‘প্রতিবার মনে হইত, এইডাই বুঝি শেষ খাওয়া’
‘প্রতিবার ভাত খাইতে বইসা মনে হইত এইডাই বুঝি শেষ খাওয়া। পরের দিনেই বুঝি আমার মউত। রাইতে ঘুমাইতে পারতাম না। চক্ষু বন্ধ করলে মনে হইত মাথার উপরে ফাঁসির দড়ি ঝুলতেছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন শেখ জাহিদ। মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে ২০ বছর কারাগারের কনডেমড সেলে কাটিয়ে বেকসুর খালাস পেয়েছেন তিনি।
দিনের পর দিন মৃত্যুর আতঙ্ক, নির্যাতন সহ্য করে তিনি যখন কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব। মা–বাবা মারা গেছেন। তাঁদের শেষ দেখাও দেখতে পারেননি। শেখ জাহিদের বাড়ি খুলনা শহরের বাগমারা এলাকায়।
রংপুরের গঙ্গাচড়ার মাজেদা বেগম বললেন, ‘১৩ মাসের ছেলে কোলে নিয়ে ফাঁসির রায় শুনলাম। জেলখানায় থাকি থাকি আমার বেরেনটা (ব্রেন) আলগা হয়ে গেছে।’ মাজেদা বেগম কোলের ছেলেকে নিয়ে কনডেমড সেলে ঢুকেছিলেন। খেতে পারতেন না। ঘুমাতে পারতেন না। তাঁর বেশ খানিকটা স্মৃতিভ্রষ্ট হয়েছে। অনেক কথা আর মনে থাকে না। তাঁর ভাষায় ‘বেরেন আলগা’। লাখ লাখ টাকা গেছে পুলিশ আর আদালতে।
শেখ জাহিদ আর মাজেদা বেগমই কেবল নন, তাঁদের মতো মৃত্যুদণ্ড থেকে ফিরে আসা রাজশাহীর সোনারুদ্দি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলমগীর হোসেনও তাঁদের জীবনের দুর্বিষহ দিনগুলোর মর্মস্পর্শী গল্প শোনালেন বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনকক্ষে। এখানে ৮ জুন থেকে শুরু হয়েছে আইনি লড়াই করে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে ফিরে আসা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষদের জীবনকাহিনি নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা’।
আলোকচিত্রী মোশফিকুর রহমান ২০২২ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মৃত্যুদণ্ড থেকে ফিরে আসা ১৩টি পরিবারকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁদের জীবনযাত্রা তুলে এনেছেন ক্যামেরায়। এসব পরিবারের শতাধিক ছবি নিয়েই এ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর ছবিগুলো কেবল কয়েকজন মানুষের মুক্তির গল্প নয়; এতে আছে বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, মিথ্যা মামলা, পুলিশি নির্যাতন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মৃত্যুভয়ের মধ্যে বছরের পর বছর বেঁচে থাকার নির্মম বাস্তবতার গল্প।
প্রদর্শনীর কিউরেটর আলোকচিত্রী হাদি উদ্দিন। এতে সহায়তা দিয়েছে ব্লাস্ট ও দ্য ডেথ পেনালটি প্রজেক্ট। প্রদর্শনী চলবে ১৫ জুন পর্যন্ত।
আইন সংস্কার করতে হবে
প্রদর্শনী উপলক্ষে গতকাল বিকেলে ব্লাস্ট ও দ্য ডেথ পেনাল্টি প্রজেক্ট ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা এবং আইনবিদ ও মানবাধিকারকর্মীদের নিয়ে একটি আলোচনার আয়োজন করে নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনকক্ষে। সেখানে মৃত্যুদণ্ড থেকে ফিরে আসা শেখ জাহিদ, মাজেদা বেগম, সোনারুদ্দি ও আনোয়ার হোসেন তাঁদের ওপর পুলিশি নির্যাতন, স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা, ঘুষ, দালাল ও আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে নিঃস্ব হয়ে পড়ার পাশাপাশি অন্ধকার কনডেমড সেলে থাকার হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
