দারিদ্র্যের ধরন বদলেছে

একসময় মঙ্গা নিয়ে হইচই হতো। মূলত বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে কৃষিনির্ভর দিনমজুর দরিদ্র মানুষের চরম খাদ্যঘাটতির সমস্যাকে মঙ্গা বলা হতো। মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত এ সময়টাতেই মানুষের অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিত। খাবারের সংগ্রহ কমে যেত, কাজের সুযোগ থাকত না। কুড়িগ্রাম ছিল মঙ্গার অন্যতম কেন্দ্র। তবে গত এক দশকে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এ অঞ্চলে। ফলে আগের চিত্র কিছুটা পাল্টে গেছে।

অবশ্য সরেজমিনে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার ও তিস্তা নদী অববাহিকা অঞ্চলগুলোতে ঘুরে এখনো এ এলাকার হাজার হাজার পরিবারের অভাব–অনটনের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই চোখে পড়ে। একসময় তিনবেলা খেতে না পাওয়ার কষ্ট ছিল। এখন অভাব ভিন্ন, খাদ্যের বদলে পুষ্টির অভাব দেখা যায়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে ঘাটতি রয়েছে।

১৮ জুলাই চিলমারী উপজেলার জোড়গাছ বাজারে দেখা হয় কয়েকজন দিনমজুরের সঙ্গে। তাঁরা দুপুরের কড়া রোদে গামছায় বেঁধে হেলেঞ্চাশাক নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। কৃষিশ্রমিক হযরত আলী বলেন, তাঁরা মাছ, মাংস কিনে খেতে পারেন কম। বেশির ভাগ সময় শাকপাতা সংগ্রহ করে খান।

বৃহত্তর রংপুরের বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আরডিআরএস কুড়িগ্রামে কাজ করছে প্রায় চার দশক ধরে। এ সংস্থার জেলা প্রোগ্রাম ম্যানেজার তপন কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, কুড়িগ্রামে মঙ্গা না থাকলেও দুই ধরনের দারিদ্র্য আছে। একটি হলো মৌসুমি দারিদ্র্য। বিশেষ করে জুন থেকে সেপ্টেম্বরে বাড়িঘরে বন্যার পানি উঠলে মানুষ চরম বিপদে পড়েন। তাঁদের হাঁস, মুরগি ও ছাগল মারা যায়। ঘরবাড়ির ক্ষতি হয় ও ফসল নষ্ট হয়। তখন তাঁরা চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং আরও দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যান।

দারিদ্র্যের আরেকটি ধরন হলো, যাঁরা একেবারে চরে বাস করেন, তাঁদের কোনো জমি নেই। তাঁরা সব সময় দারিদ্র্যের মধ্যেই থাকেন। তাঁরা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে চলেন। এই মানুষগুলোর বেশির ভাগ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনোদনের সুবিধাবঞ্চিত।

কুড়িগ্রাম অন্য পাঁচ জেলা থেকে পিছিয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে নদী অববাহিকার জনগোষ্ঠীকে শিক্ষায় এগিয়ে নিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দারিদ্র্যকে যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক, শিক্ষা ছাড়া কমানো যাবে না।
মোহাম্মদ রেজাউল করিম, কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য হারের সঙ্গে একমত নন জেলা প্রশাসক

বেশি অতিদরিদ্র মানুষ কুড়িগ্রামে

তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার, গঙ্গাধর, সোনাভরীসহ জেলার অর্ধশতাধিক ছোট–বড় নদ–নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে এবং কুড়িগ্রামে এখন হতদরিদ্র পরিবারের সংখ্যা কত—এ তথ্য জেলা প্রশাসন, জেলা পরিসংখ্যান কার্যালয় ও কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য নিয়ে কাজ করা এনজিও—কারও কাছে নেই। কয়েকটি এনজিও প্রতিনিধির দাবি, যখন যে এনজিও যে এলাকায় কাজ করে, তখন তারা নিজেরাই জরিপ করে হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে বাছাই করে তাদের সুবিধাভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

তবে গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) অতিদরিদ্রদের অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জবিষয়ক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি কুড়িগ্রামে। এ জেলায় ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অতিদরিদ্র।

কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য হারের সঙ্গে একমত নন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কুড়িগ্রাম অন্য পাঁচ জেলা থেকে পিছিয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে নদী অববাহিকার জনগোষ্ঠীকে শিক্ষায় এগিয়ে নিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দারিদ্র্যকে যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক, শিক্ষা ছাড়া কমানো যাবে না।

জেলায় যে কর্মসূচিগুলো আসে, সেগুলো অনেকেই জানে না। এমনো দেখা যায়, প্রশিক্ষণের বরাদ্দ থাকে। কিন্তু প্রশিক্ষণ না দিয়েই টাকা উত্তোলন করা হয়। এতে সরকারের টাকা ঠিকই ব্যয় হয়, কিন্তু কোনো কাজে আসে না।
আবদুল কাদের, অধ্যাপক, কুড়িগ্রামের খলিলগঞ্জ কারিগরি ও বাণিজ্য মহাবিদ্যালয়ের সহকারী

সরকারি কর্মসূচির সাফল্য কম

দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সরকার ২০১০ সালে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলায় মোট ২৯ হাজার ৮১৫ জন শিক্ষিত বেকার তরুণ–তরুণীকে দুই বছর মেয়াদে অস্থায়ী ভিত্তিতে বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ দিয়েছিল। তিন মাস প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেককে ছয় হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সরকারের উদ্দেশ্য ভেস্তে যায়।

কুড়িগ্রাম ও জামালপুরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাসকরণ, উত্তরাঞ্চলের দরিদ্রদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ, বিলুপ্ত ছিটমহল ও নদীবিধৌত চরাঞ্চলে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশ কিছু ছোট–বড় প্রকল্প সাম্প্রতিক সময়ে বাস্তবায়িত হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মান নিয়েও জেলার বাসিন্দা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মনে নানা প্রশ্ন আছে।

কুড়িগ্রামের খলিলগঞ্জ কারিগরি ও বাণিজ্য মহাবিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আবদুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, জেলায় যে কর্মসূচিগুলো আসে, সেগুলো অনেকেই জানে না। এমনো দেখা যায়, প্রশিক্ষণের বরাদ্দ থাকে। কিন্তু প্রশিক্ষণ না দিয়েই টাকা উত্তোলন করা হয়। এতে সরকারের টাকা ঠিকই ব্যয় হয়, কিন্তু কোনো কাজে আসে না। এ ছাড়া শুধু প্রশিক্ষণনির্ভর কর্মসূচি দিয়ে দারিদ্র্য কমবে না। কুড়িগ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান দরকার।

সরকারিভাবে চলছে আরও নানা কর্মসূচি। সরকারের অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) স্থানীয়ভাবে ‘মঙ্গা’ কর্মসূচি নামে পরিচিত। কারণ, এটি এ এলাকার কাজের সংকটকালে দেওয়া হয়। এ বছরও এ কর্মসূচির আওতায় জেলায় প্রায় ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছিল। কিন্তু নানা ত্রুটি ও সমস্যার কারণে বরাদ্দের ৩০ শতাংশ কাজ হয়নি।

কুড়িগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, পাশের জামালপুর জেলার জন্য গত এক দশকে একনেকে অন্তত ১৫০টি প্রকল্প পাস হয়েছে। কিন্তু কুড়িগ্রামে ১০টিও হয়নি। সরকারি উন্নয়ন বৈষম্যের কারণেও কুড়িগ্রামের মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারছে না।

এনজিওগুলোর কর্মসূচি অনেক, বরাদ্দ কম

আরডিআরএস বাংলাদেশ কুড়িগ্রামে দরিদ্র ও অতিদরিদ্রদের নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তার একটি ট্রান্স বাউন্ডারি ফ্লাড রেজিলেন্স প্রজেক্ট ইন সাউথ এশিয়া। জেলার প্রোগ্রাম ম্যানেজার তপন কুমার সাহা বলেন, ২০১৮ সালে এ প্রকল্প শুরু হয়েছে। ৫৫ হাজার ৭০০ পরিবারকে বস্তায় ও বসতভিটায় সবজি চাষ, ভাসমান বীজতলা, হাঁস–মুরগি পালনে সহায়তা এবং বন্যা ও দুর্যোগ সহনশীল অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

