বিদেশগামী শ্রমিকদের ভোগান্তি দূর হোক 

‘কুমিল্লা অঞ্চলে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক বৈঠকের আয়োজন করে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলো

গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) সাইফুল ইসলাম, ইউসুফ মোল্লা, ক্যাথরিন সিসিল ও সাইফুল মালিক। গতকাল কুমিল্লার ব্যুরো বাংলাদেশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেছবি: প্রথম আলো

‘প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে সচল থাকছে দেশের অর্থনীতির চাকা। তাই কোনোভাবেই প্রবাসীদের ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অভিবাসনপ্রত্যাশীরা যেন ভোগান্তির শিকার না হন।’

গতকাল শনিবার ‘কুমিল্লা অঞ্চলে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু)। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কোটবাড়ি সড়কের ধনপুর (হালিমানগর) এলাকায় অবস্থিত ব্যুরো বাংলাদেশ ট্রেনিং সেন্টারে এই বৈঠকের আয়োজন করে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলো। এফসিডিও এবং দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আয়োজিত এই গোলটেবিলে বৈঠকে অভিবাসনপ্রক্রিয়ার সম্ভাবনা, বাধা, চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশগুলো নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।

মো. ইউসুফ মোল্লা আরও বলেন, অভিবাসনপ্রত্যাশীরা বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে মাধ্যম হিসেবে এজেন্টসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে বেছে নেন। বিদেশে গিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ প্রতারণার শিকার ও সমস্যার মুখে পড়েন মাধ্যম হিসেবে কাজ করা (সাব–এজেন্ট) ব্যক্তিদের কারণে। কিন্তু আমাদের দেশে অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় মাধ্যম ব্যক্তিদের জন্য কোনো আইন নেই। অবিলম্বে এ ব্যাপারে আইন হওয়া দরকার।

বৈঠকে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসনপ্রত্যাশী ও প্রবাসীরা ওয়ান–স্টপ সার্ভিসের দাবি জানিয়ে আসছেন। কাজটি সরকার এখনো করে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ দালালকে বেছে নেন। কারণ, দালাল বা মাধ্যম ব্যক্তিরা মানুষকে সেই সেবাটি দিচ্ছেন। আজকের এই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দপ্তরের কর্মকর্তারা রয়েছেন। এখান থেকে বড় এবং ভালো কিছু সিদ্ধান্ত উঠে আসছে, যা থেকে অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। 

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সাইফুল মালিক বলেন, দায়িত্ব পালনের সময়ে দেখছি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অবৈধ চ্যানেলে বিদেশে যাওয়া মানুষজন বেশি সমস্যা বা প্রতারণার মুখে পড়ছেন। অভিবাসনপ্রত্যাশীরা বৈধ চুক্তিতে বিদেশে গেলে সমস্যা অনেকাংশেই সমাধান হয়ে যায়। বিদেশে যাওয়ার আগে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রশিক্ষিত হওয়ার কাজটি বেশি জরুরি। বিশেষ করে কম্পিউটার এবং ড্রাইভিং শিখে বিদেশে গেলে সেই কর্মীর চাহিদা ও বেতন অনেক বেশি।

বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথরিন সিসিল। তিনি বলেন, অভিবাসনপ্রক্রিয়াকে আরও সহজ, কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ করতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংস্থার ভিন্ন দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতার কারণে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এ লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে অংশীজনদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) পরিচালক (প্রোগ্রাম) মেরিনা সুলতানা বলেন, অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় মাধ্যমকারী বা সাব-এজেন্টদের জন্য আইন জরুরি। কারণ, বিদেশে যাওয়া ৩১ শতাংশ মানুষ প্রতারণার শিকার হন মাধ্যমকারীদের জন্য কোনো আইন না থাকার কারণে।

ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক জেসিয়া খাতুন বলেন, ‘মানুষ পণ্য নয়। তাই মানুষকে রপ্তানি করা যায় না। আমাদের অবশ্যই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মানবিকভাবে দেখতে হবে।’ 

মাল্টি-পার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ) কুমিল্লার সভাপতি বদরুল হুদা (জেনু) তাঁর বক্তব্যে অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় তাঁদের প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান। তিনি বলেন, মাল্টি-পার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরামকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা গেলে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আরও বেশি সচেতন করা যাবে।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী এনামুল হক (ফারুক) একটি ওয়েবসাইট তৈরির উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান; যেখানে অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় সব দপ্তরের তথ্য একসঙ্গে পাওয়া যাবে। এতে সেবা পেতে মানুষের ভোগান্তি কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি। 

যেসব সমস্যা, সংকট ও সুপারিশ উঠে এল বৈঠকে

ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের কুমিল্লা সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাফরউল্লাহ প্রবাসী শ্রমিকদের বেশ কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেন। দক্ষতা ছাড়া বিদেশে যাওয়া, দালালের প্রতারণা, অতিরিক্ত খরচ, বিদেশে গিয়ে বেতন-কাগজপত্র না পাওয়া, দেশে ফিরে পুনর্বাসনের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরনে তিনি। 

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কামাল হোসাইন অভিবাসনপ্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে নির্যাতন, অতিরিক্ত কাজের চাপ, বেতন আটকে রাখা, অভিযোগে সহায়তা না পাওয়া প্রধান সমস্যা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বায়রার সদস্য ফারজানা আলম মজুমদার সাব-এজেন্ট ও রিক্রুটমেন্ট ব্যবস্থায় সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা ভুয়া প্রতিশ্রুতি, নগদ লেনদেনে প্রতারণা ও চুক্তিপত্র গোপন রাখার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের ডেপুটি টিম লিডার ইকবাল মাহমুদ তাঁর বক্তব্যে সরকারি অফিসগুলোর সমন্বয় সংকটের কথা তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় কম বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এসব সমস্যা সমাধানে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আতিকুর রহমান একীভূত জাতীয় অভিবাসন ডেটাবেজ তৈরি করতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে আহ্বান জানান। 

কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কুমিল্লার অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান সাব-এজেন্ট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে আহ্বান জানান। তিনিও অগ্রাধিকারভিত্তিক কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। 

প্রবাসীকল্যাণ সেন্টার কুমিল্লার সহকারী পরিচালক মো. মাইন উদ্দিন তাঁর বক্তব্যে নিজেদের কার্যক্রম এবং প্রবাসীদের কীভাবে সহায়তা দেওয়া হয়, সেসবের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক কুমিল্লা অঞ্চলের সিনিয়র অফিসার রওনক জাহান বলেন, ‘কুমিল্লার ১৭টি উপজেলার মধ্যে আমাদের শাখা আছে মাত্র ৪টি। এর মধ্যে টমছম ব্রিজ শাখায় লোকবল আছে তিনজন; কিন্তু সেখান থেকে নয়টি উপজেলায় সেবা দিতে হয়।’

গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ও বক্তব্য দেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের প্রোগ্রাম ম্যানেজার আশরূপা হক চৌধুরী, কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক আবুল বাশার, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক মো. ইসহাক, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লার সভাপতি ইয়াসমিন রীমা, লালমাই সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সফিকুর রহমান, জিএমসিসি কুমিল্লার সহসভাপতি জসিম উদ্দিন চাষী, প্রবাসফেরত নারী ফাতেমা আক্তার প্রমুখ।