‘নোয়াখালী সরকারি হাসপাতালে টাকা না দেওয়ায় এক মাকে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে পেটের ব্যথায় রাস্তায় সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি’—এমন দাবিতে দুটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ছবিগুলোকে বাংলাদেশের নোয়াখালীর ঘটনা হিসেবে প্রচার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগও তোলা হচ্ছে।
তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ছবি দুটি নোয়াখালীর কোনো ঘটনার নয়। ঘটনাটি নেপালের সপ্তরী জেলার রাজবিরাজের। ১০ সেপ্টেম্বর সেখানে গজেন্দ্র নারায়ণ সিংহ হাসপাতালের বাইরে ফুটপাতে এক নারী সন্তান প্রসব করেন।
নোয়াখালীর ঘটনা দাবি করে ছড়ায় ছবি
ভাইরাল দুটি ছবির একটিতে দেখা যায়, এক গর্ভবতী নারী ফুটপাত দিয়ে হেঁটে আসছেন। অন্য ছবিতে ফুটপাতে পড়ে থাকা এক নারীর দিকে একজন নারী ও একজন পুরুষকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়।
৫৪ হাজারের বেশি ফলোয়ার থাকা ‘মানিক চৌধুরী’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ছবিগুলো নোয়াখালীর ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘নোয়াখালী সরকারি হাসপাতাল থেকে একজন মাকে টাকা না দেওয়ার কারণে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত পেটের ব্যথায় রাস্তায় বাচ্চা জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছেন—এটি শুধু একটি পরিবারের দুঃখ নয়, আমাদের স্বাস্থ্যসেবার মানহীনতা এবং মানবতার ওপর একটি গুরুতর প্রশ্ন!’
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটিতে ১৫ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া, ১ হাজারের বেশি মন্তব্য এবং ২ হাজার শেয়ার হয়েছে।
ছবি ও ক্যাপশনে ঘটনাটিকে নোয়াখালীর ঘটনা ধরে নিয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সাইফুল আলম নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, ‘মানবিকতা কোথায়? হাসপাতালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোথায়? চরম পর্যায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে, এর জবাব কে দেবে?’
হুমায়ন কবীর সেলিম নামের আরেকজন লেখেন, ‘ভাই এই দেশে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কোনো দাম নেই। এই দেশে মানবতা বলতে কিছুই নাই।’
নোয়াখালীর ঘটনা ধরে নিয়ে পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শুধু ফেসবুকেই ৫০টির বেশি পেজ ও প্রোফাইল থেকে ঘটনাটিকে বাংলাদেশের ঘটনা হিসেবে প্রচার করতে দেখা গেছে।
ঘটনাটি আসলে কোথাকার
ছড়িয়ে পড়া দাবিটি যাচাই করতে প্রথমে ভাইরাল দুটি ছবির রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। যাচাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিগুলোর হুবহু পাওয়া যায়।
ছবি দুটি পোস্ট করে লেখা রয়েছে ‘ফি নিয়ে বিরোধের পর নেপালের হাসপাতালের বাইরে ফুটপাতে সন্তান প্রসব নারীর’। সেখানে বলা হয়েছে, নেপালের রাজবিরাজে নির্ধারিত পরীক্ষার খরচ জোগাতে পরিবারের হিমশিম খাওয়ার পর এক নারী হাসপাতালের বাইরে ফুটপাতে সন্তান প্রসব করেছেন।
ইনস্টাগ্রাম, এক্স ও ফেসবুকেও একই ছবি পাওয়া যায়। এসব পোস্টের বর্ণনায় ঘটনাটিকে নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড দিয়ে অনুসন্ধানেও ভাইরাল ছবিগুলো সম্পর্কে নেপালের একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
এর মধ্যে কাঠমান্ডু পোস্টে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায় এই শিরোনামে ‘রক্ত পরীক্ষার টাকা জোগাড় করতে না পেরে হাসপাতালের বাইরে সন্তান প্রসব’।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী,৩ ০ বছর বয়সী ববিতা কুমারী পাসওয়ান ৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে প্রসবব্যথা নিয়ে গজেন্দ্র নারায়ণ সিংহ হাসপাতালে যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বামী হরেরাম পাসওয়ান ও এক প্রতিবেশী।
হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ববিতার রক্ত পরীক্ষা করানোর জন্য একটি স্লিপ দেওয়া হয়। তাঁর স্বামী হরেরামের দাবি, পরীক্ষাগুলোর জন্য প্রায় ৩ হাজার ২০০ নেপালি রুপি প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁর কাছে ছিল মাত্র ২ হাজার রুপি। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের কাছ থেকে বাকি টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি।
এরপর রাত দুইটার দিকে দম্পতি হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন। ভোর সাড়ে চারটার দিকে ববিতার প্রসবব্যথা তীব্র হলে কয়েকজন নারী তাঁকে সহযোগিতা করেন। পরে রাস্তার পাশের নালার ওপর ফুটপাতে তিনি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয় মা-শিশুকে
ফুটপাতে সন্তান প্রসবের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ববিতা ও তাঁর নবজাতককে অ্যাম্বুলেন্সে করে আবার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, সেখানে তাঁদের বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, মা ও নবজাতক দুজনের অবস্থাই স্বাভাবিক ছিল।
ঘটনাটি নিয়ে তদন্তও শুরু হয়েছে। নেপালের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় এবং নেপাল মেডিক্যাল কাউন্সিল পৃথক তদন্ত দল পাঠিয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ঘটনার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।