‘জনঘনত্ব, বাসযোগ্যতা ও টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরে মোট ভূমির ২৫ শতাংশ রাস্তা প্রয়োজন, কিন্তু আছে মাত্র ৬ শতাংশ। প্রতি পাঁচ হাজার মানুষের জন্য হাঁটাদূরত্বের মধ্যে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রাখা প্রয়োজন। তা না হলে শিশুদের দুই থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে গেলে যানজট হবে। আবাসন গড়তে হলে স্কুল, খেলার মাঠ রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী জানান, সারা দেশের জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। ঢাকা মহানগরের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সম্পর্কে তিনি বলেন, শুধু রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ড্যাপ বাস্তবায়ন করবে না, সবার সঙ্গে সমন্বয় করে এটি বাস্তবায়ন করতে হবে।

ড্যাপের কারণেই দখল হওয়া খেলার মাঠ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, খাল উদ্ধার করতে গেলে মহানগর জরিপ দেখানো হয়। এই জরিপ দিয়ে নয়, ‘সিএস ম্যাপ’ (ব্রিটিশ আমলে করা জরিপ) ধরে খালের সীমানা চিহ্নিত করা হবে এবং উদ্ধার করা হবে।

উন্নয়নে ভারসাম্য দরকার

সারা দেশে পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য জাতীয় পরিকল্পনা করার বিষয়ে বৈঠকে গুরুত্ব দেন নগর-গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০০৬ সালে জাতীয় নগর নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। এখনো সেটি পাস হয়নি। এত বছরেও নীতিমালার কাজ শেষ না হওয়া খুবই বিপজ্জনক উল্লেখ করে দ্রুত নীতিমালাটি পাস করার দাবি জানান তিনি।

সবার মতামত নিয়েই ড্যাপ করা হয়েছে উল্লেখ করে রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। বাসযোগ্যতার সঙ্গে জনঘনত্ব সরাসরি সম্পর্কিত, সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এখনো ঢাকাকে বাসযোগ্য করা সম্ভব।

জনসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সে অনুপাতে বাড়েনি বলে উল্লেখ করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান। তিনি বলেন, ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়ন করতে হবে। জনসংখ্যা ও নাগরিক সুবিধার চাহিদা মেটানো—দুটো বিষয় বিবেচনায় রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে।

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, শুধু ঘুমানোর জায়গা নিয়ে শহরের পরিকল্পনা করা হয় না। ঘুমানোর জায়গার পাশাপাশি স্কুল-কলেজ, খেলার মাঠ, রাস্তা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়। সব পরিকল্পনার কেন্দ্রে মানুষ। ঢাকায় ৪০০ বছরেও রমনা পার্কের মতো আরেকটি পার্ক তৈরি করা যায়নি।

শুধু ঢাকা শহরের জন্য ড্যাপ না করে, সব শহরের জন্যই করা উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, সারা দেশের জন্য একটি পরিকল্পনা দরকার। বিদেশি জ্ঞান দিয়ে এ পরিকল্পনা করা যাবে না, নিজেদের জ্ঞান দিয়েই তা করতে হবে। যাতে তেঁতুলিয়ার মানুষকে সেবা পেতে ঢাকায় আসতে না হয়।

ভাবতে হবে দেশ নিয়ে

বৈঠকে আর্কিটেক্টস রিজিওনাল কাউন্সিল এশিয়ার (আর্কএশিয়া) সভাপতি স্থপতি আবু সাঈদ এম আহমেদ বলেন, শুধু ঢাকা নিয়ে ভাবলে হবে না, সারা দেশ নিয়ে ভাবতে হবে। না হলে ঢাকার জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকায় লোক আসা নিয়ন্ত্রণ করার পক্ষে মত দেন তিনি।

সুষম উন্নয়নের জন্য গ্রামকে গুরুত্ব দিতে হবে বলে উল্লেখ করেন বিআইপির উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক আকতার মাহমুদ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে দেশের ৪৯৫টি উপজেলার ৮৭ হাজার গ্রামে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত করা হবে। পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন না হলে দেশে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, যেভাবে বসতি গড়ে উঠছে, তাতে প্রতিবছর ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।

ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের সহসভাপতি প্রকৌশলী খন্দকার মনজুর মোর্শেদ বলেন, ড্যাপ চলমান প্রক্রিয়া। প্রয়োজন অনুযায়ী ড্যাপে সংশোধন বা সংযোজন-বিয়োজনের জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের দাবি জানান তিনি।

গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন বিআইপির সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা। তিনি বলেন, জাতীয় পরিকল্পনাসহ উচ্চতর পরিকল্পনার জন্য বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও উদার হতে হবে। এ ছাড়া ড্যাপ বাস্তবায়নের জন্য রাজউকের বোর্ড পেশাজীবীদের দিয়ে পুনর্গঠন করতে হবে।

সারা দেশে নগরায়ণের মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন বিআইপির সাধারণ সম্পাদক এস এম মেহেদী আহসান। তিনি বলেন, গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন যদি পরিকল্পিতভাবে গড়ে না ওঠে, ঢাকা যদি উন্নত দেশের রাজধানীর মতো না হয়, তবে রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন হবে না।