‘হাত-মুখ বাঁধা এক ব্যক্তির মাথায় গুলি করেন জিয়াউল, পরে পানিতে ফেলে দেন’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালফাইল ছবি: প্রথম আলো

২০১১ সালে টঙ্গী আহসানউল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভার থেকে নেমে একটু ডান দিকে মোড় নিয়ে ৪০ মিনিটের মতো যাওয়ার পর একটি সেতুর ওপর র‌্যাবের গাড়ি থামে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. রফিকুল ইসলাম। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, এরপর দেখেন র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক জিয়াউল আহসান একটি গাড়ি থেকে হাত–মুখ বাঁধা অবস্থায় একজন লোককে নামান। সেতুটির রেলিংয়ের পাশে দাঁড় করান তাঁকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখেন, জিয়াউল সেই ব্যক্তির মাথায় গুলি করেন এবং তাঁকে রেলিংয়ের ওপর থেকে পানিতে ফেলে দেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ সোমবার এমন জবানবন্দি দেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) রফিকুল ইসলাম। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দি দেন।

রফিকুল ইসলাম বর্তমানে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের উপপরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ১৯৯২ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে কমিশন প্রাপ্ত হন। ২০০৯ সালে উপ-অধিনায়ক হিসেবে র‌্যাব-১–এ তিনি যোগদান করেন। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি র‌্যাব-৩–এর অধিনায়ক হন। ২০১২ সালের আগস্ট মাসে সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। ২০২২ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে থাকা অবস্থায় অবসরে যান।

জবানবন্দিতে রফিকুল ইসলাম বলেন, র‌্যাব-৩–এর অধিনায়ক থাকার সময় ২০১১ সালের ১১ জুলাই র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক জিয়াউল আহসান তাঁকে ফোন করে বলেন, ‘আজকে রাতে একটা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে যেতে হবে। তুমি তোমার অফিসারদের নিয়ে প্রস্তুত থেকো।’ জিয়াউলের কাছে তিনি জানতে চান, ‘কিসের অপারেশন, কখন যেতে হবে, কীভাবে যাব, কোথায় যাব?’ জিয়াউল তাঁকে বলেন, ‘তোমার কোনো কিছু জানার প্রয়োজন নাই। সময়মতো আমার আদেশ মোতাবেক কাজ করবে।’ সেদিন অফিস শেষ হওয়ার আগে জিয়াউল তাঁকে ফোন করে বলেন, ‘রাত ১১টায় র‌্যাব সদর দপ্তরে তোমার অফিসারদের নিয়ে উপস্থিত থাকবে।’

সেদিন রাত সাড়ে ১০টায় তিনজন অফিসার নিয়ে র‌্যাব সদর দপ্তরে হাজির হন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে রফিকুল ইসলাম বলেন, তাঁর সঙ্গে মেজর সাজ্জাদুল, মেজর তরিকুল ও মেজর এমারত ছিলেন। একপর্যায়ে জিয়াউল আহসান এসে তাঁকে বলেন, ‘ফলো মি’। তখন তাঁর গাড়িতে র‌্যাব-৩–এর তিনজন অফিসারসহ চারটি গাড়িতে করে তাঁরা রওনা হন। র‌্যাব সদর দপ্তর থেকে টঙ্গী আহসানউল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভারে যান। ফ্লাইওভার থেকে নেমে একটু ডান দিকে মোড় নিয়ে একটা রাস্তায় ওঠেন। সেই রাস্তা দিয়ে আনুমানিক ৪০ মিনিট যাওয়ার পর একটা সেতুতে সব গাড়ি থামার সংকেত দেওয়া হয়। তাঁরা সবাই সেতুর ওপরে গাড়ি থেকে নামেন। যখন তাঁরা সেতুর ওপরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন জিয়াউল তাঁদের বলেন, ‘এখানে এখন একটা সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে।’ এর পরপরই তিনি দেখতে পান, একটি গাড়ি থেকে নামিয়ে একজন লোককে হাত–মুখ বাঁধা অবস্থায় সেতুর রেলিংয়ের পাশে দাঁড় করানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি দেখেন, জিয়াউল সেই ব্যক্তির মাথায় গুলি করেন এবং তাঁকে রেলিংয়ের ওপর থেকে পানিতে ফেলে দেন।

পরে সেখান থেকে গাড়িতে করে আবার তাঁরা সামনের দিকে এগিয়ে যান উল্লেখ করে জবানবন্দিতে রফিকুল ইসলাম বলেন, চার থেকে পাঁচ মিনিট যাওয়ার পর আবার আরেকটি সেতুর ওপর তাঁদের গাড়িগুলো থামে। সেই সেতুতে আবার তাঁরা সবাই নেমে দাঁড়ান। এর দু–এক মিনিটের মধ্যেই আগের মতো হাত–চোখ বাঁধা অবস্থায় একজন ব্যক্তিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে সেতুর রেলিংয়ের কাছে আনা হয়। তখন জিয়াউল আহসান মেজর সাজ্জাদুলকে বলেন, ‘এখন আরও একটা সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে। সেটা তুমি করবে।’ সাজ্জাদুল তখন জানতে চান, ‘কে সন্ত্রাসী, কেন এই অপারেশন করব?’ জিয়াউল বলেন, ‘আমার নির্দেশ মোতাবেক কাজ করো।’ সাজ্জাদুল তখন অপারেশন করতে অপারগ বলে জানান।

এই অপারগতার কারণে সাজ্জাদুলকে ‘কাওয়ার্ড’, ‘স্টুপিড’ বলে গালমন্দ করেন জিয়াউল। সাজ্জাদুলকে জিয়াউল বলেন, ‘তুমি গিয়ে গাড়িতে বসো। আমি তোমার কেইসটা সেপারেটলি দেখব।’ মেজর সাজ্জাদুল গাড়িতে গিয়ে বসেন। তখন তাঁকে (রফিকুল) জিয়াউল বলেন, ‘সিও তুমি তোমার অফিসারের কাছে গিয়ে তাকে দেখো।’ জিয়াউলের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি হেঁটে গাড়ির উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। গাড়িতে ওঠার একটু আগে তিনি একটি গুলির শব্দ পান।

কিছুক্ষণ পর জিয়াউলের নির্দেশক্রমে আবার গাড়িগুলো সামনের দিকে এগোতে থাকে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ৮ থেকে ১০ মিনিট যাওয়ার পর রাস্তার বাঁ পাশে গাড়িগুলো আবার থামে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি দেখতে পান, তাঁর গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তার বাঁ পাশ থেকে ডান পাশে একজন ব্যক্তিকে চোখ–হাত বাঁধা অবস্থায় অন্য দুজন রাস্তা পার করে নিয়ে যাচ্ছেন। গাড়ি থেকে তাঁর কাছে রাস্তার ডান পাশ বাঁশঝাড় মনে হয়। এর কয়েক মিনিট পর তিনি একটি গুলির শব্দ শুনতে পান।

জবানবন্দিতে রফিকুল ইসলাম বলেন, জিয়াউলের নির্দেশে গাড়িগুলো সামনের দিকে রওনা হয়। চলতি পথে আরও দু–এক জায়গায় গাড়ি অল্প সময়ের জন্য থামে। তবে তখন তাঁর গাড়ি থেকে কেউ নামেননি। গাড়িতে এসে মেজর তরিকুল তাঁকে বলেন, ‘স্যার, জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে একজন ব্যক্তিকে মারতে বলেন, আমি মারি নাই। তবে স্যারের সঙ্গের দুজন ব্যক্তি ওই ব্যক্তিকে মারেন। তিনি (জিয়াউল আহসান) মেজর তরিকুলকে গালমন্দ করেন। পরে তাঁদের গাড়ি সামনে এগোয়। একপর্যায়ে তাঁদের চারজনকে বহন করা গাড়িটি ক্যান্টনমেন্টে যার যার বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। পরদিন অফিসে গিয়ে মেজর সাজ্জাদুলের সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তনের আদেশ পান তিনি।

পরে গণমাধ্যমে জানতে পারেন, গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুই থেকে তিনজন ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার হয় বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন রফিকুল ইসলাম।

এই মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান গ্রেপ্তার আছেন। জবানবন্দির সময় তিনি ট্রাইব্যুনালের এজলাসের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।