাট্য: ডাঙ্গুয়া কারাম,অনিন্দ্য এনেছে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধ লড়াইটা কিন্তু পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেই, কথাপ্রকাশ এনেছে সাইম রানার প্রবন্ধ সংগীতালোকের পথে।
মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর হাল ধরেছেন তাজউদ্দীন আহমদ। উত্তেজনা ও উদ্বেগে ভরা সেই সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকও চলেছে একের পর এক। বৈঠকে প্রত্যেকের কথা তাজউদ্দীন টুকে রেখেছেন নিজের হাতে। দেশ স্বাধীন হলো, তাঁর নোট নেওয়া থামল না। নতুন নির্মীয়মাণ রাষ্ট্রের প্রথম সংসদে, বাজেট অধিবেশনে, নানা উত্থান-পতন-সংকটে অব্যাহত রইল তাজউদ্দীনের নোট নেওয়া। নোটের মধ্যে রইল কখনো তাঁর নিজের গুরুত্ব আরোপণ। স্বাধীনতার অর্ধশতকের পর আলোর মুখ দেখছে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক এবং বাংলাদেশের বুদ্ধিদীপ্ত সেই রাজনীতিকের লেখা অজানা ও অমূল্য দলিল। মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ: ব্যক্তিগত নোট ১৯৭১-১৯৭৩ নামে সাজ্জাদ শরিফের সম্পাদনায় মেলায় এনেছে প্রথমা প্রকাশন।
তাজউদ্দীন আহমদের জন্ম গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে। মেধাবী ছাত্র ছিলেন বরাবর। ছাত্রজীবনেই জড়িয়ে পড়েন সমাজকর্ম ও রাজনীতিতে। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট, ছয় দফার আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, অসহযোগ আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, স্বাধীনতার পরে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন—সব মিলিয়ে বর্ণাঢ্য তাঁর জীবন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় বন্দী অবস্থায় তাঁকে হত্যা করা হয়।