অনেক কর্মসূচি খাতা–কলমে বাস্তবায়িত হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছায়নি।
এনামুল হক চৌধুরী, জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি

এর মধ্যে বসতভিটা উঁচু করে দেওয়া হয়েছে ৩০০ পরিবারের। এ ছাড়া অন্য একটি প্রকল্পে বন্যার সময় তাৎক্ষণিক সহায়তা করতে ২৬ হাজার ৫২টি অতিদরিদ্র পরিবারকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যারা বন্যার পানি বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপরে উঠলে সাড়ে চার হাজার টাকা করে পাবে।

বেসরকারি সংস্থা কেয়ারের সৌহার্দ্য প্রকল্পটিও ২০০৫ সালে কুড়িগ্রামে আসে। ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত সৌহার্দ্য–৩ কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী ৩৮ হাজারের বেশি। চার উপজেলার ১৮ ইউনিয়নে এর মধ্যে ৬২০টি পরিবারকে বাড়িভিটা উঁচু করে দেওয়া হয়েছে। সৌহার্দ্য–৩ কর্মসূচি শেষ হচ্ছে আগামী সেপ্টেম্বরে।

সৌহার্দ্য–৩ কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে কুড়িগ্রামের স্থানীয় এনজিও মহিদেব যুবসমাজ কল্যাণ সমিতি। এনজিওটির উপপরিচালক শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাঁরা ৪০ কোটি টাকার মতো বরাদ্দ পেয়েছেন।

ব্র্যাকের আলট্রা পিওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রাম কুড়িগ্রামে শুরু হয়েছিল ২০০২ সালে। এখন পর্যন্ত জেলায় তাদের সুবিধাভোগী ৪৭ হাজার ১৭৪ সদস্য। গত বছর তিন গ্রুপে ১ হাজার ১১৭ সদস্য সুবিধা পেয়েছেন। ব্র্যাকের জেলা সমন্বয়কারী রেজাউল করিম খান দাবি করেন, তাঁদের সুবিধাভোগীদের দারিদ্র্য থেকে উন্নতির হার ৯৭ শতাংশ।

এ ছাড়া কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য, অতিদারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনশীলতা নিয়ে কাজ করছে ইএসডিও, সলিডারিটি, অ্যাসোসিয়েশন ফর অল্টারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট (অ্যাফাদ), কারিতাস, গণ–উন্নকেন্দ্রসহ অর্ধশতাধিক এনজিও।

জেলার এনজিও প্রতিনিধিরাও বলছেন, এত কম বরাদ্দে কুড়িগ্রামের মতো দারিদ্র্যকবলিত এলাকার মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ, একবার নদীভাঙনের শিকার হলে পরিবারগুলোর কিছুই থাকে না।

দারিদ্র্য বিমোচনের নামে সরকার ও এনজিওর মাধ্যমে কুড়িগ্রামে যে পরিমাণ বরাদ্দ এসেছে, তা দিয়ে এখানকার মানুষের উন্নয়ন খুব কমই হয়েছে বলে মনে করেন জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি এনামুল হক চৌধুরী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, অনেক কর্মসূচি খাতা–কলমে বাস্তবায়িত হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছায়নি।

এখনো কাজের সংকট

মূলত এ জেলায় দিনমজুরি ছাড়া বড় কোনো কাজের সুযোগ নেই। এ কাজটিও শুধু ধান লাগানো ও ধান কাটার মৌসুমে। জেলায় শিল্পকারখানা বলতে সরকারি একটি টেক্সটাইল মিল ও বেসরকারি একটি স্পিনিং মিল। প্রায় এক যুগ ধরে দুটিই বন্ধ।

স্থানীয় এনজিও সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর অল্টারনেটিভ ডেভেলপমেন্টের (অ্যাফাদ), প্রধান নির্বাহী সাদিয়া ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেন, হাজার হাজার পুরুষ এলাকার বাইরে কাজে যেতে পারলেও নারীরা যেতে পারছেন না। এতে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী কর্মহীন থাকছে। কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য কমাতে চাইলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন