এক দুর্ঘটনায় সামনে এল উপজেলার সরকারি চিকিৎসকদের বঞ্চনা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গত ১৪ এপ্রিল ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডা. শংকর প্রসাদ অধিকারীকে দেখতে যানছবি: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অর্পিতা হালদার (৪৩)। আইসিইউর ভেতরে চিকিৎসাধীন তাঁর স্বামী শংকর প্রসাদ অধিকারী। পাঁচ দিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন এই চিকিৎসক। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবেরা আসছেন খবর নিতে, তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কাঁদছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা অর্পিতা।

শংকর প্রসাদ অধিকারী পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও)। ১২ এপ্রিল তিনি কমিউনিটি হাসপাতাল পরিদর্শনে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত পান। একটি মোটরসাইকেলে যাত্রী হয়ে উঠেছিলেন এই চিকিৎসক। পথে একটি গরু মোটরসাইকেলের সামনে হুট করে চলে এলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন।

অথচ এই পরিদর্শনে শংকরের মোটরসাইকেলে যাওয়ার কথা ছিল না। কারণ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাড়ি রয়েছে। তিনি দেড় বছর আগে পরিদর্শনে যাওয়ার সময় গাড়িতেই যেতেন বলে জানান অর্পিতা। কিন্তু এখন ওই গাড়ির চালক ও জ্বালানি দুটোই দেওয়া সরকার বন্ধ রেখেছে। আইসিইউর সামনে উৎকণ্ঠিত অর্পিতার মনে হচ্ছে, গাড়ি থাকলে হয়তো তাঁর স্বামী এমন দুর্ঘটনায় পড়তেন না।

শংকর প্রসাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক, তিনি কোমায় আছেন বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। তাঁর এই দুর্ঘটনা চিকিৎসক মহলে আলোচনা তৈরি করেছে। এই ঘটনাকে চিকিৎসকদের অবহেলা এবং স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতার নজির হিসেবেও দেখাচ্ছেন কেউ কেউ। কারণ ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইউএইচএফপিও কার্যালয়ের গাড়িগুলোর জন্য তেল ও চালক বরাদ্দ বন্ধ হয়েছিল।

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে টিকাদান কার্যক্রম (ইপিআই ও মিজেলস) পরিদর্শনে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়েন শংকর প্রসাদ। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে হামসহ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে উদাসীনতা নিয়েও সমালোচনা চলছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত ১৪ এপ্রিল চিকিৎসাধীন শংকর প্রসাদকে দেখতে গিয়েছিলেন। চিকিৎসকদের ক্ষোভের কারণটিও জেনেছেন তাঁরা। সরকারি দায়িত্ব পালনে গিয়ে আহত শংকর প্রসাদের চিকিৎসার ব্যয়ভার সরকারের নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বাসিন্দা শংকর প্রসাদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ২৮তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি ২০১০ সালে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তার আগে ২০০৫ সালে তিনি বিয়ে করেন অর্পিতা হালদারকে। বেসরকারি সিটি ব্যাংকের মাদানী অ্যাভিনিউ শাখার গ্রাহক সেবা ব্যবস্থাপক (কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার) হিসেবে কর্মরত অর্পিতা। দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি ঢাকায় থাকেন।

স্বামীকে নিয়ে উৎকণ্ঠিত অর্পিতা হালদার। ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালে
ছবি: নাজনীন আখতার

‘ওই দিন ফোন ধরছিল না’

শংকর–অর্পিতা দম্পতির দুই সন্তান শাশ্বত শুদ্ধ অধিকারী (১৩) ও সৌরনীল অধিকারী (১১)। এর মধ্যে শাশ্বত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। ছোট ছেলে রাজধানীর বারিধারায় সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

অর্পিতা জানান, তাঁরা আগে পটুয়াখালীতে থাকতেন। তবে শাশ্বতের অসুস্থতা এবং পটুয়াখালীতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসার সুব্যবস্থা ছিল না বলে চিকিৎসকের পরামর্শে ২০২২ সালে তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।

গত ১২ এপ্রিল দুর্ঘটনায় পড়েন শংকর প্রসাদ। তার আগের দিন ফোনে কমিউনিটি হাসপাতাল পরিদর্শনে যাওয়ার কথা স্ত্রীকে বলেছিলেন তিনি।

গাড়ির চালকের বেতন–ভাতা ও গাড়ির জ্বালানি খরচ দেওয়া গত দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে চিকিৎসকেরা হাসপাতাল পরিদর্শন বা তদারকির কাজে গাড়ি ব্যবহার করতে পারছেন না।
মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া, সিভিল সার্জন, পটুয়াখালী

