তোফাজ্জলকে পিটিয়ে হত্যা: ২৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ, ২২ জনের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

তোফাজ্জল হোসেনছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় ২৮ জনের বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া সম্পূরক চার্জশিট গ্রহণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে পলাতক থাকা ২২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিরও আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক জিন্নাত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, পুলিশের দেওয়া সম্পূরক চার্জশিট আদালত আমলে নিয়েছেন। পরে মামলাটি বিচারের জন্য বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হান্নানুল ইসলাম ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সম্পূরক চার্জশিট জমা দেন। আজ ওই চার্জশিট গ্রহণযোগ্যতা শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল।

চার্জশিটে ২৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন—পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জালাল মিয়া (২৬), মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সুমন মিয়া (২১), পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ (২৪), ভূগোল বিভাগের আল হোসেন সাজ্জাদ (২৩) এবং ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ (২৪), ওয়াজিবুল আলম (২২), মো. ফিরোজ কবির (২৩), মো. আবদুস সামাদ (২৪), মো. সাকিব রায়হান (২২), মো. ইয়াছিন আলী গাইন (২১), মো. ইয়ামুজ্জামান ওরফে ইয়াম (২২), মো. ফজলে রাব্বি (২৪), শাহরিয়ার কবির শোভন (২৪), মো. মেহেদী হাসান ইমরান (২৫), মো. রাতুল হাসান (২০), মো. সুলতান মিয়া (২৪), মো. নাসির উদ্দীন (২৩), মো. মোবাশ্বের বিল্লাহ (২৫), শিশির আহমেদ (২২), মো. মহসিন উদ্দিন ওরফে শাফি (২৩), আবদুল্লাহিল কাফি (২১), শেখ রমজান আলী রকি (২৫), মো. রাশেদ কামাল অনিক (২৩), মো. মনিরুজ্জামান সোহাগ (২৪), মো. আবু রায়হান (২৩), রেদোয়ানুর রহমান পারভেজ (২৪), রাব্বিকুল রিয়াদ (২৩) ও মো. আশরাফ আলী মুন্সী (২৬)।

এসব আসামির মধ্যে আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ ও ওয়াজিবুল আলম জামিনে আছেন। জালাল মিয়া, আল হোসেন সাজ্জাদ, মোত্তাকিন সাকিন শাহ ও সুমন মিয়া গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। বাকি ২২ জন পলাতক থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হান্নানুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে আগে অব্যাহতি পাওয়া আটজনের বিরুদ্ধেও পুনরায় তদন্ত করা হয়। গত ১৭ ডিসেম্বর আগের তদন্তে অভিযুক্ত ২১ জনসহ মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তাঁদের বাইরে আর কাউকে জড়িত পাওয়া যায়নি।

এর আগে গত বছরের ১ জানুয়ারি তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার পুলিশ পরিদর্শক আসাদুজ্জামান ২১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেন। তবে অন্য আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নাম আসা আটজনকে অব্যাহতি দেওয়ায় বাদীপক্ষ নারাজি আবেদন করেন। আদালত ওই আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।

সম্পূরক চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার দিন রাত ৭টা ৪০ মিনিট ১০ সেকেন্ডে তোফাজ্জল হলের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। তিন মিনিট ১৮ সেকেন্ড পর তিনি হলের মাঠে যান। খেলার মাঠে বসার ৫৭ সেকেন্ড পরই তাঁকে চোর সন্দেহে মারধর শুরু করেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। পরে উত্তেজিত ছাত্ররা তাঁকে হলের মূল ভবনের দিকে নিয়ে যান। প্রায় ২৫ মিনিট জেরা ও মারধরের পর একদল ছাত্র বুঝতে পারেন, মুঠোফোন চুরির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। এরপর তাঁকে হলের ক্যানটিনে খাওয়ানো হয়।

তবে খাওয়ানোর পর আবারও তাঁকে মারধর করা হয়। শিক্ষকেরা এসে তাঁকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলে প্রথমে ব্যর্থ হন। পরে রাত ১০টা ৫২ মিনিটে তোফাজ্জলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৮টার দিকে এক যুবককে ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থী আটক করেন। তাঁরা তাঁকে প্রথমে হলের গেস্ট রুমে নিয়ে মুঠোফোন চুরির অভিযোগে মারধর করেন। পরে তাঁকে মানসিক রোগী মনে করে ক্যানটিনে খাওয়ানো হয়।

এজাহার অনুযায়ী, পরে তাঁকে দক্ষিণ ভবনের গেস্টরুমে নিয়ে জানালার সঙ্গে হাত বেঁধে স্ট্যাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে আবার মারধর করা হয়। এতে তাঁর মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর নিহত ব্যক্তির ফুফাতো বোন মোসাম্মৎ আসমা আক্তার ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ মাসুমসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে আরেকটি মামলার আবেদন করেন। আদালত সেদিন বাদীর জবানবন্দি নিয়ে উভয় মামলার তদন্ত একসঙ্গে করার নির্দেশ দেন।