দেশের ভেতরে-বাইরে যেকোনো ষড়যন্ত্রের জবাব দেব: প্রধানমন্ত্রী

  • প্রায় ২০ বছর পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আবার সরকার গঠনের পর এটা প্রথম ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’।

  • নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্‌যাপন করেছে বিএনপি।

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপি শোভাযাত্রা বের করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শোভাযাত্রাটি নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হয়। গতকাল বেলা সাড়ে তিনটায় রাজধানীর কাকরাইল এলাকায়ছবি: সাজিদ হোসেন
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

দেশ নিয়ে আবারও ষড়যন্ত্র হচ্ছে উল্লেখ করে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘কোনো ষড়যন্ত্র দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। একাত্তরের মতো, নব্বইয়ের মতো, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো আবারও দাঁতভাঙা জবাব আমরা দিতে চাই।’

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির ‘সার্বভৌমত্ব’ শোভাযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারেক রহমান এ কথা বলেন।

এ সময় বিএনপির চেয়ারম্যান নেতা-কর্মীদের কাছে সমর্থন চেয়ে জানতে চান, ‘আপনারা কি আমাদের সাথে আছেন?’ তখন নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা সমস্বরে ‘আছি’ বলে করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, বাংলাদেশের সকল গণতন্ত্রকামী মানুষকে নিয়ে আমরা যেকোনো ষড়যন্ত্র—তা দেশের ভেতরে হোক, দেশের বাইরে হোক, সকল ষড়যন্ত্রের জবাব আমরা এক এক করে দেব। কোনো ষড়যন্ত্র করে মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।’

প্রায় ২০ বছর পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আবার সরকার গঠন করেছে। এরপর এবারই প্রথম ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উদ্‌যাপন করল দলটি। এ উপলক্ষে রাজধানীতে শোভাযাত্রার আয়োজন করে বিএনপি। দিবসটি উপলক্ষে নয়াপল্টনের শোভাযাত্রা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ তিনটি অনুষ্ঠান ও কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড ও আর্মি স্টেডিয়ামে পৃথক দুটি অনুষ্ঠানে তিনি সস্ত্রীক অংশ নেন।

৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্যের কথা উল্লেখ করে নয়াপল্টনে বিএনপির শোভাযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ নভেম্বর হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের দিন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষার দিন, মানুষের বাক্‌স্বাধীনতার দিন। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের মানুষ জীবন বিসর্জন দিয়ে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, তা রক্ষার অঙ্গীকারের দিন হোক এবারের শোভাযাত্রা।

গতকাল বেলা সোয়া তিনটায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বানানো মঞ্চ থেকে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন দলীয় প্রধান তারেক রহমান। এ সময় মঞ্চে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

শোভাযাত্রার কর্মসূচি ঘিরে দুপুর ১২টা থেকেই ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা নয়াপল্টনে সমবেত হতে শুরু করেন। নেতা-কর্মীদের হাতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আলোকচিত্রসংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। বিভিন্ন রঙের ক্যাপ ও গেঞ্জি পরে শোভাযাত্রায় অংশ নেন তাঁরা। বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী-সমর্থকের উপস্থিতিতে জমায়েত কাকরাইল মোড় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য ছিল।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, যেভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর অপশক্তি পরাজিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একইভাবে সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। দেশের মানুষ স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে।

তারেক রহমান বলেন, ‘অতীতের মতো এখনো তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আবারও তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দাবিয়ে রাখতে চায়। আবার তারা “আমি-ডামি” নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করতে চায়।’ তিনি বলেন, যে দেশের মানুষ একাত্তর ঘটাতে পারে, পঁচাত্তরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব ঘটাতে পারে, চব্বিশে গণ–অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে, সে দেশের মানুষকে ষড়যন্ত্র করে দাবিয়ে রাখা যাবে না।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী স্লোগান দেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ’, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’

সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে হেঁটে দীর্ঘ শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শোভাযাত্রাটি কাকরাইল, হেয়ার রোড, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, বিজয় সরণি হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হয়।

শোভাযাত্রার পথে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানান উপস্থিত নেতা-কর্মী ও আশপাশের মানুষ। প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে তাঁদের অভিবাদনের জবাব দেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে র‍্যালিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এ কে এম শামছুল ইসলাম এবং মন্ত্রিসভার সদস্যসহ দলের নেতারা ছিলেন।

বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শোভাযাত্রা শেষে ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত সমাপনী বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকে যে মহল বাংলাদেশে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত...জনগণ তাদের পরাজিত করেছে। আবারও তারা ষড়যন্ত্র নিয়ে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে গতকাল সকাল সাড়ে আটটায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ফুল দিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়ান এবং ফাতিহা পাঠ করেন। পরে তারেক রহমান বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে দলের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান। প্রয়াত দুই নেতার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।

এ সময় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আমান উল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম, ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান, নুরুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল ৭ নভেম্বরের চেতনা। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের অব্যাহত ধারা নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়েই দেশের মানুষ জুলাইয়ে আন্দোলনে নেমেছিল। ৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করেই দেশের মানুষ গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিকে পরাজিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী সমাধিস্থল ত্যাগ করার পর সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা ফুল দেন। বিএনপি মহানগর উত্তর, দক্ষিণ, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, মহিলা দল, ছাত্রদল, মৎস্যজীবী দল, তাঁতী দল, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (অ্যাব), সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা নেতা-কর্মীদের নিয়ে পৃথকভাবে জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানান।

গ্রাম পুলিশদের মহাসমাবেশ ও আর্মি স্টেডিয়ামে প্রদর্শনী

গতকাল দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত গ্রাম পুলিশদের মহাসমাবেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে তিনি প্যারেড গ্রাউন্ডে যোগ দেন।

সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসস জানিয়েছে, মহাসমাবেশে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা প্রায় ৪১ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্য অংশ নেন।

সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে যান। সেখানে তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), বাংলাদেশ স্কাউটসসহ বিভিন্ন বাহিনীর অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য ও মনোজ্ঞ প্রদর্শনীতে অংশ নেন।

সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের বিশেষ প্রদর্শনীতে বিএনসিসির ৩ হাজার ক্যাডেট এবং স্কাউটসের ৫০০ সদস্য অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদ সদস্য, বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধান, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

বাসস জানিয়েছে, প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যতবার ৭ নভেম্বরের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়েছে, ততবারই দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের বিশেষ প্রদর্শনীতে বিএনসিসির ৩ হাজার ক্যাডেট এবং স্কাউটসের ৫০০ সদস্য অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদ সদস্য, বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধান, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

বাসস জানিয়েছে, প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যতবার ৭ নভেম্বরের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়েছে, ততবারই দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।