অর্পিতা হালদার বলেন, তিনি পরদিন সকাল ১০টার দিকে স্বামীকে মুঠোফোনে কল দেন। কিন্তু তাঁর স্বামী ফোন ধরেননি। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন কর্মী তাঁকে ফোন করে জানান, শংকর প্রসাদ মোটরসাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছেন, বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

পটুয়াখালী জেলার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মোটরসাইকেলে করে কমিউনিটি হাসপাতাল পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন শংকর প্রসাদ। হঠাৎ করেই পথে একটি গরু চলে আসায় মোটরসাইকেলের চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। চালক কিছুটা আহত হন। আর শংকর প্রসাদ গুরুতর আহত হন।

খবর শুনেই অর্পিতা বরিশাল রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন তাঁকে জানানো হয়, শংকর প্রসাদকে ঢাকায় আনা হচ্ছে। পরে অর্পিতার কর্মস্থল সিটি ব্যাংক এয়ার অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে শংকর প্রসাদকে ঢাকায় হাসপাতালে আনার ব্যবস্থা করে।

অবস্থা আশঙ্কাজনক

শংকর প্রসাদের শারীরিক অবস্থা কেমন—জানতে চাইলে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রচণ্ড আঘাতে শংকর প্রসাদের মস্তিষ্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাথার খুলি ফেটে গেছে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ জানান, দুর্ঘটনার দিন হাসপাতালে আনার পর রাত ২টার দিকে শংকর প্রসাদের মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং খুলির একটা অংশ সাভারে আণবিক শক্তি কমিশনের ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন বলেন, শংকর প্রসাদের চেতনার মাত্রা গ্লাসগো কোমা স্কেলে (জিসিএস) এখন ৬। জিসিএসের স্বাভাবিক মাত্রা ১৫। এ ছাড়া প্রচণ্ড জ্বর এসেছে। ধারণা করা যাচ্ছে, এটা সংক্রমণ থেকে হতে পারে

মাথায় হেলমেট থাকলে আঘাতের মাত্রা কম হতো বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ।

শংকরের সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে অর্পিতা হালদার জেনেছেন, যে মোটরসাইকেলে তাঁর স্বামী উঠেছিলেন, তাঁর চালকের কাছে অতিরিক্ত হেলমেট ছিল না।

অর্পিতা বলেন, বড় সন্তান বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন হওয়ায় তাঁকে নিয়ে উৎকণ্ঠিত থাকতেন শংকর প্রসাদ। ‘ছেলেদের জন্য হলেও যেন ও ফিরে আসে,’ বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন অর্পিতা।

স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ ডা. শংকর প্রসাদ অধিকারী
ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

গাড়ি আছে, জ্বালানি–চালক নেই

শংকর প্রসাদের কয়েকজন সহকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) পদমর্যাদার ক্রম একই, পঞ্চম গ্রেড। অথচ ইউএনও চালক ও তেলসহ গাড়ি বরাদ্দ ও নানা সুবিধা পান। অথচ চিকিৎসকেরা তা পান না।

অর্পিতা বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট–সেপ্টেম্বরে গাড়ির জন্য সরকারিভাবে জ্বালানি তেল দেওয়া বন্ধ করা হলে প্রথমে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চালক রাখা হতো। পরে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি অনেকবার স্বামীকে বলেছেন, হাসপাতাল পরিদর্শনে গেলে গাড়ি নিয়ে যেতে। তখন শংকর প্রসাদ বলেছিলেন, কয়েকবার নিজের অর্থে তেল নিয়েছেন, কিন্তু বড় গাড়ি হওয়ায় তেল বেশি লাগে। তাঁর জন্য এত টাকা খরচ করা কঠিন। এ জন্যই মোটরসাইকেলে চলাচল করতেন।

খোঁজ করতে গিয়ে জানা যায়, ২০২০ সালে সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার গাড়ি দেওয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্য খাতের অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে বার্ষিক বাজেট থেকে সরকার এই গাড়িগুলোর চালক ও জ্বালানির ব্যয় মেটাত। ২০২৪ সালের জুনে ওপির মেয়াদ শেষ হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্যের ৩৮ খাতের এই কর্মসূচি আর সচল করেনি। ফলে গাড়ি পরিচালনার অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালী জেলার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকের জন্য বরাদ্দ, গাড়ির চালকের বেতন–ভাতা ও গাড়ির জ্বালানি খরচ দেওয়া গত দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে চিকিৎসকেরা হাসপাতাল পরিদর্শন বা তদারকির কাজে গাড়ি ব্যবহার করতে পারছেন না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর ওপির মাধ্যমে এ ব্যয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বিকল্প প্রকল্পের মাধ্যমে কীভাবে এ ক্ষেত্রে অর্থায়ন করা যায়, সেই পরিকল্পনা নিচ্ছে বর্তমান সরকার।