পরে আলোচকেরা বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারে কনডেমড সেলে থাকতে হচ্ছে। সেখানের পরিবেশ অমানবিক। আইনের সংশোধন করা ও নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আইন করার প্রয়োজনীয়তাও তাঁরা তুলে ধরেন। আলোচকেরা বলেন, অধস্তন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও উচ্চ আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময় আসামিকে কমডেমড সেলে রাখা হয়। ভারতসহ অনেক দেশই আইন সংশোধন করেছে। এতে করে আসামিকে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে কমডেমড সেলে রাখা হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন আলোকচিত্রী মোশফিকুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান শিরিন পারভিন হক, দ্য ডেথ পেনাল্টি প্রজেক্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা সল লেয়ারফ্রেন্ড, যুক্তরাজ্যের মানসিক স্বাস্থ্য ট্রাইব্যুনালের বিচারক নজরুল খসরু, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, কাজী জাহেদ ইকবাল, ব্লাস্টের উপপরিচালক রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ।
শিশুকে কোলে নিয়ে শোনেন মৃত্যুর রায়
রংপুরের গঙ্গাচড়ার দরিদ্র গৃহবধূ মাজেদা বেগম বলেন তাঁর হৃদয়বিদারক গল্প। তিনি এসেছিলেন তাঁর স্বামী সাজু মিয়া, ছেলে মারুফ হোসেন ও মেয়ে মারুফাকে নিয়ে।
২০০৭ সালে একই গ্রামের এক শিশুকে হত্যার ঘটনায় কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাজেদা বলেন, পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে গিয়ে ভয়ানক নির্যাতন করে। এমনকি তাঁর শিশুসন্তানকে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়। শেষ পর্যন্ত জোর করে স্বীকারোক্তিতে সই করানো হয়। তিনি দুই বছর হাজতে ছিলেন। এরপর ২০১৫ সালে সেই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড হয়। রায়ের দিন মাত্র ১৩ মাস বয়সী ছেলে মারুফকে কোলে নিয়ে আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন মাজেদা। এরপর তাঁর ঠিকানা হয় কনডেমড সেল। সব মিলিয়ে দীর্ঘ আট বছর ধরে মৃত্যুভয়ের মধ্যে দিন কাটাতে কাটাতে কারাগারের ভেতরেই ছেলেকে বড় করেছেন। মাজেদা বলছিলেন, কারাগারে থাকার সময় তাঁর ছেলে খেতে পারত না। ফলে ওর বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা হয়েছে। তাঁর নিজের মতো ছেলেরও ‘মাথা আলগা’ হয়ে গেছে। ছেলেও ভালো করে কিছু মনে রাখতে পারে না।
মাজেদার স্বামী সাজু মিয়া জানান, তিনি রিকশাভ্যান চালান। তাঁর ৭ শতাংশ ভিটামাটি ছিল। মামলা চালাতে গিয়ে ৫ শতাংশ বিক্রি করে দিয়েছেন। মাজেদার শরীর প্রায় ভেঙে পড়েছে। তেমন কিছু করতে পারেন না। খুবই কষ্ট করে তাঁদের দিন যাচ্ছে।
‘মনে হইত এইটাই শেষ খাওয়া’
দীর্ঘ দুই দশক কনডেমড সেলে কাটিয়ে বেরিয়ে আসা জাহিদ বলেন, ‘যখন কাউকে ফাঁসির জন্য নিত, প্রতিবার মনে হইত—আমারেও এই ভাবে নেবে।’ তিনি ছিলেন খুলনা, যশোর, বরিশালসহ বিভিন্ন কারাগারের কনডেমড সেলে। ১৯৯৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী ও ২ মাসের মেয়ের শ্বাসরোধে মৃত্যু হয়েছিল স্ত্রীর বাবার বাড়িতে। তিনি তখন খুলনাতেই ছিলেন না। ২০০০ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে ২০২০ সালে কনডেমড সেল থেকে বের হন। এই ২০ বছরে তিনি হারিয়েছেন মা–বাবাকে। তাঁদের জানাজায় অংশ নেওয়ার অনুমতিও পাননি। আগে একটি হার্ডওয়্যারের দোকান ছিল। এখন নিঃস্ব। একটি দোকানে দিনমজুরিতে কাজ করেন। তিনি বলছিলেন, শুধু তাঁর জীবন থেকেই ২০টি বছর হারিয়ে যায়নি, তাঁর পৃথিবীটাই বদলে গেছে।
প্রতিদিন একবার করে মৃত্যু!
প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া প্রায় প্রত্যেকের বয়ানেই ফিরে আসে একই বাক্য, ‘প্রতিদিন যেন একবার করে মৃত্যু হয়েছে।’ রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সোনারুদ্দি ১৪ বছর কনডেমড সেলে ছিলেন। প্রথম দিন জানালাবিহীন ছোট ঘর দেখে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমার যেদিন ফাঁসির রায় দিল, তারপর তো কনডেমড সেলে রাখতে গেল। আমি সেলের ভেতরে ঢুকেই কান্না করতে লাগলাম। কোনো জানালা নাই, শুধু দরজা। এই ঘরে কেমনে থাকব!’
সোনারুদ্দি জানান, তাঁদের গ্রামে ২০০৮ সালে একটি হত্যাকাণ্ড হয়েছিল। সেই মামলায় ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে তাঁকে পুলিশ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। প্রচণ্ড মারধর করা হয়েছিল তাঁকে। স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়। পুলিশ, দালাল, মামলা মিলিয়ে ২০ লাখের বেশি টাকা খরচ হয়েছে। দেড় বিঘা জমি বিক্রি করতে হয়েছে। এখন থাকেন রেলওয়ের জায়গায় ঘর তুলে। খালাস পেয়েছেন ২০১৩ সালে কাশিমপুর কারাগার থেকে। কেমন মনে হয়েছিল জানতে চাইলে বললেন, ‘জেলে থাকতে আল্লার কাছে প্রতিরাতে মনের দুঃখে কান্দন করছি; আর বাইরে এসে ভালো লাগায় অনেক কান্দন আসছিল।’
‘আসমানের তারা যে এত সুন্দর, আগে বুঝিনি’
‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজমিস্ত্রি আলমগীর হোসেন বলেন, ‘যেদিন ছাড়া পাইলাম সেই রাতে আসমানের দিকে তাকাইয়া দেখি, তারায় ঝলমল করতেছে। আসমানের তারা যে এত সুন্দর, আগে কোনো দিন বুঝিনি।’ তিনি যখন কারাগারে যান, তখন তাঁর বয়স ছিল ১৯ বছর। মোট ৯ বছর তিনি কারাগারে ছিলেন। তাঁদের গ্রামে ২০১৪ সালে এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। তিনি যে মিস্ত্রিদের সঙ্গে তখন জোগালির কাজ করতেন, তাঁদের নামে মামলা হয়েছিল। তাঁকেও প্রথমে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়।
আলমগীর বলেন, থানায় অনেক মারধর করা হয়েছিল। এমনি হাত-পা বেঁধে নাকে পানি ঢালা হয়েছিল। তাঁকে দিয়ে লিখিত স্বীকারোক্তিতে সই করিয়ে নেওয়া হয়। জজকোর্ট মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ২০১৭ সালে। তারপর থেকে ছয় বছর ছিলেন কনডেমড সেলে। হাইকোর্ট থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন ২০২৩ সালে। মোট ৯ বছর ছিলেন বন্দী। বহু টাকা খরচ হয়েছে। ঋণ আছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। এখন যা আয় করেন, তার একটা অংশ যায় সেই ঋণ শোধ করতে।
প্রদর্শনীতে আরও রয়েছে মৃত্যুদণ্ড থেকে ফিরে আসা আনোয়ার হোসেন, ইসমাইল হোসেন, আবদুর রহিম, সানাউল্লাহ, আউয়াল হোসাইন, মোহাম্মদ নাসির, আবদুল হাই, গোলাম আজম ও মোহাম্মদ হারুনের ছবি।
মৃত্যুদণ্ড থেকে ফিরে এলেও এই মানুষেরা এখনো তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। অনেকে এখনো মানসিকভাবে ভয়–আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। অনেকে রাতে ঘুমাতে গেলে কেউ কেউ মনে করেন, এখনো সেই সেলে আছেন। স্বপ্নে ফিরে আসে অন্ধকার ঘর, মৃত্যুভয়। শেখ জাহিদের মতো কেউ কেউ কোনো কাজ পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় জীবনটা যেন তাঁদের থমকে গেছে।