বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুধুই পুরুষের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশে’ যোগ্যতা অনুযায়ী রাজনীতিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র ও রাজপথে নারীদেরও আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। নারীদের সাইবার বুলিং ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সমাজের সব অংশকে সজাগ হতে হবে।
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এনসিপি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এ কথা বলেন। এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) নারী সংগঠন জাতীয় নারীশক্তির আত্মপ্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এই আয়োজন করেছিল দলটি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘সাম্প্রতিক সময়ে নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতার প্রতিকার ও ধর্ষণের বিচার’।
অনুষ্ঠানে নারীশক্তির তিন সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করেন এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। মনিরা শারমিনকে আহ্বায়ক ও মাহমুদা আলম মিতুকে এই সংগঠনের সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নারীশক্তির মুখ্য সংগঠকের দায়িত্ব পেয়েছেন নুসরাত তাবাসসুম। মনিরা ও নুসরাত এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আর মাহমুদা আছেন যুগ্ম সদস্যসচিবের দায়িত্বে। তিনজনই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
নারীশক্তির জোরালো ভূমিকা প্রত্যাশা
এনসিপির এই অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শুধুই পুরুষের একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এটা আমাদের ভাঙতে হবে। এনসিপিকে অনুরোধ করব, তাদের বৈঠকগুলোতে যাতে নারীশক্তির প্রতিনিধিত্ব থাকে। আর নারীশক্তির প্রতি অনুরোধ থাকবে, তারা যেন নারীদের রাজনৈতিক অবস্থানের একটা পত্র তৈরি করে। যোগ্য নারীদের সংসদে আনার চিন্তা করতে হবে। দল-মতনির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত আসনে নারীদের সুযোগ করে দিতে হবে।’
এ সময় ফরিদা আখতার সাংবাদিকদের অনুরোধ করে বলেন, ‘সংবাদে ধর্ষিত বা নির্যাতিত নারীর চেয়ে ধর্ষক বা নির্যাতকের বর্ণনাটা বেশি দিতে পারলে ভালো হয়। ধর্ষককে চেনাতে হবে। মেয়েটির বিষয়ে কম বলাটা ভালো।’ তিনি বলেন, ‘যৌন হয়রানি বা নিপীড়নের ভয়ে মেয়েদের ঘরে ফিরিয়ে না দিয়ে তাদের শক্তিশালী করা উচিত। পড়াশোনা ও কর্মক্ষেত্রে ও রাস্তায় নারীদের আরও বেশি সক্রিয় দেখতে চাই।’ নারীদের অধিকার আদায়ে নারীশক্তির জোরালো ভূমিকাও প্রত্যাশা করেন সাবেক এই উপদেষ্টা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের মানবসম্পদ, আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সেক্রেটারি সাবিকুন নাহার মুন্নী বলেন, ‘নারীশক্তিকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমরা সব সময় তাদের প্রমোট করব। আমি মনে করি, তারা আমাদেরই সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করবে। দল, মতনির্বিশেষে দেশ ও মানুষের জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। নারীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের অগ্রাধিকারও দিতে হবে। নারীরা সব কাজে পারফর্ম করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে সামাজিক-সাংস্কৃতিক একটা প্রতিবন্ধকতা আছে। সেখান থেকে বের হতে সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে।’
‘সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে’
আলোচনায় নারীদের সাইবার বুলিংয়ের ব্যাপকতার কথা উল্লেখ করেন দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাইমা ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নারীদের সম–অধিকার ও সমমর্যাদার একটা জায়গা তৈরি করতে হবে, যাতে সহিংসতা পর্যন্ত যেতেই না হয়।’ নারীশক্তি যাতে এনসিপির ‘মিরর অর্গানাইজেশন’ (প্রতিরূপ সংগঠন) না হয়ে নারী অধিকারের বিষয়টিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রাখে, সেই আহ্বানও জানান তিনি।
ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতেমা তাসনিম জুমাও নারীদের সাইবার বুলিংয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন এআই জেনারেটেড কনটেন্ট, গুজব, ভুয়া ফটোকার্ড—এগুলোর সবচেয়ে বেশি শিকার হয় নারীরা। নারীদের টার্গেট করা হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীকে টুল হিসেবে ব্যবহার, ডিহিউম্যানাইজ করার বিপক্ষে নারীশক্তি সোচ্চার থাকবে বলে আমরা আশা করি।
‘স্বাধীনভাবে কাজ করবে নারীশক্তি’
আলোচনা সভায় সমাপনী বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নারীশক্তি এনসিপির সহযোগী সংগঠন হিসেবে থাকলেও তারা স্বাধীনভাবে নারীদের বিষয়টা নিয়ে কাজ করবে। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা যে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি, সেই সমাজ প্রতিষ্ঠায় নারীশক্তি কাজ করবে বলে প্রত্যাশা করি।’
সভায় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ‘এখন যারা সরকারি দল, বিরোধী দল—ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় নারীদের জন্য ১০০ আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্য দেখা গেছে। কারণ, তারা যোগ্যতা বিবেচনা করে সংসদে নারীদের মনোনয়ন দেয় না, বরং কে দলীয় মনোনয়ন পাননি, কার আত্মীয়স্বজন ইত্যাদি বিবেচনা থাকে। কিন্তু নতুন বাংলাদেশে আমরা বলতে চাই, যোগ্যতা অনুযায়ী রাজনীতিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’
নারীশক্তির মুখ্য সংগঠক নুসরাত তাবাসসুমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্রী নাফসিন মেহেনাজ আজিরিন।