তবে যতটুকু মনে পড়ে, সবার আগে ওর ছবি তুলেছিলাম ২৪ ডিসেম্বর ১৯৯৬-এ বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার সাতশৈয়া গ্রাম থেকে। পুকুরপাড়ের একটি আমগাছের হেলেপড়া ডালে পাখিটি বসে ছিল। কিছুদিন আগে ক্যামেরা হাতে হাঁটছিলাম আমার কর্মস্থল গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্বদ্যিালয় ক্যাম্পাসে। আগের মতো এখন আর প্রতিদিন ক্যাম্পাসের খেত-খামার-পুকুর-জলা-বন-বাগানের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় হয় না। কৃষি অর্থনীতি অনুষদ ভবনের পাশের আমলকীবাগান পার হয়ে কলাবাগান ও মৎস্য হ্যাচারির মাঝখান দিয়ে আমার পুরোনো পাখি দেখার জায়গা নিচু জমিটির সামনে আসতেই সেই পুরোনো দৃশ্য। বন তেজপাতা গাছের ডালে বসে আছে নীলরঙা পাখিটি। কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে গেলাম যেন। তবে ওর একটি ছবি তুলে নিতে মোটেও ভুল হলো না।

এ দেশের বহুল দৃশ্যমান ছোট এই পাখির পিঠ সবুজাভ-নীল। দেহের নিচটা কমলা। মাথার চাঁদি, কোমর, ডানা ও ডানা-ঢাকনি ফ্যাকাশে সবুজাভ-নীল। গলা সাদা ও কান-ঢাকনি কমলা। চোখ পিঙ্গল-বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল প্রবাল লাল। চঞ্চু ও নখ কালচে। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও স্ত্রীর নিচের চঞ্চুর গোড়া লাল। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ ফ্যাকাশে সবুজাভ-নীল এবং বুকে আঁইশের মতো দাগ থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দৈর্ঘ্য ১৬-১৮ সেন্টিমিটার ও প্রসারিত ডানা ২৪-২৬ সেন্টিমিটার। ওজনে পুরুষ ২৩-৩৫ গ্রাম ও স্ত্রী ৩০-৩৫ গ্রাম।

ওরা দেশব্যাপী সব উপযুক্ত জলার ধারে বাস করতে পারে। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। পানির অল্প ওপর দিয়ে অতি দ্রুত উড়ে যায়। পানি থেকে সামান্য ওপরে ঝুলন্ত গাছের ডালে বা পানিতে পোঁতা খুঁটিতে চুপচাপ বসে থাকে ও হঠাৎ ঝাঁপ দিয়ে ছোট মাছ, ব্যাঙাচি বা জলজ পোকামাকড় ধরে খায়। নীলাভ–কান মাছরাঙার মতো ছায়াযুক্ত স্থানে না বসে বরং রৌদ্রোজ্জ্বল স্থানে বসে। ওড়ার সময় ‘চিট-ইট-ইট’ শব্দে ডাকে।

মার্চ থেকে আগস্ট মাসে প্রজনন মৌসুমে জলাশয়ের খাড়া পাড়ের মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বাসা বানায়। স্ত্রী পাঁচ-সাতটি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ১৯-২১ দিনে। মা–বাবা উভয়েই মিলেমিশে ছানাদের খাওয়ায়। ছানারা ২৩-২৪ দিনে উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল চার-পাঁচ বছর।

আমাদের অতিপরিচিত এই পাখি আবাসিক পাখি তিত মাছরাঙা। ছোট মাছরাঙা বা তালঘাইরা মাছরাঙা নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম কমন কিংফিশার, বেঙ্গল স্মল ব্লু কিংফিশার বা ইউরেশিয়ান কিংফিশার। অ্যালসেডিনিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Alcedo atthis। পুরো ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে পাখিটির দেখা মেলে।

অত্যন্ত নিরীহ পাখিটির শক্তিশালী চঞ্চু থাকা সত্ত্বেও কারও সঙ্গে মারামারি করে না। অথচ সম্প্রতি মানুষ এদেরও শিকার করছে। অনেকে এদের ডিম-বাচ্চা খাচ্ছে বলেও শুনেছি। আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে তিত মাছরাঙাকে রক্ষা করা প্রয়োজন।

আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও

বন্য প্রাণী চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