মেঘনার গর্ভে গেছে ভিটেমাটি, তাসলিমাদের ইফতারে শুধুই ভাত
পশ্চিম আকাশে তখন সূর্য নিভু নিভু। ইফতারের আর মাত্র ১৫ মিনিট বাকি। সাধারণত এ সময় চারপাশে ইফতারের আমেজ থাকে। কেউ ইফতার তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন, কেউ আবার সামনে খাবার সাজিয়ে আজানের অপেক্ষায়। কিন্তু নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নে মেঘনার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট একটি জীর্ণ ঘরে নেই সেই ব্যস্ততা, নেই কোনো আয়োজন। কয়েক মিটার দূর থেকেই ভেসে আসছে সর্বনাশা মেঘনার গর্জন, যে নদী নির্দয়ভাবে গিলে নিচ্ছে মানুষের ভিটেমাটি ও জীবনের শেষ সঞ্চয়।
ছোট্ট পিচঢালা সড়কের এক পাশে মেঘনা, অন্য পাশে তাসলিমাদের ঘর। ঘরের পেছন ঘেঁষে আরেকটি সরু খাল। পাশের সড়কটিতে একসময় শত শত যানবাহন আর হাজারো মানুষের যাতায়াত থাকলেও ভাঙনের ফলে এখন সেটি একরকম জনমানবশূন্য। জীর্ণ ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে ১৫ বছর বয়সী তাসলিমা আক্তার মুরগির ছানাগুলোকে খোপে ঢোকানোর চেষ্টা করছে। যে ঘরটির পাশে সে দাঁড়িয়ে, সেটিও হয়তো আর দুই-তিন দিনের মধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
গত শনিবার ইফতারের আগমুহূর্তে কথা হয় তাসলিমার সঙ্গে। ভয়াল মেঘনা এত কাছে থাকলেও তার চোখে–মুখে তেমন ভয়ের ছাপ নেই। নদীর এই রাক্ষুসে রূপের সঙ্গে তাদের পরিচয় অনেক দিনের।
তাসলিমাদের বাড়ি ছিল চার কিলোমিটার দূরের রসুলপুর গ্রামে। এক বছর আগে নদীভাঙনে সবকিছু হারিয়ে তারা আশ্রয় নেয় সড়কের পাশের এই খাসজমিতে। জমি কেনার সামর্থ্য নেই বাবার। তাই তড়িঘড়ি করে তুলে নেওয়া এই ঘরই এখন তাদের শেষ ভরসা। অথচ মেঘনার গর্জনে সেই ঘরের মাটিও এখন কেঁপে উঠছে। কয়েক দিনের মধ্যে এই জায়গারও হয়তো একই পরিণতি হবে।
তাসলিমাদের ঘরের সামনে যেতেই দেখা যায়, ভাতের মাড় ঝরানো একটি পাতিল উল্টো করে রাখা। একটু কাছে যেতেই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায় তাসলিমা। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাবা ছিদ্দিক উল্যাহ ইটভাটার শ্রমিক। মা মনোয়ারা বেগম গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তাসলিমাই বড়। ছোট দুই ভাইকে নিয়ে মা–বাবা দেড় কিলোমিটার দূরে গেছেন। উদ্দেশ্য, এই ঘর সরিয়ে নেওয়ার মতো আরেকটি নতুন জায়গার খোঁজ করা। ইফতারের আগে ফেরার কথা থাকলেও তখনো তাঁরা ফেরেননি।
ইফতারের কী আয়োজন—জানতে চাইলে কিছুটা মলিন কণ্ঠে তাসলিমা বলে, ‘ভাত রেঁধেছি। আর কিছু নাই। ভাত দিয়েই ইফতার করব।’
তাসলিমা জানায়, সে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর আর তার পড়াশোনা হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক দূরে, তা ছাড়া ভিটেমাটি হারানো পরিবারের সামর্থ্যও নেই তাকে পড়ানো করানোর। তাই গত এক বছর ঘরেই থাকে সে, টুকটাক কাজ করে।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাসলিমা বলে, একসময় তাদের সব ছিল—গোয়ালে গরু, পুকুরে মাছ, খেতে ফসল। রমজান এলে সন্ধ্যায় ইফতারের আমেজও থাকত। এখন কিছুই নেই। নদী কেবল ভিটাই নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তাদের আনন্দ। এখন খোলা আকাশের নিচে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে। সরকারি কোনো সহায়তা তারা পায়নি বলেও জানায় এই কিশোরী।
শুধু তাসলিমারা নয়, মেঘনা নদীর প্রবল ভাঙনে তাদের মতো এমন হাজারো পরিবার সবকিছু হারিয়ে প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হারিয়ে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ছে হাজারো শিশু। তাসলিমা শুধু সেই দীর্ঘ তালিকার একটি নাম।