তৃতীয় সমুদ্রবন্দর হিসেবে পায়রা বন্দরের যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে। চট্টগ্রাম, মোংলা ও মাতারবাড়ীর পর পায়রা বন্দরকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সরকার।

সমুদ্রবন্দর চালু করতে ২০২০ সালে একসঙ্গে পাঁচটি কাজ শুরু করে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ। সাগর থেকে জেটি পর্যন্ত ৭৫ কিলোমিটার ক্যাপিটাল ড্রেজিং, পায়রা বন্দরের টার্মিনাল-জেটি নির্মাণ, ইয়ার্ড নির্মাণ, বন্দর থেকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে সংযোগ সড়ক এবং আন্ধারমানিক নদের ওপর সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে চুক্তি সই করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চারটি কাজ এগিয়ে চললেও আন্ধারমানিক নদের ওপর সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারেনি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। অথচ আগামী বছরের মধ্যে বন্দরের টার্মিনাল, জেটিসহ অন্যান্য অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এমন বাস্তবতায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে বাদ দিয়ে নিজেরাই সেতুটি করতে চায় পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ।

পায়রা বন্দরের কর্মকর্তারা বলছেন, এক কিলোমিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের সেতু করার অভিজ্ঞতা থাকায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে সেতুটি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তখন পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের এত বড় সেতু করার অভিজ্ঞতা ছিল না। এখন তাদের সেতু করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। গত দুই বছরে সওজ যেহেতু সেতু নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছে, তাই সেতুটি এখন তারাই করতে চায়।

সোয়া কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নিজেরা করতে এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

কেন শুরু হয়নি সেতুর নির্মাণকাজ

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বলছে, সেতু নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে গিয়ে বড় ধরনের জটিলতায় পড়তে হয় তাদের। দরপত্র আহ্বান করে সব প্রক্রিয়া শেষে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত করে প্রস্তাবটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়। কিন্তু অন্য একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটি থেকে প্রস্তাবটি ফেরত পাঠানো হয়। দুইবার দরপত্র ডেকেও ঠিকাদার চূড়ান্ত করতে পারেনি সওজ।

এদিকে পুনরায় দরপত্র ডাকতে গিয়ে এর বৈধতার মেয়াদ গত মার্চে শেষ হয়ে যায়। সরকারের ক্রয় বিধিমালায় বলা আছে, দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে পুনরায় দরপত্র ডাকার সুযোগ নেই।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আন্ধারমানিক নদের ওপর নির্মিতব্য সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে ১ হাজার ১৮০ মিটার। সেতুর জন্য খরচ ধরা হয়েছিল ৭৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু না হওয়ায় সেতুর খরচ বাড়বে বলে জানিয়েছেন পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা।

সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আজাদ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আন্ধারমানিক নদের ওপর সেতুটির দরপত্র আহ্বান করতে গিয়ে জটিলতায় পড়তে হয়েছে আমাদের। একাধিকবার দরপত্র ডাকতে হয়েছে। এ কারণে দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, এ ধরনের বড় সেতু করতে দরপত্র আহ্বানে কিছুটা সময় বেশি লাগে। তবে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ চাইছে তারা এখন নিজেরাই সেতুটি করতে।

যদিও পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিজেদের সেতু নির্মাণে যতটা আন্তরিক থাকে সওজ, তাদের সেতুটি নির্মাণে ততটা আন্তরিকতা দেখা যায়নি। ঠিকাদার নিয়োগ করতেই দুই বছর সময় অপচয় করে ফেলেছে সংস্থাটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সওজ নিজেরাও এখন সেতুটি নির্মাণে আগ্রহী নয়। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ যদি সেতুটি নির্মাণ করে তাতে তাদের আপত্তি নেই। সওজ এরই মধ্যে তাদের অনাপত্তি জানিয়েছে।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই শেষে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বলেছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের পরিবর্তে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ এখন সেতুটি নির্মাণ করবে। তবে এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অনুমতি নিতে হবে।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মামুন আল রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেড় হাজার মিটারের কম দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণের দায়িত্ব সওজের। অ্যালোকেশন অব বিজনেসে এ ধরনের বড় সেতু নির্মাণে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের ম্যান্ডেট আছে কি না, তা দেখতে হবে। এ ছাড়া বড় সেতু করার মতো সক্ষমতা তাদের আছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

পায়রা বন্দরের কর্মকর্তারা বলছেন, সমুদ্রবন্দর চালু করতে হলে সব কাজ একই সময়ে শেষ করতে হবে। সেতু ছাড়া পণ্য আনা-নেওয়া কঠিন হবে। তাই সেতু চালু হওয়ার আগপর্যন্ত পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য বিকল্প হিসেবে ফেরি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ও পরিচালক (উপসচিব) সোহরাব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আন্ধারমানিক নদের ওপর সেতুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু সেতুর কাজ এখনো শুরু হয়নি, আমরা বিকল্প হিসেবে ফেরির ব্যবস্থা করছি, যাতে পণ্য খালাসের পর কার্গো যাতায়াতে সমস্যা না হয়। সেতু চালু হওয়ার আগপর্যন্ত ফেরি চলবে।’

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আন্ধারমানিক নদের ওপর নির্মিতব্য সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে ১ হাজার ১৮০ মিটার। সেতুর জন্য খরচ ধরা হয়েছিল ৭৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু না হওয়ায় সেতুর খরচ বাড়বে বলে জানিয়েছেন পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা।

এক নদীতে তিন সেতু

প্রস্তাবিত সেতুটি নির্মিত হলে পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক নদের ওপর মোট সেতুর সংখ্যা হবে ৩। সব কটি সেতু নদের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে। ২০১৬ সালে প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামালের নামে সেতু চালু হয়। এটি পটুয়াখালীকে কুয়াকাটার সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এর পূর্ব পাশে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর আরেকটি সেতু নির্মাণ করেছে। এটি পটুয়াখালীকে কুয়াকাটার পাশাপাশি পায়রা বন্দর সংযোগ সড়কের সঙ্গেও যুক্ত করেছে। এর পূর্ব পাশে একই নদের ওপর প্রস্তাবিত তৃতীয় সেতুটি পটুয়াখালীর সঙ্গে পায়রা বন্দর, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শের-ই-বাংলা নৌঘাঁটিকে যুক্ত করবে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার বালিয়াতলী ফেরিঘাটে ৬৭৭ মিটার দৈর্ঘ্যের এলজিইডির করা সেতুটির নাম দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় চার নেতার একজন সৈয়দ নজরুল ইসলামের নামে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে সেতু নির্মিত হলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। নাব্যতা কমার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কলাপাড়া আঞ্চলিক কমিটির সদস্যসচিব মেজবাহ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ৮-১০ কিলোমিটার দূরত্বে ৩টি সেতু নির্মিত হলে নদীর পানিপ্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নদীতে পলির আস্তরণ বাড়বে। তিনি আরও বলেন, আন্ধারমানিক নদ ইলিশের অভয়াশ্রম। এই নদের সঙ্গে অনেক জেলের জীবন-জীবিকা জড়িত। পানির প্রবাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবে ইলিশ বিচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন