অনুষ্ঠানের শুরুতেই শওকত হোসেন জানান, ‘অনেক বছর পরে আমরা টের পাচ্ছি জ্বালানিনিরাপত্তা না থাকলে কী হয়। দেশজুড়ে লোডশেডিং হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে কখন আমরা একটু ভালো পরিস্থিতিতে যাব, তা অনিশ্চিত। আবার শীত এলে যদি পরিস্থিতির একটু উন্নতিও হয়, এরপর আমরা যে আবার জ্বালানি নিয়ে বিপদে পড়ব না, তা কিন্তু নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারছে না।’

এরপর অনুষ্ঠানের সঞ্চালক শওকত হোসেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের কাছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে চলমান সংকটের প্রেক্ষাপট নিয়ে জানতে চান। এ সময় খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশ জ্বালানিতে ঐতিহাসিকভাবেই দেশীয় উৎসনির্ভর ছিল। দেশীয় জ্বালানিতেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে আমাদের গ্যাসের মজুত কমে আসায় আমদানিনির্ভরতা বাড়তে থাকে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের চলতি গ্যাস মজুত যখন কমে আসছিল, তখন সুযোগ থাকলেও নতুন গ্যাস মজুতের অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতেই সরকার বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে উৎপাদনের দিক থেকে বিদ্যুতের একটি অতি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ধরে কাজ করেছে সরকার। উল্লেখ্য, আট জেলায় বর্তমানে ২০টি এলএনজি ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেগুলোর স্থাপিত ক্যাপাসিটি ১৩,৯৫৫ মেগাওয়াট এবং মেয়াদকালীন ক্যাপাসিটি চার্জ নূন্যতম ৯,৭৭৩ মিলিয়ন ডলার।

এর ফলে চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উপাদনের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় করতে গিয়ে জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে বলে জানান খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, এর মধ্যে এলএনজিনির্ভর বিদ্যুৎও রয়েছে। আর তখনই আমদানি নীতি একটি দেশের জন্য ভালো, যখন বৈদেশিক রিজার্ভ ভালো থাকে, ডলারের মূল্য এবং জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, করোনার পরে এই তিনটি বিষয়ই বেশ খারাপ পরিস্থিতিতে চলে গেছে। করোনা–পরবর্তী ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বিশ্বে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনকারীরা এর দামও বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জ্বালানির একটি বড় উৎসও বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি ডলারের বাড়তি দামের জন্য বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশকে এলএনজি আমদানির জন্য বাড়তি চাপে পড়তে হয়েছে। জ্বালানি–সংকট দ্রুত শেষ করা গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে চাপ ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০২১ সাল পর্যন্ত বেসরকারী বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে মোট ৭১,৫৬৭ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়েছে। আর গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সর্বশেষ প্রস্তাবনা অনুযায়ী ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানিকৃত এলএনজি জাতীয় গ্রিডে দৈনিক যুক্ত করলে বর্তমান অর্থবছরেই সরকারি ভর্তুকি দাঁড়াবে ২৫,০০০ কোটি টাকা।

দেশের বর্তমান জ্বালানিসংকটের জন্য কি বৈশ্বিক সংকটই দায়ী? নাকি আমাদেরই অনেকগুলো ভুল ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে ইজাজ হোসেন বলেন, ‘আসলে বৈশ্বিক সমস্যার আগেই আমাদের পিঠ দেয়ালে প্রায় লেগেই গিয়েছিল। আর এখন আমরা নিরুপায়, স্বাভাবিকভাবে সংকটগুলোকে সামাল দিতে পারছি না। আমাদের যে গ্যাস মজুত আছে, সেটা তো অনুসন্ধান করে বের করতে হবে। কিন্তু আমরা সেটা করিনি।’ তিনি জ্বালানি খাতের চলমান চাপের কারণ হিসেবে শতভাগ বিদ্যুতায়নের বিষয়টিও উল্লেখ করেন।

বৈশ্বিক সংকটের প্রসঙ্গ ধরেই খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সম্প্রতি এলএনজির বিশ্ববাজারে ইউরোপ প্রবেশ করায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ দামের দিক থেকে বেশ প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়েছে। ইতিমধ্যে বলা হচ্ছে স্পট মার্কেটে এলএনজি নেই এমনকি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ২০২৫ সালের আগে উৎপাদনকারীরা সরবরাহ দিতে পারবে না। অপরদিকে ইউরোপে শীতে গ্যাসের চাহিদা যখন বাড়বে, তখন বাংলাদেশ গ্যাসের প্রাপ্তি নিয়ে আরও ঝুঁকিতে পড়বে। এর ফলে আমরা যে হারে এলএনজি আমদানি করি সেটা সম্ভব হবে না, দামের দিক থেকেও ঝুঁকি থাকবে। সব মিলিয়ে আগামী ছয় মাস জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের ঝুঁকি থাকছে।’

জ্বালানিনিরাপত্তা ও দীর্ঘ মেয়াদে করণীয় প্রসঙ্গে সিপিডির খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের কাছে জানতে চাওয়ার আগে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক শওকত হোসেন নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন। ২০১০ সালের বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় যে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি, সেটা উল্লেখ করেন তিনি।

পরে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম যোগ করেন, ‘জ্বালানি খাতে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা টেকসই উন্নয়নবিষয়ক যেকোনো আন্তর্জাতিক সেমিনারের আগে নবায়নযোগ্য শক্তিতে তাঁদের পরিকল্পনা, লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। কারণ, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নবায়নযোগ্য শক্তির বিভিন্ন অসত্য তথ্য তুলে ধরে এর কোনো সম্ভাবনা নেই বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগও করছেন না।’ তিনি মনে করিয়ে দেন যে নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে ২০২০ সালের লক্ষ্যমাত্রা এখন ২০৩০–এ গিয়ে ঠেকেছে।

বক্তব্যের শেষে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কিছুটা আশার কথা শোনান। তিনি বলেন, ‘খুব উল্লেখযোগ্য না হলেও জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারকেরা এখন নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্ব অনুধাবন করছেন। সে জন্য আমাদের সংশ্লিষ্ট নীতিতে সব ধরনের অসামঞ্জস্য এখনই দূর করতে হবে। পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগকে গুরুত্ব নিয়ে উৎসাহিত করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে আগ্রহ দেখাতে হবে।’ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম চলতি সংকটকে একধরনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

অনুষ্ঠানের শেষে বর্তমান সংকট বিবেচনায় সরকারের টেকসই সমাধানের সম্ভাব্য উদ্যোগ প্রসঙ্গে জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলেন, এ নিয়ে সংশয় কিছুটা থেকেই যায়। তবে ইতিমধ্যে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ও নবায়নযোগ্য শক্তির দিকেও নজর দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমদানিকৃত জ্বালানির চেয়ে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ তুলনামূলক কম।