সরকারি সংস্থার দায় পায়নি কমিটি, তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী জাহাজটি ভাঙার জন্য নিরাপদ কি না, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল সরকারি সংস্থাগুলোর।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এই জাহাজ কাটার সময় ঘটে দুর্ঘটনাফাইল ছবি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে গ্যাস নিঃসরণে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় ইয়ার্ডমালিকের গাফিলতির বিষয়টি খুঁজে পেলেও সরকারি সংস্থাগুলোর তদারকিতে গাফিলতি পায়নি শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। যদিও সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী জাহাজটি ভাঙার জন্য নিরাপদ কি না, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল সরকারি সংস্থাগুলোর।

গত ১৪ আগস্ট দুর্ঘটনার দিন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে প্রধান করে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ দিনের তদন্ত শেষে গত সোমবার শিল্প মন্ত্রণালয়ে এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন
মৃত্যুর ঘটনায় ইয়ার্ডের মালিক ও অনুমোদন প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ না করা হলে যেকোনো তদন্ত প্রতিবেদনই কেবল আরেকটি কাগজে পরিণত হবে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, প্রধান নির্বাহী, বেলা

দুর্ঘটনাটি ঘটে জাহাজের ব্যালাস্ট ওয়াটারের ৩ নম্বর ট্যাংকে। ব্যালাস্ট ওয়াটার মূলত জাহাজের ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ট্যাংককে যে পানিতে পূর্ণ করে রাখা হয়। দ্য শিপব্রেকিং ও রিসাইক্লিং রুলস–২০১১–এর ধারা ৯–এর ১ উপধারা অনুযায়ী, জাহাজের শূন্য ট্যাংক, ডিবি ট্যাংক, ব্যালাস্ট ট্যাংক, উইং ট্যাংক, অয়েল ট্যাংক, স্লোপ ট্যাংক, পেট্রোলিয়াম কার্গো ট্যাংক পরীক্ষা করে দুই ধরনের সনদ দেবে বিস্ফোরক অধিদপ্তর। এ দুটি সনদ হলো সেফ ফর ম্যান এন্ট্রি (শ্রমিক প্রবেশের জন্য নিরাপদ) ও গ্যাস ফ্রি ফর হট ওয়ার্ক (জাহাজ ভাঙার জন্য নিরাপদ); কিন্তু ব্যালাস্ট ওয়াটার ট্যাংক পরিদর্শন ছাড়াই বিস্ফোরক অধিদপ্তর জাহাজটি ভাঙতে এ দুটি সনদ দিয়েছিল।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ১১ জুলাই জাহাজটি পরিদর্শন করেছিলেন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এস এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি সম্প্রতি রাজশাহী জেলায় বদলি হয়েছেন। দ্য শিপব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১ অনুযায়ী জাহাজের সব ধরনের ট্যাংক পরীক্ষা করার দায়িত্ব বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কি না, জানতে চাইলে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা শুধু কোনো ট্যাংক খালি হলে সেটা পরীক্ষা করে দেখতে পারি। ট্যাংক কোনো তরল পদার্থে পূর্ণ থাকলে সেটি আমাদের পক্ষে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না।’

আরও পড়ুন

তদন্ত প্রতিবেদনে দ্য শিপব্রেকিং অ্যান্ড শিপ রিসাইক্লিং রুলস–২০১১ অনুযায়ী ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের অবহেলার উল্লেখ করা হলেও একই বিধিমালা অনুযায়ী বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের গাফিলতি থাকলেও সেটা উল্লেখ করা হয়নি। শিপ রিসাইক্লিং বিধিমালা অনুযায়ী জাহাজ আমদানির অনুমতি থেকে ভাঙা, জাহাজ ক্ষতিকর ও বিষাক্ত বর্জ্যমুক্ত কি না, সেটা নিশ্চিত করা এবং ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্ব বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের।

কেন কোনো সরকারি সংস্থার দায় পাওয়া যায়নি জানতে তদন্ত কমিটির প্রধান এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনি ভালো করে দেখেন। এটা সাত-আট পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন। প্রতিবেদনের যেকোনো অংশে সরকারি সংস্থার দায় পাবেন।’ সুনির্দিষ্টভাবে কত নম্বর পৃষ্ঠা ও পয়েন্টে আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি পড়ে আমাকে আবার ফোন দেন।’ তদন্ত প্রতিবেদন পড়ে গতকাল সন্ধ্যায় বেনজামিন রিয়াজীকে ফোন করলে তিনি আর ফোন ধরেননি।

দ্য শিপব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১ অনুযায়ী জাহাজের সব ধরনের ট্যাংক পরীক্ষা করার দায়িত্ব বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কি না, জানতে চাইলে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা শুধু কোনো ট্যাংক খালি হলে সেটা পরীক্ষা করে দেখতে পারি। ট্যাংক কোনো তরল পদার্থে পূর্ণ থাকলে সেটি আমাদের পক্ষে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না।’

প্রতিবেদনে গাফিলতি নিয়ে যা বলা হয়েছে

প্রতিবেদনে নিরাপত্তাব্যবস্থা–সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণে ইয়ার্ডমালিকের ছয়টি গাফিলতি উঠে এসেছে। যেমন দুর্ঘটনার দিন জাহাজের ট্যাংক ছিদ্র করার সময় শ্রমিকদের কোনো গ্যাস মাস্ক ছিল না। যে শ্রমিকেরা ঘটনাস্থলে গেছেন, তাঁদের কারও মাস্ক ছিল না। ছুটির দিনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রমিকদের যুক্ত করা হলেও ইয়ার্ডে কোনো সেফটি ম্যানেজার, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক ও জরুরি উদ্ধার দল ছিল না।

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ইয়ার্ডে মজুত থাকলেও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় এসব ব্যবহার করা হয় না। দুর্ঘটনার পর পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসকে সময়মতো অবহিত করা হয়নি বলে তদন্তের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাহাজ আমদানির সময় প্রশিক্ষিত শ্রমিকের একটা তালিকা শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড থেকে অনুমোদন করাতে হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বলছে, ওই দিন ইয়ার্ডে নিহত পাঁচ শ্রমিকের মধ্যে মাত্র একজন বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত শ্রমিক ছিলেন।

প্রতিবেদনে কারিগরি নথি ও সনদ পর্যালোচনা অংশে জাহাজ আমদানি, বহির্নোঙরে পরিদর্শন, সৈকতায়ন ও বিভাজনের (ভাঙার) অনুমতিসংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া (বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে বলে মত দিয়ে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন

জাহাজভাঙা শিল্পকে শ্রমিক ও পরিবেশের জন্য নিরাপদ করতে সরকার পরিবেশ আইন-১৯৯৫ সালের অধীন ২০১১ সালে দ্য শিপব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১ প্রণয়ন করে। সেখানে সরকারি ১১টি সংস্থার কার কী করণীয়, সেটা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, দায়িত্বশীল সরকারি দপ্তর ও কর্মকর্তারা কোনো ধরনের যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই জাহাজ কাটার জন্য প্রয়োজনীয় সব সনদ দেওয়ার ঘটনায় তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে—এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল। একই সঙ্গে ইয়ার্ডের মালিককে গ্রেপ্তার করা উচিত ছিল। কারণ, এসব মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং ঘটনাটি অপরাধমূলক হত্যাকাণ্ডের পর্যায়ে পড়ে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রিজওয়ানা হাসান বলেন, মৃত্যুর ঘটনায় ইয়ার্ডের মালিক ও অনুমোদন প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ না করা হলে যেকোনো তদন্ত প্রতিবেদনই কেবল আরেকটি কাগজে পরিণত হবে।