ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা
জনবহুল ও ব্যস্ত এলাকায় দিনের বেলায় হকার বসতে পারবেন না
নীতিমালার উদ্দেশ্য—পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং হকারদের জীবনমান উন্নয়ন করা। খেলার মাঠ, স্কুলের মাঠ বা কবরস্থানে মার্কেট বসানো যাবে না। নিয়ম ভঙ্গ করলে নিবন্ধন বাতিল।
রাজধানী ঢাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখল, যানজট, পথচারীদের চলাচলে বাধা এবং হকারদের অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনার পর এবার ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ করেছে সরকার। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা এই নীতিমালায় প্রথমবারের মতো হকারদের নিবন্ধন, নির্ধারিত স্থানে ব্যবসা, হলিডে ও নৈশকালীন মার্কেট, লাইসেন্স ফি এবং প্রশাসনিক তদারকির বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঢাকার জনবহুল ও ব্যস্ত এলাকায় দিনের বেলায় হকার বসতে পারবেন না। যেসব এলাকায় অফিস শেষ হওয়ার পর জনচলাচলের চাপ কমে যায়, সেসব এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নৈশকালীন মার্কেট চালু করা যাবে।
এই নীতিমালা করার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, হকারদের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তোলা এবং হকারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করা।
নীতিমালার ভূমিকায় সরকার বলেছে, ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত হকার কার্যক্রমের কারণে পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যানজট বাড়ছে এবং নগর ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে যুক্ত থাকায় পুরো বিষয়টিকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা নয়
নীতিমালা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের অধীনে একটি ‘হকার ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করা হবে। এই কমিটির মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্রসহ হকারদের নিবন্ধন দেওয়া হবে। আবেদন করার এক মাসের মধ্যে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে এবং তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। নিবন্ধন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কার্যকর থাকবে। মেয়াদ শেষে ফি দিয়ে তা নবায়ন করতে হবে।
হকারদের জন্য নির্ধারিত তথ্য ফরমে নাম, ঠিকানা, জন্ম তারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কী ধরনের পণ্য বিক্রি করবেন, কোন এলাকায় ব্যবসা করবেন এবং পরিবারের সদস্যের সংখ্যাসহ বিভিন্ন তথ্য দিতে হবে।
নীতিমালায় হকার বসার স্থান নির্ধারণে কয়েকটি স্পষ্ট মানদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কের পাশে হকার বসতে পারবেন না। মেট্রোস্টেশন, বাসস্টপেজ বা গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে ৩০–৪০ ফুট দূরে হকার জোন নির্ধারণ করতে হবে। এ ছাড়া যেখানে হকার বসানো হবে, সেখানে পথচারীদের চলাচলের জন্য পাঁচ থেকে আট ফুট জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। ফুটপাতের পুরোটা দখল করা যাবে না। নীতিমালায় নারীদের ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত জায়গা রাখার নির্দেশনাও রয়েছে।
হকারদের জন্য নিবন্ধন ও নির্দিষ্ট এলাকা।
জনবহুল ও ব্যস্ত এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নৈশকালীন মার্কেট।
নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে।
সরকারি ছুটির দিন, শুক্র ও শনিবার নির্দিষ্ট এলাকায় ‘হলিডে মার্কেট’ ও ‘নাইট মার্কেট’।
হলিডে মার্কেটের ধারণা
সরকারি ছুটির দিন, শুক্র ও শনিবার নির্দিষ্ট এলাকায় ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এসব মার্কেট পরিচালনা করা যাবে। সরকারি অফিসের সামনের সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে বা সিটি করপোরেশন নির্ধারিত বিশেষ এলাকায় এসব বাজার বসতে পারবে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, হলিডে মার্কেট মূলত পারিবারিক কেনাকাটাকেন্দ্রিক হবে। সেখানে খাবারের পাশাপাশি শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।
আর যেসব এলাকায় দিনের বেলায় তীব্র যানজট থাকে কিন্তু রাতে জনচাপ কমে যায়, সেসব এলাকায় ‘নাইট মার্কেট’ চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে। অফিস শেষে সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এসব মার্কেট পরিচালনা করা যাবে। তবে খেলার মাঠ, স্কুলের মাঠ, গণ পার্ক, উপাসনালয়ের মাঠ বা কবরস্থানে কোনো মার্কেট বসানো যাবে না বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে মিরপুর, গুলিস্তান, নিউমার্কেট, সদরঘাট ও বাইতুল মোকারমের মতো জনবহুল এলাকায় অফিস সময়ের পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০ পর্যন্ত এই মার্কেট বসানো যাবে ।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, একটি পরিবারের জন্য একজনই লাইসেন্স বা বরাদ্দ পাবেন। নিবন্ধিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ সেই স্থান ব্যবহার করতে পারবেন না। বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তি চাইলে অন্য কাউকে জায়গা ভাড়া বা হস্তান্তর করতে পারবেন না। হকারদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ের বাইরে ব্যবসা করলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারবে। রাস্তার প্রবেশ বা বের হওয়ার পথ আটকে ব্যবসা করা যাবে না। এ ছাড়া খাদ্যপণ্য বিক্রি করলে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে নির্দিষ্ট বিনে বর্জ্য ফেলতে হবে।
খেলার মাঠ, স্কুলের মাঠ, গণ পার্ক, উপাসনালয়ের মাঠ বা কবরস্থানে কোনো মার্কেট বসানো যাবে না।
সরকারি বা বেসরকারি স্থাপনার ক্ষতি করলে কিংবা নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ করলে নিবন্ধন বাতিলও করা যাবে।
লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগে নবায়ন না করলে নিবন্ধন বাতিল হবে।
নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা
অবৈধ বা অননুমোদিত হকার বসলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়। সরকারি বা বেসরকারি স্থাপনার ক্ষতি করলে কিংবা নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ করলে নিবন্ধন বাতিলও করা যাবে। নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনে জনস্বার্থে কোনো এলাকাকে হকারমুক্ত ঘোষণা করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগে নবায়ন না করলে নিবন্ধন বাতিল হবে।
বিপজ্জনক প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্ত হওয়ার আশঙ্কা
নগর-পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান নতুন এই নীতিমালাকে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও এর প্রয়োগিক দিক নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, একটি নীতিমালার প্রয়োজন দীর্ঘদিনের ছিল, তাই সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে হকার ব্যবস্থাপনা এবং ফুটপাতে পথচারীদের চলাচলের অধিকারের মধ্যে যেভাবে সমন্বয় করার চিন্তা করা হয়েছে, তা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ। এই পরিকল্পনা আধুনিক নগর-পরিকল্পনার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নীতিমালায় রাস্তার আয়তন এবং বিভিন্ন এলাকার বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতাকে আমলে নেওয়া হয়নি বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, তাঁর মতে বর্তমানে হকাররা যেভাবে ফুটপাত দখল করে আছেন, এই নীতিমালার মাধ্যমে সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলে উল্টো জনদুর্ভোগ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এটি একটি বিপজ্জনক প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে—মানুষের অবাধ চলাচলের অধিকারকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে হকার সমস্যাকে কেবল ব্যবস্থাপনার বিষয় না ভেবে দারিদ্র্য বিমোচনের দৃষ্টিকোণ থেকে এর স্থায়ী ও মানবিক সমাধানের চিন্তা করা।