মেয়ের মুখে একটু হাসি দেখতে, তাকে একটু আনন্দ দিতে ঘোড়ায় চড়ানো, সমুদ্রে নামানো সবই করার চেষ্টা করেন মা রিজা রহমান
ছবি: সংগৃহীত

রিজা রহমানের মেয়ে আল আয়মান ইয়ানাতের সেরিব্রাল পালসি বা মস্তিষ্কে পক্ষাঘাতসহ বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা আছে। চিকিৎসার জন্য তাকে অনেকবার প্রতিবেশী দেশ ভারতে নিয়ে গেছেন এই মা। এ সময় সুযোগ পেলেই মেয়েকে নিয়ে বেড়িয়েছেন সিমলা, মানালি, জম্মু কাশ্মীর। দেশেও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় বেড়িয়েছেন মা–মেয়ে। মেয়ের মুখে একটু হাসি দেখতে, একটু আনন্দ দিতে ঘোড়ায় চড়ানো, সমুদ্রে নামানো সবই করার চেষ্টা করেন। তবে হুইলচেয়ারসহ মেয়েকে নিয়ে পার্কে ঢুকতে বাধার মুখে পড়েন এই মা। এ নিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন।

গত ২৬ এপ্রিল রংপুরের চিকলি ওয়াটার পার্কের কিডস জোনে হুইলচেয়ারসহ মেয়েকে নিয়ে ঢুকতে গেলে রিজা রহমানকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ৩ মে রিজা একাই মেয়েকে নিয়ে রংপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার প্রতিবাদ জানান।

২৭ এপ্রিল রিজা রহমান রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বিষয়টি নিয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ করেন। তাতে তিনি পার্কসহ বিনোদনের বিভিন্ন জায়গায় হুইলচেয়ার নিয়ে যাতে যাওয়া যায়, এ ধরনের নির্দেশিকা টানানোর আবেদন জানান।

আইনটিতে প্রবেশগম্যতাকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গণস্থাপনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে। গণস্থাপনা সব সরকারি ও বেসরকারি ইমারত বা ভবন, পার্ক, স্টেশন, বন্দর, টার্মিনাল ও সড়কের কথা বলা হয়েছে।

আজ শনিবার দুপুরে মুঠোফোনে রিজা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জানানোর পর কার্যালয় থেকে একজন ফোন করে বলেছেন, বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে আজ পর্যন্ত পার্ক কর্তৃপক্ষের কেউ যোগাযোগ করেননি। ঘটনার দিন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে কথা বলার পর পার্কের একজন নারী কর্মকর্তা বলেছিলেন তিনি আমার মেয়েকে বিশেষভাবে পুরো পার্ক ঘুরিয়ে দেখাবেন। আমি তো আমার মেয়ের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা চাইনি। অন্য বাচ্চাদের মতোই যাতে আমার বাচ্চাও পার্কে ঢুকতে পারে, শুধু তা–ই চেয়েছিলাম।’

হুইলচেয়ার নিয়ে ঢোকা যাবে না

গত ২৬ এপ্রিল মেয়েকে একটু আনন্দ দেওয়ার জন্য চিকলি ওয়াটার পার্কে নিয়ে যান রিজা রহমান। টিকিট কেটে মা ও মেয়ে পার্কের ভেতরে ঢোকেন। কিডস জোনের জন্যও আলাদা ১০০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটেন। তবে সেখানে ঢুকতে গেলে নিরাপত্তাকর্মী জানান, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভেতরে হুইলচেয়ার নিয়ে ঢোকা যাবে না। প্রায় পাঁচ মিনিট পর ওই কর্মী জানান, হুইলচেয়ার নিয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়া যায়নি। রিজা রহমান বলেন, ‘কর্মীর সেই কথা শুনে আমি আমার মোবাইলের ক্যামেরা চালু করি। ভিডিওতে বলতে বলি কেন হুইলচেয়ার নিয়ে আমি ভেতরে ঢুকতে পারব না। আমি টিকিট কেটেছি। কোনো বিধিনিষেধ থাকলে টিকিট নিলেন কেন? তখন ওই কর্মী টিকিট ফেরত দিতে বলেন।’

আমার মেয়ে হুইলচেয়ার ছাড়া চলতে পারে না আল আয়মান ইয়ানাত
ছবি: সংগৃহীত

রিজা রহমান বলেন, ‘কিডস জোনে শিশুদের সঙ্গে অভিভাবকেরাও ঢুকছিলেন, আমি তো আমার মেয়ের সঙ্গেই থাকতাম, তাহলে সমস্যাটা কোথায় ছিল? আমার মেয়ে হুইলচেয়ার ছাড়া চলতে পারে না, তাহলে তাকে আমি কীভাবে সামলাতাম। এ ঘটনায় আমি খুব অপমানিত হয়েছি।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি গ্রুপেও ঘটনাটি নিয়ে আপত্তিকর একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন রিজা। পরে তিনি গ্রুপের অ্যাডমিনের সঙ্গে কথা বলে পোস্টটি বাতিল করার ব্যবস্থা করেন। পোস্টে বলা হয়েছিল, রিজা রহমানের মেয়েকে দেখে অন্য বাচ্চারা ভয় পেলে বা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লে তার দায় কে নেবে? রিজা রহমান পার্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যে কথা বলেছেন, তার ভিডিও কেন তিনি ফেসবুকে দেননি তা–ও জানতে চাওয়া হয় পোস্টে।

এই পোস্টটি পার্ক কর্তৃপক্ষের মদদেই দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন রিজা রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি সংবাদ সম্মেলনে সবার কাছে জানতে চেয়েছি, আমার মেয়েকে দেখে কেউ ভয় পাচ্ছেন কি না? আমার মেয়ের কি মাথায় দুটো শিং গজিয়েছে যে অন্য শিশুরা ভয় পাবে?’

