পুলিশের বাজেট–কাঠামো সংস্কার, ৯৯৯ সেবার জনবলসংকট নিরসন, আইজিপির আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ভাতা পুনর্নির্ধারণ, পুলিশ হাসপাতালে জনবল বৃদ্ধিসহ বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা।
পুলিশ সপ্তাহ–২০২৬ উপলক্ষে মঙ্গলবার রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে দুই মন্ত্রী ও অর্থসচিবের সঙ্গে বৈঠকে এসব দাবি তুলে ধরেন তাঁরা। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে এ কথা জানিয়েছেন।
অতিরিক্ত ডিআইজি আতিয়া হুসনা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তিনটি প্রস্তাব দেন। প্রথমত, সিআইডি ও নৌ পুলিশের মতো বিভিন্ন ইউনিটের জন্য আলাদা ‘অফিস আইডি’ তৈরির দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, আইডি না থাকায় বাজেট বরাদ্দ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ২ লাখ ১৮ হাজার সদস্যের বিশাল বাহিনীর প্রশাসনিক কাজ গতিশীল করতে আইজিপির আর্থিক ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন তিনি। এ ছাড়া পুলিশ সুপার (এসপি) ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের পুরস্কার দেওয়ার আর্থিক ক্ষমতা বাড়ানোরও সুপারিশ করেন আতিয়া হুসনা।
৯৯৯ সেবা ও পুলিশ হাসপাতালে জনবল বাড়ানোর দাবি
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯–এর সক্ষমতা বাড়াতে এবং পুলিশ হাসপাতালের জনবলসংকট কাটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে দুটি প্রস্তাব দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মাহবুবুল করিম বলেন, ৯৯৯ সেবায় প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার কল আসছে। কিন্তু মাত্র ১৯৮ জন জনবল দিয়ে এই বিশাল কাজ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মাহবুবুল করিম জানান, ৯৯৯–এর জন্য নতুন করে ৩৫১ জন জনবল নিয়োগের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যা দ্রুত অনুমোদন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পুলিশ হাসপাতালের জনবলসংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় হাসপাতালের জন্য ৯২৪ জন এবং আঞ্চলিক পর্যায়ের জন্য আরও ৬২৯ জন জনবলের প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন। পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এসব প্রস্তাব দ্রুত অনুমোদনের অনুরোধ জানান এই কর্মকর্তা।
পুলিশের প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব
প্রশিক্ষণাধীন পুলিশ সদস্যদের খোরাকি ও প্রশিক্ষণ ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল ও অতিরিক্ত আইজিপি আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর ও প্রশিক্ষণার্থী কনস্টেবলরা দৈনিক ১৫-১৬ ঘণ্টা কঠোর শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করেন। বর্তমান বাজারদরে তাঁদের জন্য বরাদ্দ মাসিক পাঁচ হাজার টাকা খোরাকি ভাতায় পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কঠিন। আজিজুর রহমান এই খোরাকি ভাতা বাড়িয়ে ৭ হাজার ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এ ছাড়া ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টরদের প্রশিক্ষণ ভাতা ২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার এবং কনস্টেবলদের ১ হাজার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা করার দাবি জানান তিনি। অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, যথাযথ পুষ্টি ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে প্রশিক্ষণের মান এবং পুলিশের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা আরও বাড়বে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আবাসনসংকট নিরসনের দাবি
ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ ইউনিটগুলোর প্রধানদের জন্য সরকারি আবাসনের দাবি জানিয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক। গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের কাছে এই দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপারের জন্য বাসভবন থাকলেও ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজির কোনো স্থায়ী বাংলো নেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ডিআইজিকে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয় উল্লেখ করে রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, অনেক সময় বাসভবন থেকেই জরুরি প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কাজ সামলাতে হয়। তাই একটি স্থায়ী বাসভবন থাকা জরুরি। এ ছাড়া অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন), এসবি, সিআইডি, পিবিআই, এটিইউসহ ঢাকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের প্রধানদের জন্যও আলাদা সরকারি আবাসনের প্রস্তাব দেন তিনি।
অন্যদিকে বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান সাধারণ মানুষ ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের জন্য ‘সাক্ষী ভাতা’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই ভাতা চালু করলে আদালতে সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত হবে। এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের জন্য তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ জানান।
পুলিশের সুযোগ-সুবিধা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে: জনপ্রশাসনমন্ত্রী
বিগত চার দশকে পুলিশের কাজের পরিধি ও চাপ বহুগুণ বাড়লেও সে তুলনায় লজিস্টিক ও আবাসনসুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী আবদুল বারী। তিনি বলেন, বর্তমানে অপরাধের ধরন বহুমাত্রিক হওয়ায় এবং ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ বাড়ছে।
জনপ্রশাসনমন্ত্রী উল্লেখ করেন, পুলিশের অনেক ইউনিট এখনো পুরোনো অবকাঠামো ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে কাজ করছে। অতীতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও ধারাবাহিকতার অভাবে অনেক কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ধাপে ধাপে সমাধানের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
অর্থমন্ত্রী ও অর্থসচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আবদুল বারী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। তাই পুলিশের জরুরি ও দীর্ঘদিনের চাহিদাগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে বাস্তবসম্মত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আবাসনের আশ্বাস গৃহায়ণমন্ত্রীর
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁদের কর্মপরিবেশ ও আবাসন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। তিনি বলেন, অনেক থানা ভবন ও কর্মকর্তাদের বাসস্থান জরাজীর্ণ ও অনুপযুক্ত।
মন্ত্রী নিজের এলাকার একটি থানার জরাজীর্ণ অবস্থা ও ওসির বাসভবনের উদাহরণ টেনে বলেন, যাঁরা দিনরাত সেবা দিচ্ছেন, তাঁদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক বাসস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। এই সংকট দূর করতে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট সহযোগিতা চান।
গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী আশ্বাস দেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আবাসন উন্নয়নে তাঁর মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। সরকারি বাসস্থানের সংকট মেটাতে নতুন আধুনিক ও টেকসই প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।