ফুসফুস ক্যানসার: যেসব স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বাড়তে পারে জীবনের ঝুঁকি

এসকেএফ অনকোলজির আয়োজনে ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা বৃহস্পতিবার (৭ মে) অনুষ্ঠিত হয়ছবি: প্রথম আলো

ক্যানসার শব্দটি শুনলে আজও জনমনে যে ভীতির সঞ্চার হয়, তার ইতিহাস প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস এই রোগের নাম দিয়েছিলেন ‘কার্সিনোস’ বা কাঁকড়া। কারণ, এটি শরীরের ভেতর কাঁকড়ার মতোই শক্ত কামড় দিয়ে ধরে থাকে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষে সেই প্রাচীন ভীতি কাটিয়ে বর্তমানে ফুসফুস ক্যানসারের মতো মরণব্যাধিও প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত হলে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।

ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিয়ে আলোচনায় এ কথা বলেন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শেখ গোলাম মোস্তফা। তিনি এসকেএফ অনকোলজি আয়োজিত ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক বিশেষ অনলাইন আলোচনায় অংশ নেন। নাসিহা তাহসিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি গত বৃহস্পতিবার সরাসরি প্রচারিত হয় প্রথম আলো ও এসকেএফ অনকোলজির ফেসবুক পেজে।

পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ক্যানসার কেন বেশি

বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ক্যানসারের হার বেশি হওয়ার প্রধান কারণ তামাক ও ধূমপানের উচ্চ প্রবণতা। অধ্যাপক শেখ গোলাম মোস্তফা জানান, পুরুষেরা সাধারণত কর্মজীবী হওয়ায় বিভিন্ন মিল–কারখানায় কাজ করেন, যেখানে তামাক, অ্যাসবেস্টস, নিকেল বা রাসায়নিকের ধোঁয়া সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে। তবে কেবল পুরুষ নয়, নারীদের মধ্যেও পরোক্ষ ধূমপান বা ‘প্যাসিভ স্মোকিং’–এর কারণে এই ক্যানসার হতে পারে।

ধূমপান না করলেও কি ক্যানসার হতে পারে

অনেকের ধারণা, কেবল ধূমপায়ী ব্যক্তিদেরই ফুসফুস ক্যানসার হয়, যা সঠিক নয়। অধ্যাপক শেখ গোলাম মোস্তফা জানান, প্রায় ১০ শতাংশ ফুসফুস ক্যানসারের রোগী কখনোই ধূমপান করেননি। মূলত ক্যানসারের কারণকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—জেনেটিক বা বংশগত এবং এনভায়রনমেন্টাল বা পরিবেশগত। আমাদের শরীরে কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রণকারী দুটি জিন থাকে—একটি ক্যানসার প্রতিরোধ করে এবং অন্যটি কোষ বিভাজনে সহায়তা করে। এই দুই জিনের ভারসাম্য নষ্ট হলে বা বংশগত ত্রুটি থাকলে ধূমপান না করা সত্ত্বেও যে কেউ ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারেন।

ফুসফুস ক্যানসারের লক্ষণ ও রোগনির্ণয়

দীর্ঘদিন কাশি বা কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া ফুসফুস ক্যানসারের প্রধান লক্ষণ হতে পারে, তবে এটিই চূড়ান্ত নয়। যক্ষ্মা বা ব্রঙ্কাইটিসের কারণেও রক্ত যেতে পারে। ফুসফুস ক্যানসারের ক্ষেত্রে সাধারণত শুকনা কাশি, বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। রোগনির্ণয়ের জন্য বর্তমানে লো–ডোজ সিটি স্ক্যান ও এফএনএসি পরীক্ষা অত্যন্ত কার্যকর। এ ছাড়া আধুনিক ব্রঙ্কোস্কোপির মাধ্যমে ফুসফুসের ভেতরে কোনো টিউমার থাকলে তার টিস্যু সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।

শিল্পকারখানা ও পরিবেশগত ঝুঁকি

বায়ুদূষণ ও কলকারখানার রাসায়নিক ধোঁয়া ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে। যাঁরা অ্যাসবেস্টস, নিকেল, আলকাতরা বা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন, তাঁদের শরীরে নিশ্বাসের মাধ্যমে কার্সিনোজেন প্রবেশ করে। এই ক্ষতিকর কণাগুলো কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন ঘটায়, যা টিউমার বা ক্যানসারে রূপ নেয়। এমনকি টিউবওয়েলের পানিতে থাকা আর্সেনিকও ফুসফুস ও ত্বকের ক্যানসারের জন্য দায়ী হতে পারে।

পেশাগত ঝুঁকি

পেশাগত কারণে যাঁরা আলকাতরা, আর্সেনিক বা অ্যাসবেস্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন, তাঁদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন অধ্যাপক শেখ গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, এসব রাসায়নিক যেন শরীরের ভেতরে ঢুকতে না পারে, সেদিকে সচেতন থাকতে হবে। এ ছাড়া তিনি নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি জানান, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও আধুনিক স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। এই ক্যানসার থেকে শতভাগ মুক্তি পেতে ৯ থেকে ১৩ বছর বয়সী মেয়েশিশুদের টিকার তিনটি ডোজ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এই ভ্যাকসিন শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে কাজ করে।

অনলাইন আলোচনায় ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিয়ে পরামর্শ দেন অধ্যাপক শেখ গোলাম মোস্তফা
ছবি: প্রথম আলো

আধুনিক চিকিৎসা ও নিরাময়ের সম্ভাবনা

অধ্যাপক শেখ গোলাম মোস্তফা জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে (স্টেজ–১) ধরা পড়লে ফুসফুস ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। টিউমার ছোট থাকলে সার্জারির মাধ্যমে আক্রান্ত অংশ ফেলে দিয়ে সুস্থ হওয়া সম্ভব, যার সাফল্যের হার ৯০ শতাংশের বেশি। যাঁরা সার্জারির জন্য উপযুক্ত নন, তাঁদের ক্ষেত্রে উন্নত কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ‘টার্গেটেড থেরাপি’ ও ‘ইমিউনোথেরাপি’র মতো আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে, যা সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টিকারী জিনের ওপর কাজ করে।

ধূমপান ছাড়ার সুফল ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পর ঝুঁকি কমতে কত সময় লাগে, এ বিষয়ে অধ্যাপক শেখ গোলাম মোস্তফা জানান, ধূমপান ছাড়ার পাঁচ বছরের মধ্যে ঝুঁকি ৫০ শতাংশ এবং ১০ বছর পর ৮০ শতাংশ কমে যায়। তবে ক্যানসার চিকিৎসায় সার্জারি, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ‘মাল্টি ডিসিপ্লিনারি টিম’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সচেতন জীবনযাপন, স্বাস্থ্যকর খাবার ও সময়মতো রোগনির্ণয়ই পারে ফুসফুস ক্যানসার থেকে আমাদের দূরে রাখতে।