রিজা রহমানের শ্বশুরবাড়ি দিনাজপুরে। তাঁর স্বামী আল হেলাল চাকরির জন্য রংপুরের কাউনিয়ায় থাকেন। মেয়ের স্কুল সুবিধার জন্য রিজা রংপুর শহরে মেয়েকে নিয়ে থাকেন। ভারতে চিকিৎসা বা বেড়ানোর জন্য এই মা মেয়েকে নিয়ে একাই যাতায়াত করেন বেশির ভাগ সময়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনে এ ধরনের শিশু ও ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা আইনটি জানেন না বা রিজা রহমানের মতো প্রতিবাদ করেন না। তাই আইন ভঙ্গকারীরা পার পেয়ে যায়।
মারুফা হোসেন, সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক, তরী ফাউন্ডেশন

রিজা রহমান বলেন, ‘দেশের বাইরে আমার মেয়েকে নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না, যত সমস্যা হয় আমাদের দেশেই। এর আগে কক্সবাজারে সমুদ্রসৈকতে হুইলচেয়ার নিতে সমস্যা হয় বলে অটোচালককে বিচের যেখানে চেয়ার পাতা থাকে, সেখান পর্যন্ত নিতে ভাড়া করেছিলাম। তবে সৈকতের দায়িত্বরত পুলিশ অটোচালককে ওই পর্যন্ত যেতে দেননি। উল্টো বলেছিলেন প্রয়োজনে আমার মেয়েকে তিনি নিজে ঘাড়ে করে নিয়ে যাবেন। মেয়েকে অন্য একজন ঘাড়ে করে নেবেন কেন? একটু সহযোগিতা করলেই তো মেয়ে সমুদ্রের কাছে যেতে পারত।’

এমন শিশুদের কাছে হুইলচেয়ারটি তাদের পা

আজ শনিবার দুপুরে চিকলি ওয়াটার পার্কের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশনস) এ এইচ এম সারোয়ার জাহানের সঙ্গে এই প্রতিবেদক মুঠোফোনে কথা বলেন। তিনি বলেন, ২৬ এপ্রিল ঘটনার সময় তিনি পার্কে উপস্থিত ছিলেন না। এ ঘটনার জন্য তিনি নিজেও দুঃখিত এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান।

৩ মে রিজা একাই মেয়েকে নিয়ে রংপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার প্রতিবাদ জানান।

এ এইচ এম সারোয়ার জাহান বলেন, ওই নিরাপত্তাকর্মী হয়তো ভেবেছিলেন কিডস জোনের ভেতরে হুইলচেয়ার নিয়ে ঢুকলে অন্য বাচ্চারা ব্যথা পেতে পারে। তবে এই মা যখন টিকিট কেটেছেন, তখনই তাঁকে বিষয়টি না বলায় ঘটনাটি অনেক দূর গড়িয়েছে। পার্ক কর্তৃপক্ষও এ নিয়ে অনুশোচনায় ভুগছে।

মারুফা হোসেন সেরিব্রাল পালসি, অটিজমসহ বিভিন্ন শিশুর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা তরী ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সেরিব্রাল পালসিসহ শারীরিক জটিলতা আছে এমন শিশুদের কাছে হুইলচেয়ারটিই হলো তাদের পা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনে এ ধরনের শিশু ও ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা আইনটি জানেন না বা রিজা রহমানের মতো প্রতিবাদ করেন না। তাই আইন ভঙ্গকারীরা পার পেয়ে যায়।

আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারের স্বীকৃতি

২০১৩ সালে সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করেছে। সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে সেরিব্রাল পালসিসহ বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতার কথা উল্লেখ আছে। প্রতিবন্ধিতা বলতে যেকোনো কারণে দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ীভাবে কোনো ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্ততা বা প্রতিকূলতা এবং ওই ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধার পারস্পরিক প্রভাব, যার কারণে ওই ব্যক্তি সমতার ভিত্তিতে সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রিজা মনে করেন তাঁর প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে অন্য অভিভাবকেরা প্রতিবাদ করার সাহস পাবেন এবং বিভিন্ন গণস্থাপনার কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে
ছবি: সংগৃহীত

আইনে প্রবেশগম্যতা বলতে ভৌত অবকাঠামো, যানবাহন, যোগাযোগ, তথ্য এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিসহ জনসাধারণের জন্য প্রাপ্য সব সুবিধা ও সেবায় অন্যদের মতো প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমসুযোগ ও সম আচরণ প্রাপ্তির অধিকার বোঝানো হয়েছে।

আইনটিতে প্রবেশগম্যতাকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গণস্থাপনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে। গণস্থাপনা সব সরকারি ও বেসরকারি ইমারত বা ভবন, পার্ক, স্টেশন, বন্দর, টার্মিনাল ও সড়কের কথা বলা হয়েছে। এই আইনের অধীন সংঘটিত কোনো অপরাধের জন্য সংক্ষুব্ধ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজে অথবা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মা–বাবা, বৈধ বা আইনানুগ অভিভাবক অথবা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন মামলা দায়ের করতে পারবে।

রিজা রহমান বললেন, আইনের অধীনে মামলা করার জন্য পারিবারিক এবং সামাজিক যে ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, তা তাঁর নেই। তাই আপাতত এ ঘটনায় মামলা করার বিষয়টিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে তিনি চান, তাঁর প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে অন্য অভিভাবকেরা প্রতিবাদ করার সাহস পাবেন এবং বিভিন্ন গণস্থাপনার কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে।