‘অস্ত্র দিয়ে বলে, যুদ্ধ করতে হবে না, সামনে-পিছে যাবা’

পলাশ শেখ ও আলী হাসান সোহেল যুদ্ধে আহত হয়ে রাশিয়ায় হাসপাতালেছবি: সংগৃহীত

মো. আলী হাসান সোহেলের বাড়ি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায়। তিনি এখন রাশিয়ার পেনজা শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালটি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে।

আলী হাসান ১ মাস ১০ দিন ধরে সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গতকাল বুধবার তাঁর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয় প্রথম আলোর। কাঁদতে কাঁদতে আলী হাসান বলেন, ‘এ জীবন কেউ চায় না। এটা কোনো জীবন না। বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করেছি, সুস্থ হলে [দেশে ফেরানোর] চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু সুস্থ হলে তো আবার যুদ্ধে পাঠিয়ে দেবে।’

আলী হাসান আরও বলেন, ‘এক বছরে পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারব কি না জানি না। কবে দেশে ফিরতে পারব, এই প্রার্থনা করি সারাক্ষণ। যেমনে পারেন, আমারে উদ্ধার করেন; পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেন।’

আরও পড়ুন

নির্মাণশ্রমিক হিসেবে গত ৭ মে একসঙ্গে রাশিয়ায় যান ৩০ জন। তাঁদের একজন আলী হাসান। তিনিসহ ৩০ জনের ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের পরিবার জানিয়েছে, তাঁরা রাশিয়ায় গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। প্রতারণার মাধ্যমে তাঁদের রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৬ জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন। দুজন হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। আর ভিন্ন দুটি হাসপাতালে ভর্তি বাকি দুজন দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন।

আলী হাসান আরও বলেন, একপর্যায়ে হাতে অস্ত্র দিয়ে, সেনাবাহিনীর পোশাক পরিয়ে একজন করে পাঠানো হয় সামনের দিকে। ১৬ জনের দল থেকে ১৪ জন নিখোঁজ এখন, আর বাকি ২ জন হাসপাতালে ভর্তি।

নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিরা বলছেন, ওই ৩০ জনকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ১৬ জনের দলে ছিলেন আলী হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ষষ্ঠ দিনে পাঁচজনকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। এরপর মাইলের পার মাইল হেঁটে, সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার খেয়ে তিন দিন পর এক সুড়ঙ্গে পৌঁছান। সেটি মাটির নিচের একটি সেনা ক্যাম্প। সেখানে রাখা হয় তাঁদের। একপর্যায়ে তাঁদের দলের বাকি ১১ জনও যোগ দেন।

আলী হাসান আরও বলেন, একপর্যায়ে হাতে অস্ত্র দিয়ে, সেনাবাহিনীর পোশাক পরিয়ে একজন করে পাঠানো হয় সামনের দিকে। ১৬ জনের দল থেকে ১৪ জন নিখোঁজ এখন, আর বাকি ২ জন হাসপাতালে ভর্তি।

আরও পড়ুন

আলী হাসান আরও বলেন, ‘যুদ্ধে রাজি না হলে বন্দী করে রাখে, মারধর করে, শাস্তি দেয়। এরপর যেতে বাধ্য হতে হয়। অস্ত্র দিয়ে বলে, যুদ্ধ করতে হবে না; সামনে-পিছে, ডানে-বাঁয়ে যাবা। এটি টোপ, মরণফাঁদ। গেলেই ইউক্রেনের ড্রোনের হামলার শিকার হতে হয়। কেউ মারা যান। কেউ আহত হয়ে ফিরতে পারলে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়।’

নির্মাণশ্রমিক হিসেবে গত ৭ মে একসঙ্গে রাশিয়ায় যান ৩০ জন। তাঁদের একজন আলী হাসান। তিনিসহ ৩০ জনের ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের পরিবার জানিয়েছে, তাঁরা রাশিয়ায় গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। প্রতারণার মাধ্যমে তাঁদের রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৬ জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন।

রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালে ফেব্রুয়ারিতে। বাংলাদেশ থেকে ২০২৩ সালে রাশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু হয়। তিন বছর ধরে এটি কয়েক গুণ বেড়েছে। এদের অনেকেই গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন মূলত ‘টোপ’ হিসেবে। মারাও যাচ্ছেন কেউ কেউ, যার সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। তবে প্রথম আলো অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে।

রাশিয়ায় কাজের কথা বলে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানোর বিষয়ে ঢাকায় দেশটির দূতাবাসের বক্তব্য গতকাল ই–মেইলের মাধ্যমে চাওয়া হয়েছে। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে।

এদিকে আলী হাসানের স্ত্রী আকলিমা খাতুন তাঁকে (আলী হাসান) উদ্ধার ও পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। এতে বলা হয়, জীবিকার তাগিদে রাশিয়ায় চাকরি করতে গিয়েছিলেন আলী হাসান। প্রতারিত হয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে পড়েন তিনি। এদিকে পরিবার ঋণের কিস্তি পরিশোধে পাওনাদারদের চাপে আছে।

রাশিয়ার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালে ভর্তি দুজনের দায়িত্ব বাংলাদেশ দূতাবাসকে নিতে হবে। তাঁদের সব ধরনের চিকিৎসা খরচ, পাওনা ও ক্ষতিপূরণ রাশিয়ার কাছ থেকে আদায় করতে হবে। সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী

পলাশ দেশে ফিরতে চান

প্রথম দফায় আলী হাসানের সঙ্গে যুদ্ধের মাঠে যাওয়া পাঁচজনের দলে আরও ছিলেন মো. পলাশ শেখ। ড্রোন হামলায় তাঁর একটি হাত উড়ে গেছে। তিনি মস্কোর একটি হাসপাতালে গত ২৪ দিন ধরে ভর্তি আছেন।

বিষয়টি প্রথম আলোকে জানান পলাশের ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম। তিনি বলেন, যেহেতু এক হাত নেই, আর হয়তো যুদ্ধে পাঠাবে না। সুস্থ হলে ওরা সিদ্ধান্ত দেবে। দূতাবাসও বলেছে, সুস্থ হলে দেশে ফেরানোর চেষ্টা করবে। পলাশ যেকোনোভাবে দেশে ফিরতে চান।

আরও পড়ুন

পলাশ শেখকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়ে আবেদন করেন তাঁর বোন চুমকি খানম। এতে বলা হয়, গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার পলাশ শেখ উন্নত জীবনের আশায় ধারদেনা ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে গত ৭ মে রাশিয়া যান। সেখানে গিয়ে তিনি প্রতারণার শিকার হন। তাঁকে জোরপূর্বক ও চতুরতার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তাঁকে উদ্ধার করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি ঋণের চাপ থেকে মুক্তি দিতে পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।

এদিকে আলী হাসান ও পলাশের বিষয়ে রাশিয়ার মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, যুদ্ধে আহত হয়ে এখন হাসপাতালে ভর্তি আছেন, তাঁরা দেশে ফিরতে চান; এমন কেউ দেশে ফেরানোর জন্য দূতাবাসের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করেননি।

‘ক্ষতিপূরণ রাশিয়ার কাছ থেকে আদায় করতে হবে’

রাশিয়ায় যাঁরা নিহত হন, তাঁদের মরদেহ বাংলাদেশে আসে না। পরিবারগুলো কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না।

অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়ার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালে ভর্তি দুজনের দায়িত্ব বাংলাদেশ দূতাবাসকে নিতে হবে। তাঁদের সব ধরনের চিকিৎসা খরচ, পাওনা ও ক্ষতিপূরণ রাশিয়ার কাছ থেকে আদায় করতে হবে। সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে।