১১ বছর ধরে জামদানি শাড়ি বুনেছেন, ৬০ বছর বয়সে প্রথম পরলেন

কালচে খয়েরি রঙের জমিনে গোলাপি, কমলা ও সিলভারের নকশা করা শাড়ি পরেছেন মাসুদা। সঙ্গে তাঁর তিন ছেলেছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসী গ্রামের মাসুদা। জীবনের ১১টি বছর স্বামী ও ছেলেদের সঙ্গে জামদানি শাড়ি বুনেছেন। কত শাড়ি বুনেছেন তার হিসাব রাখেননি। নিজের বানানো শাড়িগুলো পরতে ইচ্ছা করত। কিন্তু স্বামী, ৮ ছেলেমেয়ের মুখে কীভাবে খাবার তুলে দেবেন, সে চিন্তাতেই অস্থির থাকতে হতো।

সেই মাসুদার দিন পাল্টেছে। এখন তিনি আর তাঁর স্বামী তাওলাত প্রধান জামদানি বোনেন না। চার ছেলেই জামদানি বোনেন, সংসারের হাল ধরেছেন। শুধু তা–ই নয়, ছেলেরা মাসুদাকে জামদানি শাড়ি পরিয়েছেন। প্রায় ৬০ বছরের জীবনে প্রথম জামদানি শাড়ি পরা। সেই দামি শাড়ি পরে মাসুদা তাঁর ছেলে ইয়াকুবের ‘ইয়াকুব জামদানী হাউজ’–এর শোরুমও উদ্বোধন করেছেন। নিজের বাড়িতেই এ শোরুম করেছেন ইয়াকুব প্রধান। 

গত শনিবার মুঠোফোনে কথা হয় মাসুদার সঙ্গে। মস্তিষ্কে টিউমারের অস্ত্রোপচারের জন্য কথা বলতে একটু কষ্ট হয় তাঁর। তারপরও মোবাইলে মাসুদার কণ্ঠে খুশির আমেজ পাওয়া যাচ্ছিল। নিজে জামদানি বুনেছেন, তাই শাড়িটা যে দামি এবং খুব সুন্দর, তা নিয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই তাঁর। জানালেন, এই শাড়ি পরার পর তাঁর স্বামী খুশি হয়ে দুই হাজার টাকা সালামি দিয়েছেন। 

ছেলেরা শাড়ি দিয়েছেন, কেমন লাগছে জানতে চাইলে মাসুদা বলেন, ‘অনেক খুশি হইছি। অনেক আনন্দ লাগছে। খুব পছন্দ হইছে। এই শাড়ি আলগা (খুব যত্ন করে) করে পরন লাগব। এই শাড়ি পইরা পুলাপান কুলে নেওন যাইব না। পানিও লাগান যাইব না। আলমারিতে তুইল্যা রাখমু। আবার কোনো বড় অনুষ্ঠান হইলে পরমু।’ 

গত শুক্রবার ইয়াকুব জামদানী হাউজ নামের ফেসবুক পেজ থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এতে বাংলা লেখায় বাক্য গঠনে কিছু সমস্যা আছে। তাতে কী? এ পোস্টেই গতকাল রোববার পর্যন্ত সাড়ে ৭ হাজার রিঅ্যাকশন ছিল। পোস্টে ইয়াকুব প্রধান জানিয়েছেন, তাঁর মা নিজে জামদানি শাড়ি বুনতেন, শাড়ি খুব পছন্দও করতেন। তবে কখনো নিজে এ শাড়ি পরতে চাইতেন না। সেই মাকেই একটি জামদানি শাড়ি কিনে দিয়েছেন তিনি। মাকে শাড়ি কিনে দিতে পারা তাঁর জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ খুশির দিন। এই জীবনে তাঁর আর তেমন কিছু চাওয়ার নেই। ভালো থাকুক পৃথিবীর সবার বাবা-মা, এটাই ইয়াকুবের চাওয়া। 

কথা হয় ইয়াকুব প্রধানের সঙ্গে। জানালেন, শাড়িটি চিকন সুতা দিয়ে বোনা। রেশম হাফসিল্কের শাড়িটি সুরমা দামি নকশার। তাঁর এক আত্মীয়ের বানানো শাড়িটি মায়ের জন্য কিনেছেন। মাকে দামি একটি শাড়ি দেবেন এ স্বপ্ন ছিল অনেক দিনের। স্বপ্নটি পূরণ হলো। তবে মায়ের শাড়িটি ফেসবুকে এত মানুষ পছন্দ করবেন তা বুঝতে পারেননি। এই শাড়ি অনেকে কিনতে চাইছেন। তাই আরেকটি ভিডিও পোস্ট করে তাতে ইয়াকুব বলেছেন, ‘এটা আমার মায়ের শাড়ি, কোটি টাকা দিলেও এটি বিক্রি হবে না। কেউ চাইলে প্রি–অর্ডার করতে পারবেন।’

ইয়াকুব জানালেন, জামদানি শাড়ি বিক্রি করেই ঢাকায় নিয়ে মায়ের ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচার করাতে পেরেছেন। এক সংসারে চার ভাই, বাবা, মা থাকেন। চার বোনের বিয়ে হয়েছে। জামদানি বানানো ও সংসারের সবার সব খরচ বাদ দিয়ে মাস শেষে যা থাকে, তা ভালোই। ইয়াকুব এসএসসি পরীক্ষা দেননি। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনিই একটু পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। জানালেন, তাঁর দাদার বাবা থেকে শুরু করে পৈতৃকভাবেই জামদানির ব্যবসা তাঁদের। এলাকা, বংশ সবই জামদানিকেন্দ্রিক। তিনি আগে পাইকারিভাবে জামদানি শাড়ি বিক্রি করতেন। দুই বছর ধরে অনলাইনে বিক্রি করছেন। ফেসবুকে পেজটিতে ভালো সাড়া পাচ্ছেন। 

মায়ের শাড়ি প্রসঙ্গে ইয়াকুব বললেন, ‘মা শাড়িটি পরার পর খুব ভালো লাগছে। ঢাকায় কোনো দিন শোরুম দিতে পারলে মারে আরও দামি শাড়ি পরায়ে মারে দিয়া তা উদ্বোধন করামু। মা সারা জীবনই অনেক কষ্ট করছে।’